ফ্লেজার এগিয়ে এলো। বলল–কী ব্যাপার শাঙ্কো?
–ফ্রান্সিসদের পালাবার উপায় বের করেছি। তুমি শিগগিরি আমাকে বেশ লম্বা মোটা কাছি দাও। ফ্লেজার ছুটে গেল ওদের কাঠ দড়ি কপিকল এসব রাখবার ঘরের দিকে।
কাছি নিয়ে ফ্লেজার একটু পরেই এলো। শাঙ্কো কাছিটা কোমরে বুকে পাচালো। তারপর চলল বন্দি শিবিরের দিকে।
বন্দি শিবিরের সামনে পৌঁছে দূর থেকেই দেখল আটজন ডাকাত মূরকে সেই পাথরের বেদীতে তোলা হয়েছে। শাঙ্কো লক্ষ্য করল–মূরদের হাত পা বাঁধা হয় নি। শাঙ্কো অস্ফুট স্বরে বলে উঠল–ও-হো-হো। তাহলে ফ্রান্সিসদের হাত পা বাঁধা হবে না।
শাঙ্কো একটু দূরে দূরে থেকে জঙ্গলটায় ঢুকল। চেস্টনাট গাছের গুঁড়ির সঙ্গে কাছিটার একটা মুখ বাঁধল। তারপর বাকি কাছিটা খাদে ঝুলিয়ে দিল। তারপর ঝোঁপঝাড়ের জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এলো। দেখল অনেক লোক জড়ো হয়েছে।
তখনই ফ্রান্সিসদের আনা হল। সঙ্গে মারিয়া। ফ্রান্সিসদের হাত পা বাঁধা নয়। খুশিতে শাঙ্কোর মন নেচে উঠল। ফ্রান্সিসদের পাথরের বেদীর পাশে দাঁড় করানো হল। ফ্রান্সিস তখন ভাবছে–এইভাবে ক্রীতদাসের জীবন মেনে নেবে?কিন্তু ও তো নিরুপায়।সিক্কার সৈন্যদের সঙ্গে লড়াইয়ে নামা যেত। কিন্তু তাতে বেশ কয়েকজন ভাইকিং বন্ধু মারা যেত। মারিয়াকে নিয়ে পালানো যেত না।ফ্রান্সিসের এই আশঙ্কার মধ্যেও ক্ষীণ আশা শাঙ্কো মুক্ত আছে। ও যদি কোনো উপায় বের করে।
শাঙ্কো সিক্কার সৈন্যদের পোশাক পরে বিনা বাধায় ঘুরে বেড়াতে লাগল। ফ্রান্সিসদের পেছন দিয়ে যাওয়া-আসা করতে লাগল আর মৃদুস্বরে ওদের দেশীয় ভাষায় বলে যেতে লাগল–উত্তরে জংলার কাছে ঝোঁপঝাড়ের মধ্যে বিরাট চেস্টনাট গাছ। গাছের গুঁড়িতে আমি কাছি বেঁধে রেখেছি। কাছি ধরে ঝুলে নীচে উপত্যকায় নেমে যাব। তারপর সমুদ্রতীরের দিকে ছুটবে। জাহাজে উঠবে।
এবার রাজকুমারী মারিয়াকে দু-তিনজন সৈন্য হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে এলো। মারিয়া মাথা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে বলতে লাগলনা-না।তবু সৈন্যরা জোর করে মারিয়াকে নিয়ে আসতে লাগল। তখন অতলোকের গুঞ্জন থেমে গেল। শুধু ফিসফাস শোনা যেতে লাগল রাজকুমারী-রাজকুমারী।
মারিয়া শুধু একবার তাকিয়ে নিল ফ্রান্সিসের দিকে। তারপর আর বাধা দিল না। পাথরের বেদীতে উঠল। কোনোদিকে তাকাল না। শুধু সামনের দিকে তাকিয়ে রইল। কাঠের থামের সঙ্গে মারিয়াকে দড়ি দিয়ে আগা করে বাঁধা হল।
উপস্থিত খরিদ্দারদের মধ্যে দামাদামি শুরু হয়ে গেল।
শাঙ্কো ফ্রান্সিসকে ফিসফিস্ করে বলল–হাত দুটো পেছনে আনন। ফ্রান্সিস পেছনে হাত নিল। শাঙ্কো এর বড়ো ছোরাটা ফ্রান্সিসের হাতে দিয়ে বলল–এবার কাজ হাসিল করো।
ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে ছুটল দলপতি সিক্কা যে পাথরের আসনে বসে আছে সেই দিকে। সিক্কার সৈন্যরা কিছু বোঝবার আগেইফ্রান্সিস সিক্কার গলায় ছোরা চেপে ধরল।দাঁতচাপা স্বরে বলল–তোমার সৈন্যদের বলো এখান থেকে চলে যেতে।
ফ্রান্সিসের এই কাণ্ড দেখে লোকজন সব পালাতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যেই জায়গাটা প্রায় জনশূন্য হয়ে গেল। সিক্কার কিছু সৈন্য তখনও ছিল। ফ্রান্সিস ছোরার চাপ বাড়াল। দলপতি সিক্কা বলল–বলছি–বলছি। এবার সিক্কা গলা চড়িয়ে বলল–সৈন্যরা তোমরা এখান থেকে চলে যাও। সৈন্যরা আর কী করে। দলপতির প্রাণ বিপন্ন। এখান থেকে চলে যেতেই হবে। সৈন্যরা দলবেঁধে চলে গেল।
এবার ফ্রান্সিস বিস্কোকে বলল–বিস্কো রাজকুমারীকে তুমি নিয়ে যাও। তোমরা সকলে চলে যাও উত্তরের ঐ বিরাট চেস্টনাট গাছের কাছে। গাছটায় মোটা কাছি বাঁধা আছে। কাছি ধরে নেমে একটা উপত্যকা পাবে। সেটা ধরে সমুদ্রতীরে জাহাজে চলে যাও।
সব ভাইকিং বন্ধুরা ছুটল চেস্টনাট গাছটার দিকে। বিস্কো বেদীতে উঠল। মারিয়ার গায়ে বাঁধা দড়িটা খুলে ফেলল। তারপর মারিয়াকে পাথরের বেদী থেকেনামিয়ে আনল। শরীরে অসহ্য ক্লান্তি। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল–মারিয়া মনে জোর আনো। কাছি ধরে নীচে নামতে পারলেই আমাদের মুক্তি। এছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। মারিয়া ফ্রান্সিসের কথা শুনে একবার থমকে দাঁড়াল তারপর হাঁটতে শুরু করল। কিন্তু হাঁটতে গিয়ে শরীর ছেড়ে দিয়ে ঘাসে-ঢাকা মাটিতে গড়িয়ে পড়ল। বিস্কো সঙ্গে সঙ্গে নিচু হয়ে মারিয়াকে তুলে কাঁধে শুইয়ে নিল।বিস্কো যতটা সম্ভব দ্রুত পায়ে ছুটল চেস্টনাট গাছটার দিকে।
বিস্কো যখন কাছিটার কাছে এলো ততক্ষণে বাকি বন্ধুরা কাছি ধরে ধরে নীচের উপত্যকায় নেমে গেছে। বিস্কো নিচু হয়ে কাছিটা ধরল। বলল–রাজকুমারী আমরা মুক্তির দোড়গোড়ায়। যতটা সম্ভব জোরে আমাকে ধরে থাকুন। মারিয়া দুহাত বাড়িয়ে বিস্কোর কোমর ধরে রইল।
বিস্কো আস্তে আস্তে কাছি ধরে নামতে লাগল। একটু হাঁপানো গলায় মারিয়া বলল– ফ্রান্সিস শাঙ্কো ওরা তো এলো না।
–ওদের জন্যে ভাববেন না। এখন শুধু একটাই সমস্যা আপনাকে নিরাপদে জাহাজে নিয়ে যাওয়া। বিস্কো বলল।
বিস্কো হাঁপাতে হাঁপাতে নীচের দিকে তাকাল। দেখল–আর হাত দশেক নামলেই উপত্যকায় নামা যাবে। বিস্কো হাঁপাতে হাঁপাতে উপত্যকায় নেমে এলো।
ওদিকে ফ্রান্সিস তখনও দলপতি সিক্কার গলায় ছোরা চেপে আছে।
শাঙ্কো ফ্রান্সিসের কাছে এলো। বলল–এতক্ষণে মারিয়া আর বন্ধুরা উপত্যকায়। নেমে গেছে। ওরা জায়গাটা চেনে না। এইজন্যে আমাকে এখুনি যেতে হবে। একটু থেমে বলল–ফ্রান্সিস চলো–তাড়াতাড়ি।
