মুখটা একটু ঝুঁকে পড়েছে। ফ্রান্সিস আর হ্যারি দু’জনেই মন্ত্রমুগ্ধের মতো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
সাজ্জিও বললেন–মূর্তিটা দেখে একটু অবাক হয়েছেন–তাই না।
–হ্যাঁ–সত্যি এত বড়ো আর এত সজীব মূর্তি আমরা কখনো দেখিনি। হ্যারি বলল।
–মান্যবর চার্লসের নির্দেশেই এই মূর্তি নির্মিত হয়েছে। তিনি শুধু খ্রীস্ট ভক্তই ছিলেন না। তার শিল্পবোধেরও প্রশংসা করতে হয়। সাজ্জিও বললেন।
তিনজনে বেদীর সামনে এসে দাঁড়াল। সাজ্জিও বললেন–কাঠের বেদীতে কত কারুকাজ দেখুন। সত্যিইফ্রান্সিসরা দেখে অবাক হল কত সূক্ষ্ম কাজ কাঠের বেদীটাতে। কাঠ কুঁদে কুঁদে তোলা হয়েছে নকশা। ফুল লতাপাতা দেখি। কাঠের মধ্যে এমন সূক্ষ্ম কাজ খুব কমই দেখা যায়।
হঠাই ফ্রান্সিস লক্ষ্য করল–ফুল পাখি লতাপাতা যেখানে শেষ হয়েছে তার নীচে বাঁদিকে আর ডানদিকে কিছু যেন কথা কুঁদে তোলা। ফ্রান্সিস বলল–সাজ্জিও লক্ষ্য করেছেন বোধহয় নীচের দিকে কিছু লেখা আছে।
আপনি ঠিকই ধরেছেন। প্রাচীন গ্রীক ভাষায় লেখা বাইবেলের ‘নিউ টেস্টামেন্ট থেকে দুটো উদ্ধৃতি। সাজ্জিও বললেন।
–উদ্ধৃতি দুটো কী? হ্যারি জানতে চাইল।
সাজ্জিও বললেন–
-বাঁ দিকের উদ্ধৃতিটি হচ্ছে–”দুঃখ কষ্ট ব্যথা বেদনারূপে ক্রুশ বহন যে না করে সে আমার অনুগামী হতে পারে না।”
ডানদিকে আছে–”জীবনটা কেবল খাওয়াপরা নয় তার থেকে আরো অনেক বেশি।”
ফ্রান্সিসরা বুঝল বড়ো গভীর অর্থময় উদ্ধৃতি দুটি। চার্লস সত্যিই একজন চিন্তাশীল মানুষ ছিলেন। শুধু খ্রীস্টভক্তই ছিলেন না।
ওদিকে দুর্গের চত্বরে বন্দি শাঙ্কো বিস্কোরা ভাবছে কী করে ওখান থেকে পালানো যায়। পালিয়ে ওদের জাহাজে যাবে। বরং জাহাজেই বন্দি হয়ে থাকবে। এখানে এই উন্মুক্ত আকাশের নীচে এভাবে দিনের পর দিন থাকা চলে না। কিন্তু পালাবে ভাবলেই তো হবে না। কীভাবে পালাবে সেটাই আগে ভাবতে হবে। শাঙ্কো বিস্কোর সঙ্গে এই নিয়ে মৃদুস্বরে কথা বলছিল। শাঙ্কো বিপদ আঁচ করলেই যা করে এবারও তাই করেছে। কোমর থেকে বড়ো ছুরিটা বের করে ঢোলা জামার মধ্যে ছুরিটা ঢুকিয়ে রেখে দিয়েছে। প্রয়োজনের সময় বের করবে।
শাঙ্কো তাই বলল–দেখো হাতে দড়ি কেটে ফেলা যাবে। কিন্তু দুর্গের দেয়াল ডিঙোবে কী করে? পাহারাদার সৈন্যরা তো ঘোরাফেরা করছে। ওদের একটাকে ঘায়েল করে তলোয়ার ছিনিয়ে আনা যায়। কিন্তু এত সৈন্যদের সঙ্গে লড়াই–অসম্ভব।
–দেখা যাক–রাতের খাবার দেবার সময় কতজন সৈন্য থাকে। বিস্কো বলল।
রাত হয়েছে তখন। চারজন পাহারাদার সৈন্য বন্দিদের খাবারদাবার জল নিয়ে এলো। হাত খোলা হবে না। সবার সামনে লম্বাটে পাতা পেতে দেওয়া হল। তাতে আধপোড়া। রুটি আর সবরকম আনাজপত্রের ঝোলমতো দেওয়া হল। সঙ্গে একটা করে মুরগির সেদ্ধ ডিম। হাত বাঁধা অবস্থাতেই সবাই খেতে লাগল। শাঙ্কো বিস্কো দু’জনেরই মনে পড়ল এরকম বন্দি অবস্থায় ফ্রান্সিসের উপদেশ–পেট পুরে খাও–খেতে ভালো না লাগলেও খাও। দুজনেই পেট পুরে খেল। একজন পাহারাদার কাঠের জালামতো জায়গায় জল নিয়ে এসেছিল। সে সবাইকে জল খাওয়াতে লাগল। শাঙ্কো সতর্ক দৃষ্টিতে লক্ষ্য রাখল। মশালের আলোয় দেখল বেশ কিছুটা দূরে সদর দেউড়িতে এখন সৈন্য সংখ্যা কম। যারা খাবার দিতে এসেছিল তারা খাবারের বড়ো বড়ো কাঠের এঁটো পাত্রগুলো নিয়ে চলে গেল। রইল শুধু যে পাহারাদারটি জল দিচ্ছিল–সে একা।
শাঙ্কো ফিস ফিস করে ডাকল–বিস্কো। বিস্কো ওর দিকে তাকাল। শাঙ্কো মাথা নিচু করে বলল–আমার পোশাকের মধ্যে থেকে ছোরাটা বের করো। বিস্কো সঙ্গে সঙ্গে শাঙ্কোর ঢোলা গলা দিয়ে হাত ঢুকিয়ে ছোরাটা তুলে আনল। তারপর নিজের দড়িবাঁধা দু’হাত দিয়ে ছোরাটা ধরে শাঙ্কোর হাতের দড়ি কাটতে লাগল। ছোরার খোঁচা লেগে শাঙ্কোর হাতের কয়েকটা জায়গা কেটে গেল। রক্ত পড়তে লাগল। জ্বালা করতে লাগল। শাঙ্কো মুখ বুজে সহ্য করল। ছোরার ঘষা লেগে একসময় দড়িটা কেটে গেল। খোলা হাতে শাঙ্কো ছোরাটা নিয়ে বিস্কোর হাতের দড়ি কেটে ফেলল। এবার বিস্কো বাকি বন্ধুদে হাতের দড়ি কাটতে লাগল। জল দিচ্ছিল যে পাহাদারটা সে তখন জলের পাত্র নিয়ে চলে যাচ্ছে।
শাঙ্কো তখন বিস্কোকে ছোরাটা দিল। তখন সৈন্যটি ওদের সামনে দিয়েই যাচ্ছিল। বিস্কো অন্ধকারে এক লাফে সৈন্যটার কাঁধে ঝুলে পড়ল। পেছন থেকে ছেঁড়া দড়িটা দিয়ে সৈন্যটার গলায় ফাঁসমতো পরাল। তারপর দড়ি টানল। পাহারাদারটি টাল খেয়ে পাথর বাঁধানো চত্বরে পড়ে গেল। অজ্ঞান হয়ে গেল। শাঙ্কো কিছুক্ষণ চাপাগলায় বলল ছোরাটা দাও। আমার সঙ্গে এসো।
দু’জনে হামাগুলি দিয়ে পাথরের দেওয়ালের দিকে চলল। সদর দেউড়ির মশালের নি আলো এত দূর আসে নি। দেয়ালের নানা জায়গায় খোঁদলে মশাল জ্বলছে। শাঙ্কো হামাগুড়ি দিয়ে অমনি একটা জ্বলন্ত মশালের কাছে এলো। বিস্কোও এলো। দুজনেই ভীষণ হাঁপাচ্ছে তখন। শাঙ্কো একবার দুর্গের দেউড়ির দিকে তাকিয়ে নিয়ে হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে মশালটা নিয়েই দেওয়ালের গায়ে চেপে ধরল। ধোঁয়া বেরোল। মশালটা নিভেও গেল, এবার শাঙ্কো ফিস ফিস করে বিস্কোকে ডেকে বলল–বিস্কো এসোতোমার কাঁধে উঠে আমি দেয়াল ডিঙোবো।
–পারবে? বিস্কো বলল।
