এবার ফ্রান্সিস দলপতি সিক্কার গলা থেকে ছোরাটা তুলে নিয়ে ছুটল চেস্টনাস্ট গাছের দিকে। দু’জনে গাছটার নীচে এলো। হাঁপাতে হাঁপাতে ফ্রান্সিস বলল–শাঙ্কো তুমি আগে নেমে যাও। আমি পরে নামবো। কিন্তু তোমার হাত কাটাছেঁড়া। পারবে কাছি ধরে ধরে নামতে?
–আমি হাত দুটো বেশি কাজে লাগাবো না। দুই হাঁটু দিয়ে কাছি দিয়ে নেমে যাবো। আমার জন্যে ভেবো না।
–বেশ। নামো তবে। ফ্রান্সিস বলল। শাঙ্কো নামতে শুরু করল। একটু সময় নিয়ে শাঙ্কো উপত্যকায় নেমে গেল।
ফ্রান্সিস এতক্ষণ খোলা তলোয়ার হাতে আট দশজন সৈন্য ছুটে আসছে।
এবার ফ্রান্সিস কোমরে গোঁজা ছোরাটা বের করল। গাছের সঙ্গে বাঁধা কাছিটা পোঁচ দিয়ে দিয়ে অর্ধেকটা কাটল। তারপর সৈন্যরা এসে পৌঁছুবার আগেই কাছি ধরে ধরে ফ্রান্সিস দ্রুত নেমে এলো। দেখল শাঙ্কো পেছনে পেছনে অনেক দূর চলে গেছে।
ওদিকে দু’জন সৈন্য কাছি ধরে নেমে আসতে লাগল। ফ্রান্সিস কাছি ধরে প্রাণপণে হাঁচকা টান দিতে লাগল। অর্ধেক কাটা কাছিটা ছিঁড়ে গেল। সৈন্য দু’জন ছেঁড়া কাছির সঙ্গে ছিটকে পড়ল। নীচের উপত্যকার একটা পাথরের চাঙের ওপর দু’জনে পড়ল। দু’জনেই মারা গেল।
এবার ফ্রান্সিস ছুটল হ্যারি শাঙ্কোদের দলের দিকে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ফ্রান্সিস বন্ধুদের কাছে এসে পৌঁছল। সবাই ধ্বনি তুলল–ও হো-হো।
ফ্রান্সিস বললকাছি ছিঁড়ে দিয়ে এসেছি। দু’জন সৈন্য কাছি ছিঁড়ে পড়ে গেছে। কিন্তু ওরা হাল ছেড়ে দেবে বলে মনে হয় না। দলপতি সিক্কার সৈন্যরা জাহাজঘাটা পর্যন্ত ধাওয়া করতে পারে।
মারিয়া মুখ বুজে সহ্য করতে লাগল। ফ্রান্সিস মারিয়ার পাশে এলো। ডান হাতে মারিয়াকে ধরে নিয়ে চলল।
ফ্রান্সিসরা যখন জাহাজঘাটায় পৌঁছল তখন দেখল দলপতি সিক্কার আট দশজন সৈন্য ছুটে আসছে। তাই দেখে ফ্রান্সিসের বন্ধুরা যারা জাহাজে ছিল তারা খোলা তলোয়ার হাতে জাহাজের পাটাতন নিয়ে নেমে এলো। সৈন্যদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। লড়াই শুরু হল। ফ্রান্সিস হাঁপাতে হাঁপাতে গলা চড়িয়ে বলল–আমার দলের সবাই জাহাজে উঠে যাও। লড়াই করতে যেও না।
অল্পক্ষণের মধ্যেই দলপতি সিক্কার সৈন্যরা হার স্বীকার করল। আহতদের ফেলে রেখে বাকিরা পালিয়ে গেল।
বিজয়ী ভাইকিংরা আনন্দে ধ্বনি তুলল–ও-হো-হো। সব ভাইকিংরাই গলায় গলা মেলাল–ও-হো-হো-।
ফ্রান্সিস মারিয়াকে ধরে ধরে কেবিনঘরে নিয়ে এলো। বলল–আর কোনো কথা নয়। এখন শুধু বিশ্রাম। ঘুম পেলে ঘুমিয়ে নাও। রাঁধুনি বন্ধু বলেছে রান্না সারতে দেরি হবে।
ওদিকে ডেক-এ তখন আড্ডা শুরু হয়েছে। শাঙ্কো হাত, পা নেড়ে বাকি ঘটনাটা বলছে।
ভেন ওষুধের থলে নিয়ে এলো। শাঙ্কোকে বলল–চুপ করো–জামাটামা খোল। শাঙ্কো গলা থামিয়ে জামাটামা খুলল। ভেন দেখল শাঙ্কোর হাত থেকে অল্প অল্প রক্ত পড়ছে। ভেন শাঙ্কোর ক্ষতস্থানে ওষুধ লাগিয়ে দিল। তারপর একটা ঝোলা থেকে একটা ওষুধ আঙ্গুলে তুলে নিয়ে দু-হাতের তেলোয় ঘষে ঘষে তিনটে বড়ি বানালো। শাঙ্কোকে বলল–দিনে একটা করে খাবে। এখন বকবকানি থামিয়ে নিজের কেবিনঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ো। তোমার এখন সম্পূর্ণ বিশ্রাম দরকার।
শাঙ্কো উঠে দাঁড়াল। চলল নিজের কেবিনের দিকে।
সেদিন শেষ রাতে সমুদ্রে ঘন কুয়াশা পড়েছে। মাস্তুলের মাথায় বসে নজরদার পেড্রো ঐ কুয়াশার আস্তরণের মধ্যে দিয়ে চারদিকে কিছুই দেখতে পাচ্ছিল না। একঘেয়েমির জন্যেই বটে–পেড্রোর আবার একটু তন্দ্রা এসেছিল। কতক্ষণ পেড্রো তন্দ্রায় চুলছে জানে না। হঠাৎই সজাগ হয়ে দেখল কুয়াশার মধ্যে দিয়ে দুটো ফেল্লুকা অর্থাৎ যুদ্ধ জাহাজ ওদের জাহাজের দুধার দিয়ে আসছে। পেড্রো ঘাবড়ে গেলেও ভয় পেল না। জলদস্যুদের জাহাজ নয়। দুটো জাহাজেই সবুজ নীল পতাকা উড়ছে। কিন্তু পেড্রো বুঝে উঠতে পারলো না ফেলুকা দুটোর উদ্দেশ্য কী। ওরা ওদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে আসছে না লড়াই করতে আসছে। পেড্রো চিৎকার করে বলল– ভাইসব সাবধান। ফ্রান্সিসকে বলল দুটো যুদ্ধ জাহাজ আমাদের জাহাজের দুপাশ দিয়ে চলেছে।
ডেক-এ শোয়া দু-তিনজন ভাইকিং এর ঘুম ভেঙে গেল পেড্রোর চিৎকারে। ওরা দেখল ওদের জাহাজকে মাঝখানে রেখে দুটো যুদ্ধ জাহাজ চলেছে একই গতিতে।
কুয়াশার মধ্যে দিয়ে অস্পষ্ট দেখল দুটো জাহাজেই গ্রীক সৈন্যদের মতো বুকে বর্ম মাথায় শিরস্ত্রাণপরা কিছু সৈন্য দুটো জাহাজেরই ডেক-এ ঘোরা ফেরা করছে।
ওরা ছুটল ফ্রান্সিসকে খবর দিতে। একটু পরেই ফ্রান্সিস হ্যারিকে নিয়ে ডেক-এ উঠে এলো। রেলিঙের ধারে গিয়ে দাঁড়াল দু’জনে। পেছনে আরো কয়েকজন ভাইকিং বন্ধু। পাশের জাহাজ থেকে একজন সৈন্য গ্রীক ভাষায় জিজ্ঞেস করল–তোমরা কারা? হ্যারি থেমে থেমে গ্রীক ভাষাতেই বলল–আমরা ভাইকিং।
–তোমরা কোথায় যাচ্ছো? সৈন্যটি জিজ্ঞেস করল।
–দেশে ফিরে যাচ্ছি। হ্যারি বলল।
-ঠিক আছে। আমাদের দলপতি আনগেভিন তোমাদের সঙ্গে কথা বলবেন। তোমরা জাহাজ থামাও। আমরাও জাহাজ থামাবো। সৈন্যটি বলল। হ্যারি ফ্রান্সিসকে সব বুঝিয়ে বলল। ফ্রান্সিস বলল-বলো যে আমরা তাড়াতাড়ি দেশে ফিরে যেতে চাই। আমরা জাহাজ থামাবো না। হ্যারি বলল সেকথা। সৈন্যটি বলল–তোমরা যদি পালিয়ে যাবার চেষ্টা করো তাহলে কামানের গোলা ছুঁড়ে তোমাদের জাহাজ ভেঙে গুঁড়িয়ে দেব। হ্যারি ফ্রান্সিসকে বলল কথাটা। ফ্রান্সিস মাথা নীচু করে একটুক্ষণ ভাবল। তারপর বলল– বলল যে আমরা দলপতির সঙ্গে কথা বলতে চাই। আমরা জাহাজ থামাবো। হ্যারি সৈন্যটিকে বলল সেকথা। সৈন্যটি বলল–তাহলে আমূরাও জাহাজ থামাচ্ছি।
