ফ্রান্সিস উঠে গিয়ে ওর জামাটা খুলে ফেলল। ভেজা জামাটা দিয়ে মারিয়ার মাথা মুখ হাত পা মুছে দিতে লাগল।বিস্কো হ্যারিও জামা খুলে মারিয়ার মাথা হাত পা মুছিয়ে দিল। মারিয়ার শরীর একটু শুকোল। আগের ঠাণ্ডা ভাবটা আর রইল না।
সকালের খাবার খাওয়া হয়ে গেছে। কাঁটাতার আর কাঠে তৈরি দরজা দিয়ে দলপতি সিক্কা ঢুকল। হেসে সকলের দিকে তাকিয়ে বলল–কাল রাতে তোমাদের খুব অসুবিধে হয়েছে তাই না? আমার বন্দিশিবিরটা এমনি। মাথার ওপরে খোলা আকাশ।
দলপতি সিক্কা এবার মারিয়ার দিকে তাকাল। মুখে চুকচুক শব্দ করে বলল–আহা একে তোরা অন্য জায়গায় নিয়ে গেলি না কেন। দ্যাখ তো কী অবস্থা হয়েছে চেহারার। বেচাকেনার হাটে তো দাম পড়ে যাবে। একে অন্দরমহলে নিয়ে যা। চানটান করে নতুন পোশাক পরুক।
একজন পাহারাদার মারিয়ার দিকে এগিয়ে গেল। ফ্রান্সিস দ্রুত উঠে দাঁড়াল। বলল– উনি আমাদের দেশের রাজকুমারী।
–তাহলে তো আরো ভালো। রাজকুমারী বলে কথা। সিক্কা হেসে বলল।
-আমি যাবো না। মারিয়া গলা চড়িয়ে বলে উঠল। ফ্রান্সিসও বলে উঠল–না– রাজকুমারীকে নিয়ে যেতে দেব না।
হ্যারি উঠে দাঁড়াল। বলল ফ্রান্সিস বাধা দিও না। এই নরককুণ্ডে রাজকুমারী আর একদিনের জন্যে থাকলেও অসুস্থ হয়ে পড়বেন। তাতে আমাদের সমস্যা বাড়বে বই কমবে না। অন্দরমহলে গিয়ে স্নান করে শুকনো পোশাক পরলেই রাজকুমারী সুস্থ থাকবেন। ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে বসে পড়ল। আর কোনো কথা বলল না। মারিয়া মাথা নেড়ে বলে উঠল–না আমি যাবো না। হ্যারি বলল রাজকুমারী আপনি আমাদের সকলের বিপদ ডেকে আনবেন না। আপনি যান। আপনি সুস্থ থাকুন এটাই আমরা চাই।
মারিয়া ফুঁপিয়ে উঠল। তারপর পাহারাদারদের সঙ্গে চলে গেল। দলপতি সিক্কাও বেরিয়ে গেল। ফ্রান্সিসরা চুপ করে বসে রইল।
ওদিকে সৈন্যটি শাঙ্কোকে নিয়ে দুপুরের খাবার খেতে গেল। শাঙ্কোর গায়ে সিক্কার সৈন্যদের পোশাক। কাজেই কেউ সন্দেহ করল না। শাঙ্কো বোবা কালার অভিনয় করতে লাগল।
খেয়েটেয়ে শাঙ্কো এবার চলল সমুদ্রতীরের দিকে। যেখানে ওদের জাহাজটা রয়েছে শাঙ্কো সেখানে এলো। জাহাজ থেকে পার অব্দি পাতা কাঠের পাটাতনের ওপর দিয়ে হেঁটে গিয়ে জাহাজে উঠল।
বন্ধুরা ছুটে এলো। সবাই জানতে চায় ফ্রান্সিসদের কথা। শাঙ্কো সকলের দিকে তাকিয়ে একে একে সব ঘটনা বলে গেল।
ফ্লেজার বলল–এখন কী করবে?
–দলপতি সিক্কা ফ্রান্সিসদের ক্রীতদাসের হাটে বিক্রির জন্যে তুলবেই। এখন পালানোর কথা ভাবতে হবে। কীভাবে ফ্রান্সিসদের মুক্ত করা যায়–এসব ভাবতে হবে। তার ব্যবস্থা করতে হবে। শাঙ্কো বলল।
–তুমি এখন কী করবে? ফ্লেজার বলল।
–আমি আজকের রাতটা জাহাজেই থাকবো। শাঙ্কো বলল। তারপর গায়ের পোশাকটা খুলে ফেলল। দেখা গেল ভেতরে ওদের পোশাকটাও ছিঁড়ে গেছে। বুকে পিঠে রক্তের দাগ। হাতেই সবচেয়ে দাগ বেশি। তখনও অনেক ক্ষতে রক্ত জমে আছে।
শাঙ্কো চারদিকে তাকিয়ে ভেনকে খুঁজল। ভেন এখানে নেই। শাঙ্কো ভেনের কাছে যাবে বলে এগোচ্ছে তখনই দেখা গেল ভেন ওর ওষুধপত্রের থলে নিয়ে আসছে। ভেন সকলের দিকে তাকিয়ে বলল-”তোমরা শাঙ্কোকে বিরক্ত করো না। ওর এখন বিশ্রাম প্রয়োজন।
সবাই চলে গেল। কয়েকজন রইল। ওরা চুপ করেই রইল।
ভেন শাঙ্কোকে বলল জামা খুলে ফেল। শাঙ্কো ওদের দেশীয় পোশাকটা খুলে ফেলল। এবার ভেন বলল-নড়াচড়া করো না।
ভেন থলে থেকে দুটো কাঁচের বোয়াম বের করল। বোয়াম দুটো রেখে থলে থেকে পরিষ্কার ন্যাকড়া বের করল। তারপর দুটো বোয়ামেরই ওষুধে ন্যাকড়াটা ভিজিয়ে নিয়ে শাঙ্কোর কাটাছেঁড়া জায়গায় ওষুধ লাগাতে লাগল। এবার দেখা গেল শাঙ্কোর শরীর হাত পা কাটাতারের খোঁচায় কীভাবে কেটে গেছে। ভেন বারকয়েক ওষুধটা লাগাল। তারপর বলল–এখন পোশাক খুলেই রাখো। যাও শুয়ে পড়ো গে।
শাঙ্কো আস্তে আস্তে উঠে নিজের কেবিনঘরে গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল। জ্বালা যন্ত্রণা কমল অনেকটা।
সেই রাতটা শাঙ্কো জাহাজেই রইল।
পরদিন সকালেই সকালের খাবার খেয়ে চলল বন্দিশিবিরের দিকে। তার আগে দলপতি সিক্কার সৈন্যদের পোশাকটা পরে নিল। এখন এই পোশাকটাই ভরসা। সিক্কার সৈন্যদের চোখে ধূলো দেওয়ার এটাই বড়ো অস্ত্র।
অল্পক্ষণ পরেই শাঙ্কো বন্দিশিবিরের কাছে এলো। দেখল এর মধ্যেই বন্দিশিবিরের বাইরে লোকজন জমে গেছে।
বন্দিশিবিরের পাশেই একটা পাথরের মঞ্চমতো। তার মাঝখানে একটা গোল কাঠের থামমতো। তাতে দড়ি বাঁধা। সামনেই একটা পাথরের আসনমতো।
কিছুক্ষণের মধ্যেই দলপতি দু’জন বৃদ্ধকে সঙ্গে নিয়ে এলো। বৃদ্ধ দু’জন বোধহয় তার পরামর্শদাতা।
একজন সৈন্যের পাহারায় মারিয়াকে আনা হল। মারিয়ার পোশাক এখন এ দেশীয় মেয়েদের মতো পা পর্যন্ত ঢাকা ঢোলা জামা। মারিয়াকে সৈন্যটি বন্দিশিবিরে ঢোকাল।
ফ্রান্সিসরা এগিয়ে এলো। ফ্রান্সিস মারিয়ার মুখ চোখ দেখেই বুঝল মারিয়া রাত্রে ঘুমোয় নি। ফ্রান্সিস বললতোমার শরীর ভালো তো? মারিয়া মাথা কাত করল।
তখনও ক্রীতদাসের মঞ্চে ভোলা হয়নি।শাঙ্কো চারদিকে নজর রেখে ঘুরতে লাগল। শাঙ্কোর পরনে সিক্কার সৈন্যদের পোশাক। কাজেই কেউ সন্দেহ করল না।
শাঙ্কো উত্তর দিকের ঝোঁপজঙ্গলের মধ্যে একটা বিরাট চেস্টনাট গাছ দেখতে পেল। শাঙ্কো তাড়াতাড়ি সেদিকে গেল। ঝোঁপজঙ্গল সরিয়ে এগিয়ে গেল। চেস্টনাট গাছটা দেখল। তারপর ঝোঁপজঙ্গলের মধ্যে দিয়ে আরো এগোল। দেখলো ওখানে একটা খাদমতো। খাদের পরেই সবুজ ঘাসে ঢাকা উপত্যকা। সঙ্গে সঙ্গে শাঙ্কোর পালানোর উপায় ভাবা হয়ে গেল। ও দ্রুত ছুটল সমুদ্রতীরের দিকে। ওদের জাহাজে এলো। তখন শাঙ্কো মুখ হাঁ করে হাঁপাচ্ছে।
