শাঙ্কোরা ধরে ধরে কয়েকজন সৈন্যকে জলে ছুঁড়ে ফেলল।
রাজা পিটারের সৈন্যদের কয়েকজন সিঁড়ি বেয়ে অস্ত্রঘরের কাছে ছুটে এলো। দেখল সর্দারের সৈন্যরা অস্ত্রাগার পাহারা দিচ্ছে খোলা তলোয়ার হাতে। ওরা বুঝল যে প্রাণ সংশয়। তাড়াতাড়ি ওপরে ডেক-এ উঠে এলো। ততক্ষণে কেবিনঘর থেকে রাজা পিটারের সৈন্যরা ডেক-এ উঠে এলো। উঠেই পড়ল আক্রমণের মুখে। সর্দারের সৈন্যরা ওদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। এলোপাথারি তলোয়ার চালাতে লাগল। রাজা পিটারের সৈন্যরা অসহায় অবস্থায় মারা যেতে লাগল।
ওদিকে ভাইকিংরা রাজা পিটারের নিরস্ত্র সৈন্যদের ধরে ধরে জলে নিক্ষেপ করতে লাগল। যুদ্ধটা হল এক তরফা। নিরস্ত্র সৈন্যদের সঙ্গে সশস্ত্র সৈন্যদের লড়াই।
অল্পক্ষণের মধ্যেই রাজা পিটারের সৈন্যরা হার স্বীকার করল। ওরা দু’হাত ওপরে তুলে ডেক-এর একপাশে দাঁড়াল।
সর্দার চিৎকার করে বলে উঠল–এইক’টাকে হত্যা করো। রাজা পিটারের সৈন্যদের মুখ শুকিয়ে গেল। ওরা বুঝল–আর বাঁচার আশা নেই।
তখনই শাঙ্কো এক লাফে রাজা পিটারের সৈন্যদের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সর্দারের দিকে তাকিয়ে বলল–তোমাদের নিষ্ঠুরতার নমুনা দেখেছি। এখন এই সৈন্যরা যারা আত্মসমর্পণ করেছে তাদের হত্যা করতে চাও। আমরা তা হতে দেব না। যদি রাজা পিটারের নিরস্ত্র সৈন্যদের আক্রমণ করো তবে আমরা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামবো। সাহস থাকে এগিয়ে এসো।
সর্দার বুঝল–আবার এক লড়াইয়ে নামতে হবে। তাতে বিপদই বাড়বে। জাহাজ দখল করতেই ওরা এসেছিল সেটা তো হয়ে গেছে। সর্দার বলল ঠিক আছে এদের কয়েদঘরে নিয়ে রাখো।
সর্দারের সৈন্যরা এগিয়ে এলো। রাজা পিটারের সৈন্যদের ঘিরে দাঁড়াল। তারপর নিয়ে চলল নীচে নামার সিঁড়ির দিকে। রাজা পিটারের যে সৈন্যরা বেঁচেছিল তাদের সবাইকে কয়েদঘরে বন্দি করে রাখা হল।
এবার সর্দার আস্তে আস্তে শাঙ্কোদের কাছে এলো। দেখে বলল-তোমরা এই জাহাজেই থাকবে। আরো কিছু লোক জোগাড় করে সৈন্যসংখ্যা বাড়াবো। তারপর সেন্ট অ্যাঞ্জেলা দুর্গ অধিকার করবো। আনগেভিনকে মুক্ত করবো। তোমরা আমাদের হয়ে লড়াই করবে।
–যদি লড়াই না করি? শাঙ্কো বলল।
–তাহলে তোমাদের কয়েদঘরে আটকে রাখা হবে। সর্দার বলল।
শাঙ্কো, সঙ্গে সঙ্গে গলা চড়িয়ে ওদের দেশের ভাষায় বলে উঠল–ভাইসব জলে ঝাঁপিয়ে পড়ো। জলদি।
ভাইকিংরা সঙ্গে সঙ্গে কোমরে তলোয়ার খুঁজে রেলিঙ ডিঙিয়ে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়তে লাগল। সবশেষে দলে শাঙ্কো ছিল। সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ল।
শাঙ্কো গলা চড়িয়ে বলল–তীরের দিকে চলল। জাহাজের সর্দার আর সৈন্যরা বোকার মতো তাকিয়ে রইল।
শাঙ্কো সাঁতার কাটতে লাগল। তখনই সূর্য উঠল। গাঢ় কমলা রং সূর্যের। সমুদ্রের ঢেউ-ওঠা জলে সূর্য প্রথমেই সবটা উঠল না। নীচের দিকে একটা ফোঁটামতো জলের মধ্যে আটকে রইল। একটু পরে সেটা ওপরে উঠে সূর্যের সঙ্গে মিশে গেল।
শাঙ্কোরা সাঁতারে চলল তীরের দিকে।
সমুদ্রতীরে যখন শাঙ্কোরা পৌঁছল তখন সবাই হাঁপাচ্ছে। জল থেকে উঠে অপরিসর সৈকতে এসে দাঁড়াল। শাঙ্কো গলা চড়িয়ে বলল–এবার আমাদের জাহাজের দিকে চললো।
অপরিসর সৈকতভূমি দিয়ে শাঙ্কোরা হেঁটে চলল। কিছুটা গেল। আর সৈকতভূমি নেই। শাঙ্কোরা তীরে উঠল। ঝোঁপঝাড়ের মধ্যে দিয়ে ওরা ওদের জাহাজের দিকে লক্ষ্য রেখে চলল।
একসময় শাঙ্কোরা ঝোঁপজঙ্গলের মধ্যে দিয়ে হেঁটে ওদের জাহাজের কাছে এল। পাতা পাটাতন দিয়ে হেঁটে গিয়ে জাহাজে উঠল।
মারিয়া আর বিস্কো ছুটে এলো। পেছনে পেড্রো। সবাই ধ্বনি তুলল-ও-হো-হো।
শাঙ্কোরা কেবিনঘরে চলে গেল। ভেজা পোশাক ছাড়তে।
শুকনো পোশাক পরে শাঙ্কো ডেক-এ উঠে এলো। মারিয়া এগিয়ে এলো। বলল– এখন কী করবে?
–আমরা জাহাজটা চালিয়ে খাঁড়ির আরো ভেতরে চলে যাব। জাহাজ লুকিয়ে রাখবো। তারপর ফ্রান্সিসদের জন্যে অপেক্ষা করবো।
শাঙ্কো সবার দিকে তাকিয়ে গলা চড়িয়ে বলল–সবাই হাত লাগাও। পাল তুলে দাও দাঁড়ঘরে দাঁড় টানতে যাও আমরা এই খাঁড়ির আরো ভেতরে চলে যাবো যাতে আমাদের জাহাজ কারো নজরে না পড়ে।
পাল তোলা হল। দাঁড় বাওয়া চলল। জাহাজ খাঁড়ির আরো ভেতরে ভেসে চলল।
একসময় খাঁড়ির দু’ধারের গভীর বনের গাছপালা দু’পাশ থেকে ঝুঁকে পড়েছে দেখা গেল। শাঙ্কো গলা চড়িয়ে পেট্রোকে বলল-পেড্রো মাস্তুলে উঠে দেখো তো জাহাজটা বনজঙ্গলের আড়ালে পড়েছে কি না।
পেড্রো দ্রুত মাস্তুল বেয়ে একেবারে মাথায় উঠে গেল। চারপাশ দেখে নেমে এলো। একটু হাঁপিয়ে বলল–আমাদের জাহাজটা দুপাশের জঙ্গলে একেবারে ঢাকা পড়ে গেছে কারো নজরে পড়বে না।
জাহাজটা ওখানেই নোঙর ফেলল। এবার ফ্রান্সিসদের জন্যে প্রতীক্ষা।
ফ্রান্সিস আর হ্যারি ফিরে এলেই জাহাজ ছাড়া হবে ওদের দেশের দিকে।
এখন শুধুই প্রতীক্ষা। এখন আলগেভিন আর রাজা পিটারের সৈন্যরা ওদের খোঁজ পাবে না।
.
ওদিকে গীর্জাটা ভালো করে দেখে ফ্রান্সিস হ্যারি সাজ্জিও গীর্জার বাইরে এলো। সাজ্জিও বললেন–রাজা পিটার আমাদের চার্লসের প্রাসাদেই থাকবার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।
–ভালোই হয়েছে। এতে আমাদের খোঁজাখুঁজির কাজ ভালোভাবেই চলবে।ফ্রান্সিস বলল।
তিনদিন কেটে গেল। ফ্রান্সিসরা চার্লসের প্রাসাদেই রইল। অঢেল সুস্বাদু খাবার। বড়ো পালকের শয্যায় শোয়া।ফ্রান্সিসদেরসময় ভালোভাবেই কাটতে লাগল। কিন্তু ফ্রান্সিসের নজর নেই এইসব বিলাসবহুল জীবনের প্রতি। ও সর্বক্ষণ নিজের চিন্তায় বিভোর। ওর দৃঢ় বিশ্বাস চার্লস কোথাও না কোথাও গুপ্ত ধনসম্পদের সূত্র রেখে গেছেন। ওরা সেই সূত্র খুঁজে পাচ্ছে না। ফ্রান্সিস প্রাসাদের সর্বত্র খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছে। কিন্তু সূত্র হিসেবে কাজে লাগে এমন কিছুই খুঁজে পেল না।
