ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো কাঠের পাটাতন পেতে জাহাজ থেকে মাটিতে নেমে এলো। তারপরই ছুটল দুর্গের দিকে।
ততক্ষণে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। আনগেভিনের সৈন্যরা দুর্গের সামনের ময়দানে যুদ্ধ করছে রাজা পিটারের সৈন্যদলের সঙ্গে। প্রচণ্ড যুদ্ধ চলছে। উৎসাহব্যঞ্জক ধ্বনি চিৎকার, আহতের আর্তনাদে জায়গাটা ভরে উঠেছে।
ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো সমুদ্রতীর থেকে দুর্গের কাছে এলো। দুর্গের পেছন ফিরে ঘুরে এসে ওরা আনগেভিনের সৈন্যদলের সঙ্গে যোগ দিল।
যুদ্ধ চলল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফ্রান্সিস বুঝল রাজা পিটারের এই সেনাবাহিনী দুর্ধর্ষ। ওরা যুদ্ধে নিপুণ।
ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই দেখা গেল আনগেভিনের সেনাবাহিনী দুর্গের দিকে পিছুহটছে। তাদের মধ্যে অনেকেই আহত। মারাও গেছে অনেক। রাজা পিটারের সৈন্যরা সমান চাপ রেখে লড়াই চালাতে লাগল।
হারের মুখে এসে দাঁড়াল আনগেভিনের সৈন্যদল। ওরা রণক্ষেত্র থেকে পালাতে লাগল। অনেকেই পিছিয়ে দুর্গে আশ্রয় নিতে লাগল।
এক সময় লড়াই করতে করতে বিস্কো ফ্রান্সিসদের পাশে এলো। তলোয়ার চালাতে চালাতেই বলল–ফ্রান্সিস, দুর্গের পেছনের দরজা দিয়ে আনগেভিন পালিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু সমুদ্রতীরে পৌঁছবার আগেই আনগেভিন ধরা পড়েছে। এখন সে সেনাপতি মান্দোর হাতে বন্দি। কথাটা শুনেই ফ্রান্সিস তলোয়ার চালানো বন্ধ করল। চিৎকার করে বলল– বন্ধুরা-ভাইসব অস্ত্রত্যাগ করে যুদ্ধক্ষেত্রের একপাশে দু’হাত তুলে দাঁড়াও। এখৰ আমাদের লড়াই করা অর্থহীন। আমরা বন্দিত্ব মেনে নেব।
ফ্রান্সিসের বন্ধুরা সঙ্গে সঙ্গে তলোয়ার মাটিতে ফেলে দিল। বর্ম শিরস্ত্রাণও মাটিতে ফেলে দিল। তারপর ফ্রান্সিসের নির্দেশে দু’হাত ওপরে তুলে রণক্ষেত্র থেকে সরে এলো।
পিটারের সৈন্যরা তুমুল চিৎকার ধ্বনি তুলে দুর্গের দিকে ছুটে গেল। দলে দলে সৈন্যরা দুর্গৰ্টায় ঢুকতে লাগল। আনগেভিনের সৈন্যদের বন্দি করতে লাগল।
যুদ্ধ শেষ। আনগেভিনের যে সৈন্যরা দুর্গে আশ্রয় নিয়েছিল তারাও হার স্বীকার করল।
ফ্রান্সিসদেরও রাজা পিটারের সৈন্যরা বন্দি করল। ওদের নিয়ে চলল দুর্গের মধ্যে। ওদের হাত বেঁধে দুর্গের চত্বরে বসিয়ে রাখা হল। ওদিকে আনগেভিনের সৈন্যদের দুর্গের ঘরে ঘরে ঢুকে মান্দোর সৈন্যরা বন্দি করতে লাগল।
এভাবে বসে থাকাটা ফ্রান্সিসের কাছে অপমানজনক মনে হল। ও হ্যারিকে বলল রাজা পিটারের সেনাপতিকে গিয়ে বলল যে আমরা ভাইকিং। আনগেভিন আমাদের জাহাজ ডুবিয়ে দেবার ভয় দেখিয়ে তার দলের সঙ্গে আমাদেরও যুদ্ধে যোগ দিতে বাধ্য করেছে। হ্যারি আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল। সেনাপতি মান্দার একজন সৈনিককে বলল– আমরা সেনাপতির সঙ্গে কথা বলতে চাই।
–সেনাপতি মান্দো এখন বিশ্রাম করছেন। সৈন্যটি বলল।
ঠিক আছে। তুমি মান্দোকে গিয়ে বলো আমরা ভাইকিং। আমরা এখানকার লোক নই। বিশেষ প্রয়োজনে তার সঙ্গে দেখা করতে চাই। হ্যারি বলল।
-বেশ-বলে দেখছি। সৈন্যটি চলে গেল।
কিছুক্ষণ পরে সৈন্যটি ফিরে এলো। বলল–তোমারাই তো ভাইকিং?
–হ্যাঁ হ্যারি বলল।
–সেনাপতি তোমাদের দেখা করার অনুমতি দিয়েছেন। সৈন্যটি বলল। ফ্রান্সিস আর হ্যারি উঠে দাঁড়াল। হাত বাঁধা অবস্থাতেই সৈন্যটার পেছনে পেছনে চলল। যেতে যেতে দেখল–যুদ্ধ শেষ। আহত সৈন্যরা গোঙাচ্ছে। আর্তনাদ করছে। আনগেভিনের জীবিত সব সৈন্যই বন্দি হয়েছে। দুর্গের চত্বরে সারি দিয়ে বসে আছে।
দুর্গের সবচেয়ে ভালো ঘরটাতে পালকের বিছানায় সেনাপতি মান্দো বসে আছে। ফ্রান্সিস আর হ্যারি মান্দার সামনে এসে দাঁড়াল। মান্দো বলল–শুনলাম তোমরা ভাইকিং–বিদেশি। আনগেভিনের সৈন্যদের হয়ে তোমরা যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল কেন?
–নিরুপায় হয়েই আমাদের যুদ্ধে অংশ নিতে হয়েছে। আনগেভিন আমাদের বন্দি করেছিল আমাদের জাহাজ আটক করেছিল। আমাদের ভয় দেখিয়েছিল যে তার সৈন্যদের সঙ্গে যোগ দিয়ে আমরা যদি রাজা পিটারের সৈন্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করি তাহলে কামান দেগে আমাদের জাহাজ ধ্বংস করে দেবে। আমাদের জীবন বাঁচাতে জাহাজ বাঁচাতে বাধ্য হয়ে যুদ্ধে যোগ দিয়েছি, তা নইলে এই যুদ্ধে আমাদের কী লাভ? আমরা যুদ্ধ চাই না–শান্তি চাই। হ্যারি বলল।
-বুঝলাম–মান্দো বলল কিন্তু উপায় নেই। যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছো কাজেই তোমাদের বন্দি হয়েই থাকতে হবে। কাল সকালে রাজা পিটার এখানে আসবেন। তিনি তোমাদের ব্যাপারে যা করতে চান করবেন। আমি কিছু করতে পারবো না।
–বেশ। তাহলে তো আমাদের আনগেভিনের সৈন্যদের মতোই বন্দি হয়ে থাকতে হবে। হ্যারি বলল।
-হ্যাঁ। কাল আনগেভিনের বিচার হবে। সঙ্গে তোমাদেরও বিচার হবে। রাজা তৃতীয় পিটার যা বিচার করবেন তাই হবে। মান্দো বলল।
ফ্রান্সিস আর হ্যারি নিজেদের জায়গায় ফিরে এলো। হ্যারির বন্ধুদের জানাল সেনাপতি মান্দোর সঙ্গে কী কথাবার্তা হয়েছে। সবাই বুঝল রাজা পিটার এখন যা বলবেন তাই হবে।
রাত হল। বন্দিদের খেতে দেওয়া হল। হাত বাঁধা অবস্থাতেই সবাইকে খেতে হল।
খাওয়াদাওয়ার পর ফ্রান্সিস মাথার পেছনে দুহাত রেখে পাথুরে চত্বরে শুয়ে পড়ল। হ্যারিও আধশোয়া হল। ফ্রান্সিস একটা ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হল যে মারিয়া জাহাজেই আছে। এই বন্দিদশা মারিয়া সহ্য করতে পারতো না।
