একটা উপদেশ আমার খুব ভালো লাগে।
–কোনো উপদেশটা? সাজ্জিও বললেন।
সেই উপদেশটা–সূচের ফুটো দিয়ে বরং উট চলে যাবে তবু ধনীরা স্বর্গে ঈশ্বরের রাজ্যে যেতে পারবে না।
–সাবাস ফ্রান্সিস সাজ্জিও বলে উঠলেন–আপনি যীশুর উপদেশ নিজের জীবনেও মেনেছেন ঠিক চার্লসের মতো।
–ঠিক। তাই আমার বরাবর মনে হয়েছে–চার্লসের স্বর্ণসম্পদ রয়েছে তাঁরই প্রতিষ্ঠিত এই গীর্জার কোথাও। ফ্রান্সিস বলল। তারপর সাজ্জিওর হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিল।
বেশ জমকালো একটা দু-ঘোড়ায় টানা গাড়ি এসে দাঁড়াল। বোঝাই যাচ্ছে– রাজপরিবারের গাড়ি।
গাড়িতে চড়ে ফ্রান্সিস আর হ্যারি অ্যাঞ্জেলো দুর্গে যখন এসে পৌঁছল তখন বেশ রাত।
ওরা সেই রাতটা দুর্গেই কাটাল। দুর্গাধ্যক্ষ ওদের খুব আদর যত্ন করল। ততক্ষণে সারা মাল্টাই জেনে গেছে চার্লসের স্বর্ণসম্পদ উদ্ধারের কাহিনী আর ফ্রান্সিসের কথা।
পরদিন। নিজেদের ঘরেই তখন ফ্রান্সিস আর হ্যারি সকালের খাবার খাচ্ছে। গোল রুটি আর সজির ঝোল। তখনই একজন খ্রীস্টান সাধু দোরগোড়ায় এসে দাঁড়াল। মুখে দাড়ি গোঁফ। সাধু বলল, আর্ত ক্ষুধার্ত। হ্যারি বলল”নিশ্চয়ই আসুন। যারা খাবার দিয়েছিল সেই সৈন্যদের হ্যারি আরো খাবার দিতে বলল।
তিনজনেই খেতে লাগল।
খাওয়া শেষ হলে ফ্রান্সিস ঘাসের বিছানায় শুয়ে পড়ল। বলল–হ্যারি এখন আমাদের জাহাজের খোঁজ পাবো কী করে।
–চলো–সমুদ্রতীরে যাই। খোঁজখবর করি। হ্যারি বলল।
–তাই চলো৷ ফ্রান্সিস উঠে বসে বলল। সাধুটি তখনও বসে আছে। ফ্রন্সিস বলল– তা সাধুবাবা আপনার খাওয়া তো হয়েছে। এবার কী করবেন?
–আপনাদের নিয়ে যাবো। সাধু গম্ভীর মুখে বলল।
–কোথায়? হ্যারি বলল।
–আপনাদের জাহাজে। সাধু বলল একই ভঙ্গীতে।
–এ্যা? হ্যারি তো চমকে উঠল। ফ্রান্সিসও। সাধুবাবা বলছে কি।
–আপনি কী করে আমাদের জাহাজের কথা জানলেন। হ্যারি জিজ্ঞেস করল।
–সেটা পরে জানবেন–সাধু বলল–যদি নিজেদের জাহাজে যেতে চান তাহলে এক্ষুণি আমার সঙ্গে চলুন।
–বেশ চলুন। ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। হ্যারিও তৈরি। –ঠিক তখনই দুর্গাধ্যক্ষ ঘরে ঢুকল। হেসে বলল
–আপনাদের ঘুমুতে কোনো অসুবিধা হয় নি তো?
–না না। ফ্রান্সিস বলল।
সকালের খাবার খেয়েছেন তো? দুর্গাধ্যক্ষ বলল।
–হ্যাঁ। হ্যারি বলল।
–হ্যাঁ একটু বেড়াবোটেরাবো। ফ্রান্সিস বলল।
–এখন বাইরে যাবেন? দুর্গাধ্যক্ষ বলল।
সঙ্গে লোক দেব? দুর্গাধ্যক্ষ বলল।
-না-না। ফ্রান্সিস বলল। তারপর হ্যারি বলল চলো। এবার সাধুকে দেখিয়ে হ্যারি দুর্গাধ্যক্ষকে জিজ্ঞেস করল
ইনি কে?
–তা তো জানি না। উনি গত কয়েকদিন ধরেই এখানে সকালে সন্ধেয় আসছেন। খেয়েটেয়ে চলে যান। দুর্গাধ্যক্ষ বলল।
ফ্রান্সিস হ্যারি আর কোনো কথা বলল না। দুর্গের বাইরে চলে এলো। পেছনে সেই সাধু। সাধুকে হ্যারি জিজ্ঞেস করল এবার কোন্ দিকে যাবো? সাধু হঠাৎ হো-হো করে হেসে উঠল। আরে? এতো বিস্কোর গলা। বিস্কো নিজেই আবার গোঁফ দাড়ি-টান দিয়ে খুলে ফেলল। ফ্রান্সিসকে হ্যারিকে জড়িয়ে ধরল। ফ্রান্সিস হাসতে হাসতে বলল–এই সাধুর বেশ নিয়েছিলে কেন? বিস্কো বলল–প্রতিদিন দুবেলা দুর্গে আসতাম তোমাদের খোঁজ নিতে। খোঁজ মানে তোমাদের কথা কাউকে জিজ্ঞেস করতাম না। শুধু দুর্গের ভিতের ঘুরে ঘুরে বেড়াতাম। সাধুর বেশে। কাজেই কেউ কিছু বলতো না।
–আর আমাদের ভয় নেই। ফ্রান্সিস চার্লসের স্বর্ণসম্পদ উদ্ধার করেছে। হ্যারি বলল।
–তাই দুর্গাধ্যক্ষের এত আদর আপ্যায়নের ঘটা। বিস্কো বলল।
–কেন? তোমরা এই খবর পাও নি? ফ্রান্সিস বলল।
না তো এই বেশ ধরে আসতাম। বিস্কো বলল।
এবার বিস্কো ফ্রান্সিস আর হ্যারিকে নিয়ে একটা বনভূমিতে ঢুকল। বেশ ঘন বন। গাছগাছালির জটলা। তারই মধ্যে দিয়ে ওরা চলল।
বনের শেষে দেখল সমুদ্রের খাড়ি। ওদের জাহাজে সেই খাঁড়িতে ভাসছে। তির থেকেই বিস্কো চিৎকার করতে লাগল–ভাইসব–ফ্রান্সিস, হ্যারি ফিরে এসেছে। ফ্রান্সিস চার্লসের গুপ্ত স্বর্ণভাণ্ডার উদ্ধার করেছে। রাজা পিটার আর আমাদের কোনো ক্ষতি করবে না।
বিস্কোর চিৎকার করে কথা বলা জাহাজের বন্ধুরা শুনল। সবাই এসে ভিড় করে দাঁড়াল রেলিঙ ধরে। তার মধ্যে মারিয়াও আছে।
জাহাজ থেকে একটা নৌকা জলে ভাসানো হল। দাঁড় বাইতে বাইতে নৌকা পারের কাছে নিয়ে এলো শাঙ্কো। ফ্রান্সিসরা নৌকায় উঠল। নৌকো গিয়ে জাহাজে লাগল। দড়ির মই ফেলা হল। ফ্রান্সিসরা মই বেয়ে ডেক-এ উঠে এলো। জাহাজে ফ্রান্সিসকে নিয়ে হৈ হৈ পড়ে গেল। ধ্বনি উঠল—ও হো হো–।
মারিয়া হাসতে হাসতে এগিয়ে এলো ফ্রান্সিসের দিকে। ফ্রান্সিস লক্ষ্য করল মারিয়ার চোখ মুখ কেমন শুকিয়ে গেছে। ফ্রান্সিস বলল–মারিয়া তোমার শরীর ভালো আছে তো?
বেশ ভালো। আমার জন্যে ভেবো না মারিয়া হেসে বলল।
না–মারিয়া–তোমারশরীর ভালো নেই। তুমি যদি বলো তাহলে আর কোথাও আমরা নামবো না। জাহাজ চালিয়ে সোজা দেশে ফিরে যাবো। ফ্রান্সিস বলল।
–ওসব পরে ভেবো। এখন খাবে চলো। মারিয়া বলল।
রাজকুমারী–আমরা আনজুতে রাজার হালে ছিলাম। আমাদের কোনো কষ্ট হয় নি। হ্যারি হেসে বলল।
ফ্রান্সিস বলল–মারিয়া এবারও আমার হাত খালি। মূল্যবান কিছুই আনতে পারিনি।
–তাতে আমার কোনো দুঃখ নেই। মারিয়া বলল। জাহাজে আবার ধ্বনি উঠল—ও হো হো।
রূপোর চাবি
পরিষ্কার আকাশ। বাতাসও বেগবান। ফ্রান্সিসদের জাহাজ দ্রুতগতিতে চলেছে সমুদ্রের ঢেউ ভেঙে। জাহাজের পালগুলো ফুলে উঠেছে। কাজেইদাঁড় টানতে হচ্ছেনা। ভাইকিংরা ডেকের এখানে-ওখানে শুয়ে বসে আছে। গোল হয়ে বসে ছক্কা-পাঞ্জা খেলছে। আর। একদল বসে নিজেদের মধ্যে দেশবাড়ির গল্প করছে। সকলের মধ্যেই বেশ একটা ছুটির মেজাজ।
