–পিরবো। মশাল রাখার আর একটা খোঁদল রয়েছে ওপরে। শিগগিরি এসো। শাঙ্কো বলল। বিস্কো এগিয়ে এসে দেয়াল ঘেঁষে বসল। শাঙ্কো ওর দুকাঁধে দু’পা রেখে দাঁড়াল। দেয়াল ধরে ধরে বিস্কো আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল। দেয়ালের মাথায় শাঙ্কো পৌঁছাতে পারল না। তখনও হাত তিনেক বাকি। শাঙ্কো অন্ধকারে এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখল মশাল রাখার খোদলটা একটু উঁচুতে ডানদিকে রয়েছে। শাঙ্কো দেয়ালে শরীর চেপে খোঁদলটায় ডান পা-টা রাখল। তখন শাঙ্কো ভীষণ হাঁপাচ্ছে। নাক মুখ দিয়ে একসঙ্গে শ্বাস টানছে। দেয়ালে শরীর চেপে খোঁদলে পায়ের চাপ দিয়ে আস্তে আস্তে শাঙ্কো চেপে দেয়ালের মাথায় উঠে বসল। বিস্কো চাপা গলায় বলল-সাবাস্ শাঙ্কো। হাঁপানির ঠ্যালায় তখন শাঙ্কো কথাও বলতে পারছে না। অবশ্য এখন কথা বলার সময়ও নয়। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল–বিস্কো–দেয়ালের ওপাশে এটা ন্যাড়াগাছ দেখেছি আমি। আমি ঐ গাছ বেয়ে বেয়ে নেমে যাবো। আমাদের জাহাজে যাবো। মোটা দড়ি নিয়ে আসবো। ঐ গাছটায় বেঁধে দেয়ালের এপাশে দড়ির অন্য মাথাটা ফেলে দেবো। তোমরা দড়ি বেয়ে বেয়ে দেয়াল ডিঙোবে। তোমরা একজন একজন করে যখন এপাশে দড়ি ধরে নামতে থাকবে তখন দেয়ালের ওপাশে অন্যেরা দড়িটা টান ধরে ধরে রাখবে। তাহলেই এপারে সহজে নেমে যাবে।
শাঙ্কো এবার অন্ধকারে পা বাড়িয়ে ন্যাড়া গাছটার মগডালে শরীরের ভর রাখলো। তারপর শরীরে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে গাছটার কাণ্ড জড়িয়ে ধরল। দেখল–দুর্গের দেউড়িতে অনেক মশাল জ্বলছে কিন্তু সৈনসংখ্যা কম।
শাঙ্কো আস্তে আস্তে গাছটার ডাল ধরে ধরে কাণ্ড বেয়ে মাটিতে নেমে এলো। তারপর অন্ধকারেই পাথর ভরা পথটায় চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল। হাঁপানি তখন ছেড়ে গেছে।
কিছুক্ষণ এমনি করে শুয়ে থাকায় হাঁপানি একটু কমল। এবার শাঙ্কো উঠে দাঁড়াল। ঐ হাঁপধরা অবস্থায় যতটা দ্রুত সম্ভব চলল ওদের জাহাজ যেখানে আছে সেই তীরভূমির দিকে।
যেখানে জাহাজটা ছিল সেখানে শাঙ্কো এলো। জাহাজের কাছাকাছি আসতেই দেখল জাহাজ থেকে তীরভূমিতে পাতা কাঠের পাটাতনটা তুলে ফেলা হয়েছে। জাহাজের ডেক-এ একদল সশস্ত্র সৈন্য। দেখেই বুঝল ওরা রাজা পিটারের পাহারাদার সৈন্য। মুস্কিল হল। সোজা পথে দড়ি জোগাড় করা যাবে না। শাঙ্কো তাই ঠিক করল নোঙরের দড়িটাই নেবে।
শাঙ্কো জলের ধারে এলো। আস্তে আস্তে জলে নেমে নিঃশব্দে জল ঠেলে চলল। জাহাজের সামনের দিকে অন্ধকারে এগিয়ে এবার নোঙরের কাছিটা ধরে ডুব দিল। অনেকটা নীচে নেমে ছোরাটা কোমর থেকে খুলল। তারপর ছোরা চেপে ধরে কাছিটা পোচ দিয়ে কেটে ফেলল। তারপর আস্তে আস্তে জলের ওপর ভেসে উঠল। এরপর জলের ওপরে কাছিটা কেটে ফেলল। এবার কাছিটা বাঁ হাতে ধরে ডান হাতে নিঃশব্দে সাঁতরাতে সাঁতরাতে তীরে উঠে এলো। পেছনে তাকিয়ে দেখল ওদের জাহাজটা তো এখন নোঙরহীন। হাওয়ার ধাক্কায় আস্তে আস্তে ভেসে চলেছে। জাহাজে বাড়তি নোঙর থেকে যে বন্ধুরা জাহাজে বন্দি আছে তারাই নতুন নোঙর লাগাবে। এখন দুর্গ থেকে বন্ধুদের মুক্ত করাই আসল কাজ। নোঙর থেকে কাটা কাছিটা গোল করে পেঁচিয়ে নিয়ে শাঙ্কো অন্ধকারে চলল দুর্গের দিকে।
দুর্গের দেয়ালের কাছাকাছি গাছটার ওপর উঠল। গাছটার মাঝামাঝি কাণ্ডটার সঙ্গে কাছির একটা মুখ ভালো করে গেরো দিয়ে বাঁধল। গাছ থেকে নেমে এলো। কাছির অন্য মুখটায় একটা পাথর বাঁধল। এবার সেটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেয়ালের ওপর দিয়ে দুর্গের ভেতরে ছুঁড়ে দিল। শাঙ্কোর ভাগ্য ভাল। পাথরটা ভেতরের চত্বরে বন্দি কারো মাথায় পড়ল না। পড়ল চত্বরের ওপর। শব্দ হল। তবে খুব জোর শব্দ নয়। বিস্কো অন্ধকারে শব্দটা লক্ষ্য করে এগিয়ে এলো। পাথর বাঁধা কাছিটা দেখল। বুঝল শাঙ্কোই ছুঁড়েছে দড়ির মুখটা। বিস্কো বন্ধুদের ফিস ফিস করে বলল–শাঙ্কো কাছি ঝুলিয়ে দিয়েছে। একে একে পালাও। বন্ধুদের একজন কাছিটার কাছে এলো। কাছিটা টেনে দেখে বুঝল কাছিটা দেয়ালের ওপাশের গাছটার সঙ্গে বেশ শক্ত করে বাঁধা হয়েছে। বন্ধু যখন দেয়ালের কাছে গিয়ে কাছি দিয়ে বেয়ে উঠছে নীচে বিস্কো ওরা কয়েকজন কাছিটা টান টান করে টেনে ধরে রাখল। বন্ধুটি দেয়ালের মাথায় বসল। তারপর টান টান কাছিটা ধরে ধরে এগিয়ে গেল। শাঙ্কো এসে বন্ধুটিকে জড়িয়ে ধরল। মুক্তি।
এবার বিস্কো সব বন্ধুকে একে একে দেয়ালের ওপাশে পার করে দিল। তারপর আনগেভিনের সৈন্যরা কাছি টেনে ধরে বিস্কোকে পার করাল। এরপর নিজেরা দেয়ালে উঠে পার হতে লাগল।
বিস্কো দেয়ালের ওপর উঠে দেখেছিল দেউড়ির দিকে তাকিয়ে। সৈন্যরা দু’তিনজন জেগে আছে। তবে পাহারা দিচ্ছে না। গল্পগুজব করছে। মশাল জ্বলছে। এদিকে কারো দৃষ্টি নেই।
বিস্কো পার হতেই ভাইকিংরা এবার ছুটল জাহাজ যে দিকে বাঁধা আছে সেদিকে। অন্ধকারে ছুটে চলল সবাই।
সমুদ্রতীরে পৌঁছে দেখল নোঙরহীন ওদের জাহাজটা বেশ দূরে ভেসে গেছে।শাঙ্কো বলে উঠল–সবাই সাঁতরে চলো। সমুদ্রের সঙ্গে ভাইকিংদের নাড়ির টান। ওদের কাছে এই দূরত্বটুকু সাঁতরে যাওয়া কিছুই না।
আস্তে আস্তে জলে নামল সবাই। শাঙ্কোর হুঁশিয়ারি শোনা গেল–কোনো শব্দ নয়। ভাইকিংরা নিঃশব্দে সাঁতরে চলল ওদের জাহাজের দিকে।
