ফ্রান্সিস খোলা আকাশের দিকে তাকাল। ভাঙা চাঁদ। জ্যোৎস্না অনুজ্জ্বল। তারা জ্বলছে। ফ্রান্সিসের ভাবনার শেষ নেই। রাজা পিটার ওদের নিয়ে কী করবেন কে জানে। যদি যুদ্ধে অংশ নেওয়ার অপরাধে ওদের কয়েদখানায় বন্দি করে রাখে তাহলে বিপদ। জাহাজে মারিয়া রয়েছে–যে বন্ধুরা অস্ত্রশস্ত্র পায় নি বলে যুদ্ধে যোগ দেয় নি তারা রয়েছে। ফ্রান্সিসরা বন্দি হলে ওরা দিশেহারা হবে–যেভাবে হোক সবারইমুক্তির ব্যবস্থা করতে হবে। এইসব ভাবতে ভাবতে ফ্রান্সিসের দু’চোখ ঘুমে জড়িয়ে এলো।
শেষরাতে একটা শিরু শি ঠাণ্ডা হাওয়ায় ফ্রান্সিসের ঘুম ভেঙে গেল। বেশ শীত শীত করতে লাগল।
আর ঘুম আসছে না। খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে হঠাই ফ্রান্সিসের বাড়ির কথা মনে হল। কোথায় সাদা ধগ্ধপে পালক-নরম বিছানা বালিশ সাজানো ঘর। জানালায় হালকা নীল পর্দা আর কোথায় এই দুর্গের পাথুরে চত্বর। পিঠের হাড়ে ব্যথা হয়ে গেছে–মাথার পেছনেও ব্যথা। বাকি রাতটুকু ফ্রান্সিসের আর ঘুম এলো না।
সকালে দুর্গে মান্দোর সৈন্যদের মধ্যে সাজো সাজো রব। রাজা পিটারের শৌখিন জাহাজ নাকি আসতে দেখা গেছে। সৈন্যরা সব দুর্গের বিরাট কাঠের সদর দরজার সামনে সার বেঁধে দাঁড়াল। এক সারি সৈন্যের হাতে বর্শা। পেতলের বর্শায় সূর্যের আলো পড়ে ঝলকাচ্ছে।
একটু বেলায় রাজা পিটার একটা সাদা ঘোড়ায় চেপে এলেন। ঘোড়ার গায়ে মাথায় নানা রঙের সাজ। রাজা পিটারের মাথায় মুকুট নেই। পোশাক লাল রঙের জোব্বামতো। তাতে সোন রুপোর সুতোর কাজ করা। রাজা পিটারের বয়েস বেশি নয়। মুখে গোঁফ থুতনিতে অল্প দাড়ি।
রাজা পিটারের পেছনে পেছনে এলো রাজার দেহরক্ষীর দল। তাদের পরনে বিচিত্র রঙদার পোশাক।
রাজা পিটারকে দেখে সৈন্যরা জয়ধ্বনি করল। রাজা সদর দেউড়ি দিয়ে সৈন্যদের মাথা নিচু করে অভিবাদন নিতে নিতে দুর্গে ঢুকে গেলেন। সেই পালকের বিছানা পাতা ঘরে গিয়ে রাজা বসলেন।
একটু পরেই হাত বাঁধা অবস্থায় আনগেভিনকে রাজার কাছে আনা হল। রাজা আনগেভিনকে বললেন–বেশ তো সিলিলিতে ধর্মকর্ম নিয়ে ছিলেন। হঠাৎ মাল্টার রাজা হবার শখ হল কেন?
–আপনার শাসনে সিসিলি জেনোয়ার যেসব লোক এখানে আছে তারা ক্ষুব্ধ। তারাই আপনাকে হারিয়ে মাল্টার রাজা হতে আমাদের ডেকে এনেছে। আনগেভিন বলল।
–এখন রাজা হওয়ার বদলে কয়েদঘরে পচতে হবে। রাজা হেসে বললেন। জেনে রাখুন–মাল্টার উচ্চবংশীয় মানুষেরা কিন্তু আমার বশ্যতা স্বীকার করেছে। তারা চায় আমিই যেন রাজা থাকি আর মাল্টাবাসীদের কল্যাণ করি। একটু থেমে রাজা বললেন এই আনগেভিনকে কয়েদঘরে আটক করে। তার আগে ওর পিঠে কুড়িবার চাবুক মারবে।
আনগেভিনকে নিয়ে সৈন্যরা চলে গেল।
অন্য সৈন্যদের সম্বন্ধে রাজা পিটার আদেশ দিলেন–এখানকার কয়েদঘরে যতজন আঁটে ততজনকে বন্দি করে রাখে।! বাকিদের আনজুতে নিয়ে যাও। ওখানকার কয়েদঘরে বন্দি করে রাখবে।
রাজার বিচার শেষ হল। তখন সেনাপতি মান্দো এগিয়ে এসে মাথা নুইয়ে সম্মান জানিয়ে বলল–একদল বিদেশি আনগেভিনের হয়ে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। তাদের কী করা হবে।
তাদের কাউকে নিয়ে এসো। সব, শুনি আগে। রাজা বললেন। মান্দো একজন সৈন্যকে পাঠালো ফ্রান্সিসদের ডেকে আনতে।
কিছুক্ষণ পরে হ্যারিকে সঙ্গে নিয়ে ফ্রান্সিস এলো। দু’জনেই মাথা একটু নুইয়ে নিয়ে শ্রদ্ধা জানাল। রাজা পিটার বললেন–শুনলাম তোমরা ভাইকিং। আনগেভিনের সৈন্যদের সঙ্গে যোগ দিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে।
হ্যারি বলল–আমরা যুদ্ধ করতে বাধ্য হয়েছি
–কেন? রাজা পিটার বললেন।
কারণ আনগেভিনের সৈন্যরা কিছুদিন আগে গভীর রাতে আমাদের জাহাজ দখল করেছিল। আনগেভিন সেন্ট অ্যাঞ্জেলো মানে এই দুর্গ অধিকার করতে আসছিল। আমাদের বলল তার সৈন্যদের সঙ্গে যোগ দিয়ে এই দুর্গ অধিকার করতে আমরা যেন সাহায্য করি। হ্যারি বলল।
–তোমরা অস্বীকার করলেই পারতে। রাজা পিটার বললেন।
–আমরা সে কথা বলেছিলাম। হ্যারি বলল।
–আনগেভিন কী বলল। রাজা পিটার জানতে চাইলেন।
–আনগেভিন বলেছিল মানে আমাদের ভয় দেখিয়েছিল–আমরা যুদ্ধে যোগ না দিলে সে কামান দেগে আমাদের জাহাজ ডুবিয়ে দেবে। হ্যারি বলল।
-সেই ভয়েই তোমরা আনগেভিনের সৈন্যদের সঙ্গে এসে যুদ্ধ করেছিল।
–এবার বলো তো তোমরা এই ভূমধ্যসাগর অঞ্চলে এসেছ কেন? রাজা পিটার বললেন।
–এ কথার উত্তর আমার বন্ধু ফ্রান্সিস স্পেনীয় ভাষায় দেবে। আমার বন্ধুটি গ্রীক ভাষা জানে না। এই বলে হ্যারি ফ্রান্সিসকে দেখাল। রাজা পিটার এবার স্পেনীয় ভাষায় ফ্রান্সিসকে বললেন–বলো–তোমার কী বলার আছে। ফ্রান্সিস বলতে লাগল–আমরা দেশে দেশে ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসি। কত মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়। তাছাড়া কোথাও কোনোরকম গুপ্তধন গুপ্ত ঐশ্বর্যের সংবাদ পেলে আমরা তা উদ্ধার করি। সেইজন্যই এই অঞ্চলে আসা।
–এরকম গুপ্তধন উদ্ধার করতে পেরেছো? রাজা পিটার বললেন।হ্যারি বললেন– অনেক ধন-সম্পদ আমার এই বন্ধু উদ্ধার করেছে।
–গুপ্তধন উদ্ধার করে নিজেদের দেশে নিয়ে যাও। এতে একরকম চুরি ডাকাতিই বলা যায়। রাজা পিটার বললেন। ফ্রান্সিস বললেন–আপনি এটুকু বিশ্বাস আমাদের করতে পারেন যে আমরা চোর ডাকাত নই। যত গুপ্তভাণ্ডার খুঁজে বের করেছি সবই যাদের প্রাপ্য তাদেরকেই দিয়েছি। নিজেরা একটা রুপোর মুদ্রাও নিইনি। হ্যারি বলল– আমার বন্ধু ফ্রান্সিস চিন্তা করে বুদ্ধি খাঁটিয়ে গুপ্তসম্পদ উদ্ধার করেছে।
