প্রহরী একজন ফ্রান্সিসদের ইশারায় সঙ্গে আসতে বলল। ফ্রান্সিস হ্যারি প্রহরীর পেছনে পেছনে চলল। ঢুকেই বিরাট হলঘর। হলঘরের মাঝখানে শ্বেতপাথরের গোল টেবিল। চারপাশের দেয়ালে কয়েকজনের ছবি। বোঝা গেল চার্লস ও চার্লসের পূর্বপুরুষদের ছবি। প্রহরী ওদের নিয়ে হলঘরের কোণায় একটা পাথরের ঘরে ঢুকল। ফ্রান্সিসরা ঘরটায় ঢুকে দেখল একটা কালো কাঠের বাঁকা পায়াওয়ালা চেয়ারে বসে আছেন টাকমাথা একজন প্রৌঢ়। প্রহরী প্রৌঢ়কে কী বলল। প্রৌঢ়টি হেসে গ্রীক ভাষায়, বলল–মান্যবর চার্লসের এই অট্টালিকা গীর্জা গ্রন্থাগার এসব আমিই দেখাশুনো করি। আমার নাম গাইদা। হ্যারি ফ্রান্সিসকে কথাটা বুঝিয়ে বলল।
ফ্রান্সিস বলল–বলল যে আমরা চার্লসের গুপ্ত ধনভাণ্ডার খুঁজে বের করতে এসেছি। রাজা পিটার আমাদের অনুমতি দিয়েছেন।ওরা কথা বলছেতখনই ঘরে সাজ্জিও ঢুকলেন। হেসে ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে সাজ্জিও বললেন–রাজা পিটার আপনাদের সাহায্য করবার জন্যে আমাকে পাঠিয়েছেন। দেখা গেল গাইদা চেয়ার ছেড়ে উঠে সাজ্জিওকে সম্মান জানাল।
সাজ্জিও গাইদাকে বলল–আপনি আপনার কাজ করুন। আমিই এদের সব দেখাচ্ছি। তারপর ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে বললেন–চলুন–আমিই আপনাদের সব দেখাচ্ছি।
তিনজনে ঘর থেকে বেরিয়ে হলঘরে এলো। পাথরে তৈরি হলঘরে পাথরের গায়ে কুঁদে কুঁদে ফুল লতাপাতার কাজ করা। দেয়ালে টাঙানো একটা ছবির সামনে এসে সাজ্জিও বললেন–এই ছবিটা হচ্ছে মান্যবর চার্লসের ছবি। ফ্রান্সিসরা দেখল–এক প্রৌঢ়ের ছবি। সাধারণ পোশাক পরনে। মুখটা হাস্যোজ্জ্বল নয়। কেমন বিষাদময়।
ফ্রান্সিস বলল–সাজ্জিও–একটা কথা বলি।ছবিটা দেখে মাননীয় চার্লসকে কেমন বিষাদগ্রস্ত মনে হচ্ছে।
সাজ্জিও বললেন–ঠিকই ধরেছেন। এই ছবি আঁকার সময় চার্লসের এক পালিতা কন্যা মারা গিয়েছিল। তারপরই চার্লস তার জাঁকজমকের জীবন ত্যাগ করে প্রায় সাধুর জীবন কাটাতে লাগলেন। একটা গীর্জাঘর তৈরি করালেন। সেই গীর্জাতেই তিনি যীশুর আরাধনায় বেশিসময় কাটাতেন। গীর্জা চালাবার জন্যে একজন ধর্মযাজককে আনতে জেনিভা গিয়েছিলেন। সেখানে তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর তাঁর শেষ ইচ্ছামতো এই গীর্জার প্রাঙ্গণেই তাকে সমাহিত করা হয়।
-মৃত্যুর পূর্বে তিনি তাঁর ধনসম্পদের কথা কাউকে বলে যাননি এটাই শুনেছি। ফ্রান্সিস বলল।
–হ্যাঁ–এটা রহস্যময়ই থেকে গেল। তার মৃত্যুর পর অনেকেই তার ধনসম্পদ খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছে কিন্তু কেউ সেই বিপুল ধনসম্পদের হদিস করতে পারে নি। সাজ্জিও বললেন।
মনে হয় ভালো করে খুঁজলে কোনোনা কোনো সূত্র পাওয়া যেতই। হ্যারি বলল।
এবার সাজ্জিও হেসে বললেন–তাহলে সত্যি কথাটা বলি। প্রায় এক বছর ধরে মান্যবর চার্লসের অট্টালিকা গ্রন্থাগার গীর্জা আমি তন্নতন্ন করে খুঁজেছি। কিন্তু কোনো সূত্র পাই নি।
ফ্রান্সিস বলল–তাহলে তো আপনি অনেক কিছুই জানেন।
–তা কিছু তো জানিই। যেমন গ্রন্থাগারে রক্ষিত সমস্ত গ্রন্থ আমি পড়েছি। বাসস্থান অট্টালিকা গীর্জা সব জায়গা খুঁজেছি। কিন্তু সবই ব্যর্থ। সাজ্জিও বলল।
–এই খোঁজাখুঁজি কি নিজের ইচ্ছেয় করেছেন? হ্যারি বলল।
-না–মান্যবর চার্লসের ধনসম্পদের ওপর আমার বিন্দুমাত্র লোভ নেই। রাজা পিটারের নির্দেশেই আমাকে খোঁজাখুঁজি করতে হয়েছিল। রাজা পিটার বলেছিলেন মান্যবর চার্লসের গ্রন্থাগারের গ্রন্থগুলো সব পড়ে যদি কোনো সূত্র আমি পাই সে জন্যেই আমাকে খুঁজতে নির্দেশ দিয়েছিলেন।
–আপনি কোনো সূত্রই পান নি। হ্যারি বলল।
–না–কিচ্ছু না। সাজ্জিও বললেন।
কথা বলতে বলতে তিনজনে চার্লসের গ্রন্থাগারে এলো। পাথরে তৈরি গ্রন্থাগারটি বেশি বড় না। গ্রন্থাগারের প্রহরী সাজ্জিওকে দেখে মাথা নুইয়ে সম্মান জানাল।
গ্রন্থাগারে ঢুকল তিনজনে। প্রহরী একটা মোটা হলুদ রঙের মোমবাতি জ্বেলে দিয়ে গেল। ফ্রান্সিসরা দেখলকাঠের পাটাতনের ওপর চামড়া বাঁধানো গ্রন্থ রাখা। গ্রন্থ বেশি নেই। সব মিলিয়ে আট-দশটা হবে।
হ্যারি বলল–সাজ্জিওগ্রন্থগুলো সবই কি গ্রীক ভাষায় লেখা।
–না– আরবী ভাষায়ও আছে। লাতিন ভাষায়ও আছে। সাজ্জিও বললেন।
–গ্রন্থগুলো কী বিষয় নিয়ে লেখা? হ্যারি বলল।
নানা বিষয়ে–অঙ্ক জ্যোতিষ মানুষের জীবনমৃত্যু এরকম বিভিন্ন বিষয়ে লেখা। সাজ্জিও বললেন। হ্যারি কয়েকটা গ্রন্থের পাতা উল্টে দেখল। আরবী আর গ্রীক ভাষায় লেখা।
হ্যারি বলল–গ্রন্থগুলো থেকে চার্লসের ধনসম্পদের কোনো হদিশ পান নি?
না–তবে পুরোনো গ্রীক ভাষায় লেখা একটা বাইবেল পেয়েছি। গ্রন্থটার নানা রকম জায়গায় দাগ দেওয়া। বোঝা যায় যে মান্যবর চার্লস খুব মনোযোগ দিয়ে ঐ বাইবেলটা পড়তেন। সাজ্জিও বললেন। ফ্রান্সিস গ্রন্থাগারটা ঘুরে দেখল। সাধারণ পাথরের ঘর। মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারে এমন কিছু নেই।
–চলুন–গীর্জাটা দেখবেন। সাজ্জিও বললেন।
গীর্জাটা একটু দূরে। গীর্জাটা পাথরের। তবে চূড়োটা কাঠের। তাতে ফুল পাতার কাজ।
তিনজনে গীর্জায় ঢুকল। ঢুকেই ফ্রান্সিস আর হ্যারি অবাক হয়ে গেল। দেখল মানুষের মতোই যীশুর মূর্তি। এত বড়ো ধীশুর মূর্তি ওরা কখনো দেখেনি। ওক কাঠ কুঁদে কুঁদে মূর্তিটা তৈরি করা হয়েছে। ক্রুশে বিদ্ধ যীশুর মূর্তি। এত সজীব মূর্তি বড়ো একটা দেখা যায় না। ক্রুশের গায়ে হাত পা পেরেকে বিদ্ধ। মাথায় কাঁটার মুকুট।
