গ্রন্থাগারের প্রাচীন গ্রন্থগুলো শুধু–পাতা উল্টে-ই দেখল ফ্রান্সিস। গ্রীক আরবী ভাষায় লেখা সেসব গ্রন্থ ও কী বুঝবে। শুধু প্রাচীন গ্রীক ভাষায় লেখা বাইবেলটার পাতা উল্টে ভালো করে দেখেছে–অনেক জায়গায় দাগ দেওয়া। বোঝাই যাচ্ছে–চার্লস খুব মনোযোগ দিয়ে বাইবেল পড়েছেন। ধর্মগ্রন্থ পাঠ করে অনেকে মনে শান্তি পান। হয়তো চার্লসও মনের শান্তি পেয়েছেন। সাজ্জিও চার্লসের শেষ দিককার জীবনের কথা বলেছেন। গীর্জায় প্রার্থনা করেই সময় কাটতো তার। নিশ্চয়ই যীশুর বাণীর মধ্যে তিনি সান্ত্বনা পেয়েছিলেন সন্দেহ নেই। পালিতা কন্যার মৃত্যুর পর তার মধ্যে বিরাট পরিবর্তন এসেছিল।
গীর্জাটায় ফ্রান্সিস হ্যারি ঘুরে বেড়িয়ে দেখছিল। গীর্জাটার পাথুরে দেওয়ালে কোথাও কোথাও কুঁদে কুঁদে ফুল পাতা পাখির ছবি তোলা হয়েছে। সবচেয়ে জমকালো সুন্দর কাঠের বেদীটা। ঐ বেদীতেই বসানো যীশুর মূর্তি। বেদীতে সূক্ষ্ম নকশার কাজ।
ফ্রান্সিস কাঠ কুঁদে তোলা বেদীর নক্শাগুলো ভালো করে দেখছিল। সাধারণ নশা যেমন হয়। ফুল পাতা পাখি লতাগাছ। দেখতে দেখতে সেই লেখাটায় চোখ পড়ল। বাইবেল থেকে উদ্ধৃতি। সাজ্জিও পড়ে অর্থটা বলেছিলেন। বড়ো গভীর অর্থ উপদেশটির। ডানদিকেও আর একটি উদ্ধৃতি। উদ্ধৃতি দুটো দেখতে দেখতে হঠাৎ ফ্রান্সিসের মনে হল উদ্ধৃতি দু’টোর মাঝখানে লতাফুল পাতা দিয়ে যেন দুটো চোখ খোদাই করা হয়েছে। ফ্রান্সিস মাথা নিচু করে কাছে গিয়ে দেখল সত্যিই একজোড়া চোখ। ফ্রান্সিস আঙ্গুল দিয়ে জায়গাটা দেখাল। হ্যারিও মুখ নিচু করে কাছ থেকে ভালো করে দেখে বলল– ফ্রান্সিস তোমার অনুমান ঠিক। একজোড়া চোখ খোদাই করা হয়েছে। এমনিতে দেখলে ফুল লতাপাতা মনে হবে। ভালো করে দেখলে তবেই বোঝা যাবে।
ফ্রান্সিস বলল-দাঁড়াও সাজ্জিওকে ডেকে আনি। ফ্রান্সিস চলে গেল। একটু পরে সাজ্জিওকে নিয়ে ফিরে এলো।
সাজ্জিও বেদীর কাছে আসতে আসতে বলল–
–আপনারা ভুল দেখেছেন। আমি অনেকদিন এইনকশাগুলো দেখেছি। একজোড়া চোখ আমি কোনোদিন দেখিনি।
–তবু–আজকে এই জায়গাটা ভালো করে দেখুন। বলে ফ্রান্সিস আঙ্গুল দিয়ে সেই জায়গাটা দেখাল। সাজ্জিও খুব কাছে গিয়ে দেখতে দেখতে বলল–আশ্চর্য! সত্যিই একজোড়া চোখ খোদাই করা হয়েছে। কিন্তু এই চোখের সঙ্গে চার্লসের ধনসম্পদের কি সম্বন্ধ।
–নিশ্চয়ই কোনো সম্বন্ধ আছে–ফ্রান্সিস বলল–এবার আপনি বলুন তো এই সব কিছুই কি চার্লসের নির্দেশেই তৈরি হয়েছে?
–হ্যাঁ–চার্লসের তত্ত্বাবধানেই এই গীর্জার সব কিছু নির্মিত হয়েছে। সাজ্জিও বললেন। ফ্রান্সিস বলল–এবার বলুন তো এই চোখ জোড়াকে কেন্দ্র করে কি কোনো উদ্ধৃতি লেখা আছে। সাজ্জিও ভালো করে চোখ জোড়াটা দেখলেন। বললেন–না– কিছু লেখা নেই।
–ঠিক আছে ফ্রান্সিস বলল–মানুষের চোখ নিয়ে বাইবেলে কোনো বাণী আছে?
–থাকতে পারে বৈ কি। সাজ্জিও বললেন।
–তেমন কোনো বাণী কি আপনার মনে আসছে? ফ্রান্সিস বলল। সাজ্জিও চোখ। ঝুঁজে কিছুক্ষণ চুপ করে বলে উঠলেন–একটি বাণী আছে।
–সেটা কী? ফ্রান্সিস জানতে চাইল। সাজ্জিও বললেন–বাণীটির অর্থ হল– “তোমার চোখই হল অন্তর আত্মার প্রদীপ। তোমার চোখের দৃষ্টি যদি নির্মল হয় তবে তোমার সমস্ত সত্তা দীপ্তিময় হবে।” সাজ্জিওর কথাটা শেষ হতেই ফ্রান্সিস চিৎকার করে বলে উঠল–সাজ্জিও হ্যারি–এই বেদীর মধ্যেই আছে চার্লসের গুপ্ত ধনসম্পদ।
সাজ্জিও বলে উঠলেন–এটা আপনার কেন মনে হল?
–দেখুন সাজ্জিও ফ্রান্সিস বলতে লাগল–আমার প্রথম থেকেই নিশ্চিত ধারণা হয়েছিল–চার্স প্রতিষ্ঠিত এই গীর্জা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চার্লস তার ধনসম্পদ গোপনে রেখেছেন। তিনি তার জন্যে এই গীর্জাকেই বেছে নিয়েছেন। সূত্র রেখেছেন বাইবেলের তৃতীয় উদ্ধৃতির মধ্যে। সেটা তিনি এখানে লেখান নি। যাঁরা প্রকৃত যীশুভক্ত তাদের কারো না কারো নজরে এই চোখ দুটো পড়বেই। সঙ্গে সঙ্গে যীশুর উপদেশবাণীও মনে পড়বে। খোদাই করা জোড়া চোখের গুরুত্ব তিনি বুঝতে পারবেন। এতদিন সেটা কেউ বোঝেন নি। আজ আমরা বুঝলাম।
–তাহলে তো বেদী ভেঙে দেখতে হয়। সেটা সম্ভব নয়। রাজা পিটারও রাজি হবেন না। সাজ্জিও বললেন।
–বেদি ভাঙা হোক এটা চার্লসও চান নি। কাজেই তিনি সহজ পথটাই রেখেছেন। –এই খোদাই করা চোখ জোড়া। ফ্রান্সিস বলল। তার পর দুটো আঙ্গুল চোখ জোড়ায় রেখে একটু চাপ দিল। চোখ জোড়া খসে পড়ল। ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে ভাঙা চোখের ফাঁক দিয়ে ভেতরে তাকাল। অন্ধকার। কিছুই নজরে পড়ছে না।
–কিছু দেখতে পাচ্ছেন? সাজ্জিও বললেন।
–অন্ধকারটা একটু সয়ে আসার সময় দিন। ফ্রান্সিস বলল।
সময় বয়ে চলল।ফ্রান্সিস তাকিয়েই আছে। আস্তে আস্তে ভেতরের অন্ধকারটা চোখে সয়ে আসতে ফ্রান্সিস আবছা একটা সোনার রত্নখচিত হারের অংশ দেখতে পেল। চোখ সরিয়ে ফ্রান্সিস বলে উঠল-সাজ্জিও–আমার অনুমান নির্ভুল। আপনি তাকিয়ে দেখুন। সাজ্জিও চোখের মত ফোকরটায় চোখ রাখলেন। অন্ধকারটা সয়ে আসতে তিনিও সেই রত্নখচিত হারের একাংশ দেখতে পেলেন। চোখ সরিয়ে এনে সাজ্জিও বললেন ঠিক। রত্নখচিত সোনার হার। কিন্তু শুধু একটা হারই কি চার্লসের সব ধনসম্পদ।
