–কারণ আমরা তোমাদের সাহায্য চাই। সর্দার বলল।
–একবার তো লড়াইয়ের সময় সাহায্য করেছি। আবার কীসের সাহায্য? শাঙ্কো বলল।
–আমরা আমাদের জাহাজটা পিটারের সৈন্যদের হাত থেকে মুক্তি করে নিয়ে আসবো। সদার বলল।
–আমরা আর তোমাদের সাহায্য করবো না। এসব তোমাদের সমস্যা। তোমরা নিজেরাই মিটিয়ে নাও। আমরা এখন দেশের দিকে জাহাজ চালাবো। শাঙ্কো ক্রুদ্ধস্বরে বলে উঠল।
–না–আমাদের সঙ্গে যোগ দিন জাহাজ উদ্ধার করতে সাহায্য করতে। তারপর দেশে ফিরে যাবেন তার আগে নয়।
–আমরা তোমাদের সাহায্য করবো না। শাঙ্কো বলল।
–এটাই তোমাদের শেষ কথা? সর্দার বলল।
–হ্যাঁ–শাঙ্কো বলল।
–তাহলে তোমাদের বন্দি করে নিয়ে যাবো। আমাদের আস্তানায় তোমরা বন্দি থাকবে। সর্দার বলল।
–ঠিক আছে–আমাদের বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলে নিই।
বেশ। কথা বলো।
ততক্ষণে যারা জাহাজের কেবিনঘরে ছিল তাদেরও বন্দি করে আনা হয়েছে। সবাই ডেক-এর ধারে ধারে দাঁড়িয়ে আছে। সর্দারের সৈন্যরা সবাইকে খোলা তলোয়ার হাতে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। শুধু মারিয়া একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে।
শাঙ্কো বিস্কোকে ডাকল। বিস্কো কাছে এলো। শাঙ্কো সর্দারের সঙ্গে যা যা কথা হয়েছে সব বলল। তারপর বলল–এখন কী করা যায়?
–আনগেভিনের জন্যে আমরা যুদ্ধ করতে যাবো কেন? বিস্কো বলল।
–তাহলে কি আমরা বন্দি হয়েই থাকবো? শাঙ্কো বলল।
–তাই থাকবো। বিস্কো বলল।
শাঙ্কো সর্দারের কাছে ফিরে এলো। বলল–আমরা বন্দি থাকবো।
–বেশ। সর্দার গলা চড়িয়ে বলল–সবাইকে হাত বেঁধে আমাদের আস্তানায় নিয়ে চলো।
–সবাইকে নয়। আমাদের দেশের রাজকুমারীকে এই জাহাজেই রাখতে হবে। বিস্কো বলল।
–না–সর্দার গলা চড়িয়ে বলল–সবাইকে আমাদের আস্তানায় বন্দি হয়ে থাকতে হবে।
মারিয়া শাঙ্কোর কাছে এলো। বলল–আমাকে নিয়ে ভেবো না। আমি অনায়াসেই ওখানে থাকতে পারবো।
–বেশ। শাঙ্কো বলল।
তখন ভোর হয়েছে। জঙ্গলের পাখিগুলো ডাকতে শুরু করেছে। রোদ পড়ল সমুদ্রে জঙ্গলের মাথায়।
সর্দারের সৈন্যরা ফ্রান্সিসদের জাহাজের মালখানা থেকে দড়ি জোগাড় করল। ছোটো ছোটো করে দড়ি কেটে নিয়ে ভাইকিংদের হাত বাঁধলো। শুধু মারিয়ার হাত বাঁধা হল না।
সবাইকে তক্তার ওপর দিয়ে হাঁটিয়ে তীরে আনা হল। ঝোঁপজঙ্গলের মধ্যে দিয়ে সবাই চলল। সর্দারে সৈন্যরা খোলা তলোয়ার হাতে পাহারা দিয়ে ভাইকিংদের নিয়ে চলল।
কিছুদূর এসে পায়েচলা পথটা দেখা গেল। সেই পথ দিয়ে উত্তরমুখে চলল সবাই।
যেতে যেতে শাঙ্কো বলল–ঐ পাথরের বাড়িটায় দরজা জানালা নেই। ওদের হাত বেঁধে রাখা হবে। ভাববার কিছু নেই। ছোরা দিয়ে দড়ি কেটে মুক্ত হওয়া যাবে। তারপর ভাঙা দরজা দিয়ে পালানো যাবে। নিজেদের জাহাজে ফিরে আসা যাবে। কারণ তখন কোনো পাহারাদার থাকবে না। আনগেভিনের সব সৈন্যই জাহাজ তখল করতে যাবে।
সবাই ভাঙা পাথরের বাড়ির সামনে এলো। বাড়িতে ঢুকল সবাই। শাঙ্কো তখন বুঝল ও বাড়িটা ছোটো ভেবেছিল। আসল বাড়িটা বেশ বড়ো।
সর্দার শাঙ্কোদের নিয়ে এলো একটা বেশ বড়ো ঘরের কাছে। শাঙ্কো দেখল ঘরটার কাঠের দরজা অটুট আছে। সর্দার দরজাটা খুলে দিল। শাঙ্কোদের ঢোকানো হল সেই ঘরটায়।
ঘরের ভেতর ঢুকে শাঙ্কো দেখল–ঘরটার কোনো জানালা নেই। ওপরে ঘুলঘুলিমতো। ওটা দিয়েই আলো হাওয়া আসছে।
শাঙ্কো হতাশ হল। এখান থেকে কী করে পালাবো? শাঙ্কো এবার বুঝতে পারল ফ্রান্সিস আর হ্যারি কাছে না থাকলে ওরা কতটা অসহায়।
বিছানা বলতে শুনো ঘাসপাতা মেঝেটায় বিছোনো। ভাইকিংরা কেউ বসল কেউ কেউ শুয়ে পড়ল। রাতের ঘুমটা হয় নি। এখন ঘুমোনো যাবে।
কিছুক্ষণ পরে ঘরটার দরজা খুলে গেল। সর্দার ঢুকল। হেসে বলল–এখানকার এক মস্তবড়ো জমিদারের প্রাসাদ ছিল এটা। কোনো প্রজা জমিদারের বিরুদ্ধে গেলে খাজনা না দিতে পারলে এই ঘরে তাদের বন্দি করে রাখা হত। এটাকে কয়েদঘরও বলতে পারো।
–এসব শুনে আমাদের লাভ? বিস্কো বলল।
লাভ এই যে তোমরা এমন একটা ঘর থেকে কোনোদিনই পালাতে পারবে না–এটা জানানোর জন্যেই এত কথা বলা। সর্দার বলল।
-ঠিক আছে। আমাদের সকালের খাবারের ব্যবস্থা করো। শাঙ্কো বলল।
-হা-হা সকালের খাবার তৈরি হচ্ছে। তোমাদের জাহাজ থেকে আটা ময়দা এসব আনা হয়েছে। একটু পরেই খেতে দেওয়া হবে। সর্দার বলল।
সর্দার এবার বলল–আমাদের জাহাজ উদ্ধারের কাজে তোমরা সাহায্য করতে পারতে। এই বন্দি দশা তোমরা ইচ্ছে করেই মেনে নিলে।
–ঠিক তাই–তোমাদের আমরা কোনোমতেই সাহায্য করবো না। তোমাদের পক্ষে যুদ্ধ করতে গিয়ে আমরা বন্ধুকে হারিয়েছি। আর না। শাঙ্কো বলল।
সর্দার আর কোনো কথা না বলে চলে গেল।
কিছুক্ষণ পরে সকালের খাবার দেওয়া হল। পোড়া পোড়া রুটি আর আনাজের ঝোল। শাঙ্কোরা তাই খেতে লাগল।
দু’জন সৈন্য একটা জলের পীপে এনে ঘরের কোণায় রাখল। খাবার খেয়ে জল খেল সবাই। সৈন্যরা চলে গেল। বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দিল।
মারিয়া ঘরের এক কোণে দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসেছিল। এবার একটু গলা চড়িয়ে ডাকশাঙ্কো।শাঙ্কো তাড়াতাড়ি মারিয়ার কাছে এলো। বলল রাজকুমারী আপনার কি কষ্ট হচ্ছে।
না–আমার কোনো কষ্ট হচ্ছে না–মারিয়া বলল–আমাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ো না।
–কিছু বলবেন? শাঙ্কো জিজ্ঞেস করল।
