কিছুক্ষণ হেঁটে এগোতেই দেখল এখানে ঝোঁপজঙ্গল কম। বিরাট বিরাট সব গাছ।
শাঙ্কো চারিদিকে তাকিয়ে দেখছে তখনই নজরে পড়ল একটা পায়ে চলা পথ উত্তরদিকের জঙ্গলে ঢুকে গেছে। শাঙ্কো আশ্চর্য হল। এরকম জায়গায় তাহলে লোকজন যাওয়া-আসা করে। শাঙ্কোর বন্ধুটিও তখন অবাক। বলল–শাঙ্কো, মনে হচ্ছে এখানে লোকবসতি আছে।
–ভাবছি রাস্তাটা ধরে যাবো কিনা। শাঙ্কো বলল। বন্ধুটি চারদিকেতাকিয়ে বলল শাঙ্কো–দেখো অন্ধকার নেমে আসছে। আর না এগিয়ে চলো জাহাজে ফিরে যাই।
“তুই একটা ভীতুর ডিম। তুই চলে যা। আমি একাই যাবো। শাঙ্কো বলল।
না-না। বন্ধুটি বলল-শাঙ্কো জীবনের ঝুঁকিনিও না। ফিরে চললা। বন্ধুটি শাঙ্কোকে বারবার সাবধান হতে বলল। কিন্তু শাঙ্কো কথা শুনলো না। পায়েচলা পথটা ধরে এগোতে লাগল। অগত্যা বন্ধুটিও শাঙ্কোর পেছনে পেছনে চলল। একটু এগোতেই জঙ্গল শুরু হল। জঙ্গল খুব ঘন নয়। ছাড়া ছাড়া গাছপালা।
সন্ধে হতে দেরি নেই।পাখপাখালি বাসায় ফিরেছে। পাখির ডাকে এলাকাটা ভরে উঠেছে।
কিছুটা এগিয়ে গেল দু’জনে। হঠাৎ শাঙ্কো দাঁড়িয়ে পড়ল। কয়েকটা গাছের ফাঁক দিয়ে দেখা গেল একটা পাথরের বাড়ি। বন্ধুটি বলল–শাঙ্কো কী হল? শাঙ্কো নিঃশব্দে আঙ্গুল তুলে পাথরের বাড়িটা দেখাল। বন্ধুটিও অবাক হল। এই জঙ্গলে পাথরের বাড়ি? শাঙ্কো বলল–তুমি এখানে থাকো। আমি আড়াল থেকে দেখে আসি এটা পোড়ো বাড়ি না লোকজন থাকে। বন্ধুটি দাঁড়িয়ে রইল।
শাঙ্কো গাছপালার আড়ালে আড়ালে বাড়িটার কাছে গেল। কান পাতল। অস্পষ্ট কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে। শাঙ্কো বুঝল বাড়িটায় লোজন আছে। এরা কারা? বাড়িটা পাথরের। মাথায় পাথরের ছাদ। দরজা জানালা ভাঙা। পাথরের কালচে দেয়াল এখানে ওখানে ধসে পড়েছে। একটা জানালা দিয়ে মশালের আলো দেখা যাচ্ছে।
আর একবার ভালো করে চারদিক দেখে নিয়ে শাঙ্কো বন্ধুর কাছে ফিরে এলো। বলল–যতটা পারলাম দেখলাম। এখানে কিছু লোক রয়েছে। তারা কারা বুঝতে পারলাম না। চলো–আর কিছু দেখার নেই।
দু’জনে ফিরে চলল। কিছুটা গিয়ে ওরা পায়েচলা পথ ছেড়ে ডানদিকের ঝোঁপঝাড়ে ঢুকল। গাছ ঝোঁপঝাড় পার হয়ে ওরা খাঁড়ির ধারে এলো। দেখল ওদের জাহাজটা বেশ কিছুটা উত্তরদিকে জলে ভাসছে।
দু’জনে তির ধরে ঝোঁপজঙ্গলের মধ্যে দিয়ে তীরে এলো যেখানে ওদের জাহাজটা রয়েছে।
পাতা পাটাতনে দিয়ে দু’জনে যখন জাহাজে উঠল তখন সন্ধে হয়ে এসেছে।
বিস্কো আর কয়েকজন ভাইকিং ছুটে এলো। বিস্কো বলল–শাঙ্কো তোমাদের জন্যে আমাদের খুব ভাবনা হয়েছিল। কোথায় গিয়েছিলে?
জাহাজ থেকে নেমে একটু ঘুরেফিরে দেখছিলাম। শাঙ্কো বলল।
কী দেখলে? শুধু ঝোঁপজঙ্গল? বিস্কো বলল।
–হ্যাঁ ঝোঁপজঙ্গলের মধ্যে একটা পাথরের বাড়ি। শাঙ্কো বলল।
-বলো কি? এই ঝোঁপজঙ্গলের মধ্যে বাড়ি? তবে পোড়ো বাড়ি থাকতেও পারে। বিস্কো বলল।
পোড়ো বাড়ি নয়। লোকজনও রয়েছে। শাঙ্কো বলল।
আশ্চর্য! কারা থাকে ওখানে? বিস্কো বলল।
–সেটাই তো বুঝতে পারলাম না। শাঙ্কো বলল।
বোধহয় চোর ডাকাতের দল। বিস্কো বলল।
“উঁহু-চোর ডাকাতরা অত গলা তুলে খোশগল্প করে না। শাঙ্কো বলল।
–কোন্ ভাষায় ওরা কথা বলছিল? একজন ভাইকিং জানতে চাইল?
–ওরা এখানে প্রচলিত গ্রীক ভাষাতেই কথা বলছিল। শাঙ্কো বলল।
–ভাগ্যিস তোমাদের ওরা দেখতে পায় নি। বিস্কো বলল।
–হ্যাঁ আমরা গাছের আড়াল থেকে সব দেখেশুনে দ্রুত চলে এসেছি।শাঙ্কো বলল।
–তাহলে ওরা কারা তা তো বোঝা গেল না।
–ওরা এই দেশেরই নোক এটা বোঝা গেল। এখন এরা আমাদের সম্পর্কে বা আমাদের জাহাজ সম্পর্কে কিছু জানে কিনা জানি না। এরা আমাদের শত্রু বা মিত্র তাও জানার উপায় নেই। শাঙ্কো বলল।
–ঠিক আছে। আমরা কিন্তু এই জায়গা ছেড়ে যাবো না। বিস্কো বলল।
দেখা যাক–আমাদের আবার কোনো বিপদ হয় কি না। শাঙ্কো বলল।
ভাইকিংদের রাতের খাওয়া শেষ হল। সবাই জাহাজের ডেক-এ কেবিনঘরে ঘুমিয়ে পড়ল। শাঙ্কো, জঙ্গলের মধ্যে বাড়ি। লোকজন থাকে–ওখানে যারা থাকে তারা কারা। এসব নিয়ে ভাবতে ভাবতে শাঙ্কোর দু’চোখ ঘুমে জড়িয়ে এলো।
তখন শেষ রাত। চাঁদের ম্লান আলোয় দেখা গেল একদল সৈন্য তীরের ঝোঁপঝাড়ের মধ্যে দিয়ে এসে দাঁড়াল। তারপর পাতা কাঠের পাটাতন দিয়ে হেঁটে ফ্রান্সিসদের জাহাজের ডেক-এ উঠে এলো। কোনোরকম শব্দ না করে চারজন সৈন্য সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে অস্ত্রঘরের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল যাতে ভাইকিংরা কেউ অস্ত্র হাতে না পায়।
এবার সৈন্যদের সর্দার ডেক-এ ঘুমিয়ে থাকা ভাইকিংদের ঘুম ভাঙাতে বলল। সৈন্যরা ভাইকিংদের একে একে তলোয়ারের খোঁচা দিয়ে জাগাতে লাগল। এই ভাইকিংদের মধ্যে শাঙ্কো ঘুমিয়ে ছিল। তরোয়ালের খোঁচায় ঘুম ভেঙে সৈন্যদের দেখল। সৈন্যদের মধ্যে সৈন্যদের সর্দারকেও দেখল। গালে চিবুকে সামান্য দাড়িওয়ালা সর্দারকে দেখেই চিনল। বুঝল এরা আনগেভিনের সৈন্য। এরাই যুদ্ধে হেরে এসে জঙ্গলের মধ্যে পাথরের বাড়িটায় আশ্রয় নিয়েছে।
শাঙ্কো উঠে দাঁড়াল। সর্দারের কাছে গেল। বলল–তুমিই তো আলগেভিনের সৈন্যদের সর্দার?
–তাহলে চিনতে পেরেছো। সদার হেসে বলল।
–হ্যাঁ–কিন্তু আমাদের এভাবে বন্দি করা হচ্ছে কেন? শাঙ্কো জানতে চাইল।
