মারিয়া জাহাজে উঠেই বলল–বিস্কো–আগে খাবারদাবারের ব্যবস্থা করো। খিদেয় পেট জ্বলছে। পেড্রো বলল–রাজকুমারী আপনি শুয়ে বসে বিশ্রাম করুন। আমিই রান্না চাপাচ্ছি।
–তুমি পারবে? মারিয়া বলল।
–আমার বেশিরভাগ সময়ই তো কাটে মাস্তুলের মাথায়। তবু একবার গন্ধ পেলে আমি ঠিক বলে দেব আজকে কী রান্না হচ্ছে। পেড্রো বলল।
তাই নাকি? মারিয়া এত দুশ্চিন্তার মধ্যেও পেড্রোর এই গুণ শুনে হেসে ফেলল। পেড্রো হেসে বলল রাজকুমারী আপনি খুশির হাসি হাসলে আমরা যে কী খুশি হই তা বলে বোঝাতে পারবো না। কিন্তু আপনার বিষণ্ণ চিন্তাকুল মুখ দেখলে আমরা সবচেয়ে বেশি দুঃখ পাই। কথাটা শুনে মারিয়া আবার হাসল।
–আপনি আপনার কেবিনঘরে গিয়ে বিশ্রাম করুন। কথাটা বলে পেড্রো চলল রসুইঘরের দিকে।
ওদিকে ভালো ঘরটায় এসে শাঙ্কোরা দেখল ঘরে শুকনো ঘাসপাতা দড়ি দিয়ে নিপুণভাবে বেঁধে বিছানামতো করা হয়েছে। তাতেই সৈন্যরা শুয়ে বসে আছে। ঘরটা বেশ বড়ো। ওপরে ছাদটা এখনও ভেঙে পড়েনি। অনেক খোলামেলা ঘর।
শাঙ্কোরা জায়গা করে নিয়ে বসল। কেউ কেউ শুয়ে পড়ল।
এখন কিছুই করার নেই। শুধু রাতের জন্যে প্রতীক্ষা।
রাত হল। রাতের খাওয়া তাড়াতাড়িই দেওয়া হল। এঘরে আসার সময় দু’জন পাহারাদার শাঙ্কোদের হাতে বাঁধা দড়ি কেটে দিয়েছিল। খোলা হাতেই শাঙ্কোরা রাতে খাবার খেয়ে নিল। তারপর বিছানায় শুয়ে পড়ল। সর্দারের সৈন্যরা শাঙ্কোরা সবাই একে একে শুয়ে পড়ল। কিন্তু ঘুমুলো না কেউ।
রাত গম্ভীর হল।
তখনই সর্দার এলো। সবাই উঠে দাঁড়াল। সবাই সর্দারের নির্দেশে অস্ত্রঘরে চলল। সবাই তলোয়ার নিয়ে কোমরে গুজল। কাউকে বর্ম শিরস্ত্রাণ পরতে দেওয়া হল না। পাথরের বাড়িটা থেকে বেরিয়ে এলো সবাই। পায়েচলা পথটা ধরে চলল।
চাঁদের আলো উজ্জ্বল নয়। বনজঙ্গলের মাথার ফাঁক দিয়ে জোছনা পড়েছে এখানে ওখানে। সমুদ্রের দিক থেকে জোর হাওয়া আসছে। হাঁটতে হাঁটতে শাঙ্কো ওদের দেশীয় ভাষায় গলা চড়িয়ে বলল-এ লড়াই আমাদের লড়াই নয়। পাকেচক্রে এই লড়াইয়ে আমরা জড়িয়ে গেছি। আমরা কাউকে আগ বাড়িয়ে হত্যা করবো না। তবে জীবন বিপন্ন হলে আত্মরক্ষার জন্যে হত্যা করতেই হবে। আমরা যথাসাধ্য সাবধানে লড়াই করবো যাতে আমরা অক্ষত থাকতে পারি। অপরপক্ষ আমাদের শত্রু নয়। কাজেই জীবন বিপন্ন করে আমরা লড়তে যাবো কেন? আমাদের প্রথম এবং শেষ কথা আত্মরক্ষা। শাঙ্কোর কথা বুঝতে না পেরে সর্দার বলল তোমার বন্ধুদের কী বললে?
–এই কীভাবে লড়তে হবে। শত্রুপক্ষ বর্ম শিরস্ত্রাণ পরে লড়াই করবে। কাজেই সাবধানে লড়াই করতে হবে। এসব শাঙ্কো বলল।
–সে তো ঠিকই। সর্দার বলল।
সর্দারের সঙ্গে কথা হল না আর। সবাই নিশ্চুপ হেঁটে চলেছে ঝোঁপঝাড় জঙ্গলের মধ্য দিয়ে।
সমুদ্রের দিক থেকে জোর হাওয়া বইছে। সমুদ্রের শব্দ আস্তে আস্তে বাড়তে লাগল।
একসময় সমুদ্রের তীরে পৌঁছল সবাই। অল্প জোছনায় দেখল আনগেভিনের জাহাজটা বেশ দূরে সমুদ্রের জলে ভাসছে। কখনও কখনও কুয়াশায় ঢাকা পড়ে যাচ্ছে জাহাজটা।
সর্দার বলল–আমরা সমুদ্রের ধারে ধারে আরো কিছুদূর যাবো। যতটা সম্ভব জাহাজটার কাছাকাছি যাবো। তারপর জলে নেমে সাঁতরে গিয়ে জাহাজে উঠব।
এখানে সমুদ্রের সৈকতে ছোটো মাপের বালিয়াড়ি অনেক দূর চলে গেছে। সবাই উঁচু তির থেকে বালিয়াড়িতে নেমে এলো। চলল বালিয়াড়ি দিয়ে।
কারো মুখে কথা নেই। একটানা সমুদ্রের বাতাস শোঁ শোঁ শব্দ তুলে ছুটে আসছে।
একসময় ওরা জাহাজটার কাছাকাছি এলো।–সাঁতরে গিয়ে জাহাজে উঠতে হবে। সর্দার বলল–কোনো শব্দ যেন না হয়।
সর্দারের সৈন্যরা ভাইকিংরা জলে নামল। জলে কোনোরকম শব্দ না তুলে সবাই সাঁতরে চলল জাহাজটার দিকে।
দূরত্বটা খুব কম নয়। সর্দারের সৈন্যরা হাঁপিয়ে গেল। ভাইকিংরা সমুদ্রের সঙ্গে আজন্ম পরিচিত। সমুদ্রের জলে সাঁতার কাটা ওদের ছোটোবেলা থেকে অভ্যেস।
কয়েকটা নীলচে কুয়াশার আস্তরণ পার হয়ে শাঙ্কোরা সবার আগে জাহাজের কাছে পৌঁছল। দেখল–কেবিনে জানলার সিঁড়ির মাথায় একটা কাঁচে ঢাকা লণ্ঠন। জাহাজের আর কোথাও আলো নেই।
এবার জাহাজে উঠল। শাঙ্কো জাহাজের হালের কাছে এলো। দেখল কিছু দড়িদড়া ঝুলছে। শাঙ্কো হালের খাঁজে পা রেখে উঠে পড়ল। অস্পষ্ট চাঁদের আলোয় শাঙ্কো হাত দিয়ে ঝুলন্ত দড়িদড়া দেখাল।
এবার সবাই দড়ি ধরে ধরে জাহাজে উঠে পড়তে লাগল। হালের দিক থেকে সবাই ভেক-এর কাছে এলো। দেখল পনেরো কুড়িজন রাজা পিটারের সৈন্য ডেক-এ ঘুমিয়ে আছে।
সর্দার দু’তিনজন সৈন্যকে কানের কাছে বলল–সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামো। অস্ত্রঘরের সামনে গিয়ে পাহারা দাও যাতে কেউ অস্ত্র আনতে না পারে। সৈন্য ক’জন চলে গেল।
বোঝা গেল–এই জাহাজে বেশি পাহারাদার সৈন্য রাখা হয় নি।
সর্দার হাঁপাতে হাঁপাতে চিৎকার করে বলে উঠল–সব কটাকে হত্যা করো। শাঙ্কো সঙ্গে সঙ্গে ওদের দেশীয় ভাষায় বলে উঠল-কাউকে হত্যা করো না। জলে ছুঁড়ে ফেল।
রাজা পিটারের সৈন্যদের ঘুম ভেঙে গেল। ডেক-এ যারা ঘুমিয়েছিল তারা ঘুম ভেঙে উঠেদাঁড়াল। নিরস্ত্র তাদের ওপর সর্দারের সৈন্যরা ঝাঁপিয়ে পড়ল। রাজা পিটারের নিরস্ত্র সৈন্যরা অসহায় অবস্থায় মারা যেতে লাগল। আর্ত চিৎকার গোঙানি শোনা যেতে লাগল।
