এবার শাঙ্কো আস্তে আস্তে জঙ্গলে ঢুকল। ডালপাতার আড়াল থেকে পাহারাদারটির দিকে এগোতে লাগল। পাহারাদারের হাত কয়েক পেছনে এসে দাঁড়াল। শাঙ্কো একটু মাথা নিচু করে তৈরি হল। বৈদ্যুৎ চমকালো। বিদ্যুতের আলোয় আন্দাজ করে পাহারাদারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। হাতের ছোরাটা পাহারাদারের পিঠে ঢুকিয়ে দিল। পাহারাদারটি শাঙ্কোর ধাক্কা সামলাতে না পেরে মাটিতে পড়ে গেল। কয়েকবার নড়েচড়ে মরে গেল।
শাঙ্কো তখন হাঁ করে হাঁপাচ্ছে। মাটিতে বসে পড়ল। একটুক্ষণ হাঁপালো।
তারপর ছোরাটা কোমরে গুঁজল। পাহারাদারের পোশাক টেনে খুলল। নিজের কাঁটাতারের ঘন্টা লেগে শতচ্ছিন্ন পোশাকটা খুলল। তারপর পাহারাদারের পোশাকটা পরল। পোশাকের মাথার কাছে কাপড়টা বেশি। ওটা দিয়ে মাথা ঢাকা যায়। শাঙ্কো পাহারাদারের তলোয়ারটা নিল।
কোমরের মোটা বেল্টটা লাগাতে লাগাতে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এলো।
তখন ঝড়বৃষ্টি থেমে গেছে। তবে বিদ্যুৎ চমকানো বন্ধ হয় নি।
অন্ধকারের মধ্যে শাঙ্কো আস্তে আস্তে কাঁটাতারে ঘেরা বন্দিশিবিরের পেছনের দিকে এলো। ফ্রান্সিসরা ঐদিকটাতেই বসেছিল। শাঙ্কো কাঁটাতারের বেড়ার কাছে এসে চাপা গলায় ডাকল–ফ্রান্সিস ফ্রান্সিস। ফ্রান্সিস বৃষ্টিভেজা মাটিতেই শুয়ে ছিল। ডাক কানে যেতেই দ্রুত উঠে বসল। পেছনদিকে তাকাল। তখনই বিদ্যুৎ চমকালো। ও শঙ্কোকে দেখতে পেল। তাড়াতাড়ি উঠে কাঁটাতারের বেড়ার কাছে এলো।
শাঙ্কো বলল–আমি পোশাক পাল্টেছি। তলোয়ারও পেয়েছি। এখন কী করবো?
দলপতি সিক্কার–সৈন্যদের মধ্যে মিশে থাকো। পরশু ক্রীতদাস কেনাবেচার হাট বসবে। তখন আমাদের তো বন্দিশিবিরের বাইরে আনা হবে। হাটে নিয়ে যাওয়া হবে। তখন পালাবার উপায় ভাববো। লড়াই করে নয়। বুদ্ধি খাঁটিয়ে অক্ষত দেহে আমাদের পালাতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
–তাহলে সব ভালো করে দেখতে হবে। একটা উপায় বের করবোই। শাঙ্কো বলল।
কাটাতারে ঘষা খেয়ে তুমি খুব আহত হওনি তো? হ্যারি এগিয়ে এসে বলল।
তা সে হয়েইছি। ও ভেনের ওষুধে সেরে যাবে। এখন কী করে পালাবো সেটা ভাবতে হবে। শাঙ্কো বলল। তারপর ও সৈন্যদের ছাউনির দিকে চলল।
রাত শেষ হয়ে এসেছে। শাঙ্কো ওপরে আকাশের দিকে তাকাল। দেখল আকাশ সাদাটে হয়ে আসছে। সূর্যোদয়ের বেশি দেরি নেই।
একটু পরেই সূর্য উঠল। আলো ছড়ালো সৈন্যদের ছাউনিতে বন্দি শিবিরে। ওপাশের জঙ্গলে পাখির ডাক শুরু হল।
শাঙ্কো সৈন্যদের ছাউনিতে এ-ঘর ও-ঘর দেখতে লাগল। সব ঘরেই সৈন্যদের সংখ্যা বেশি। পশ্চিম দিকে একটা ছোট্ট ঘর দেখল। কাছে এগিয়ে এলো। ঘরটায় মাত্র একজন সৈন্য আছে। শাঙ্কো ঐ ঘরটাই বেছে নিল। ঘরে আর একটা খালি লোহার খাট।
শাঙ্কো ঘরটায় ঢুকল। দেখল সৈন্যটি ঠিক তখনই ঘুম ভেঙে উঠে বসল। সৈন্যটি হাই তুলতে তুলতে শাঙ্কোকে দেখতে পেল। তারপর গ্রীক ভাষায় শাঙ্কোকে বলল–ভাই তুমি কি কাউকে খুঁজছো?’ শাঙ্কো হাসল। আঙ্গুল দিয়ে মুখ গলা দেখিয়ে আবার হাসল।
ও বোবা কালা। সৈন্যটি বলল। শাঙ্কো হাত দিয়ে জল খাওয়ার ইঙ্গিত করল। সৈন্যটি বুঝল জলতেষ্টা পেয়েছে লোকটার। ও ঘরের কোণায় রাখা মাটির পাত্র দেখাল। শাঙ্কো গিয়ে জল খেয়ে এলো।
সৈন্যটি চুপ করে বসে রইল। শাঙ্কোর সঙ্গে আর কী কথা বলবে। তবু হাত নেড়ে ইঙ্গিতে জানতে চাইল বোবা কালা লোকটা কোন্ দেশের কোত্থেকে এসেছে। শাঙ্কোও হেসে আঙ্গুল নেড়ে বোঝাল ও এই দেশেরই লোক। সৈন্যটি কী বুঝল কে জানে। সে চুপ করে রইল। এবার শাঙ্কো খালি লোহার খাটটা দেখিয়ে ইঙ্গিতে বোঝাল এ খাটে সে শুতে চায় থাকতে চায়। সৈন্যটি মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি জানাল।
সৈন্যটি ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। শাঙ্কো তখন খালি খাটেই শুয়ে পড়েছে। ঘুমিয়ে পড়েছে। কত রাত জাগতে হয়েছে। সারা শরীরে হাতে পায়ে কাঁটাতারের খোঁচা। সেসব ঢাকতে শাঙ্কো হাত দুটো খোলা জামার পকেটে রাখল। সৈন্যটির নজরে পড়লে নিশ্চয়ই জানতে চাইবে কী করে কাটল।
কিছুক্ষণ পরে সৈন্যটি খাবার নিয়ে ঘরে ঢুকল। দু’জনের খাবারই এনেছে। ঘুমন্ত শাঙ্কোকে ডাকতে গিয়ে দেখল শাঙ্কোর কাটা ছেঁড়া হাত। ও খাবারটা শাঙ্কোর বিছানাতেই রাখল। নিজেও খেল না। শাঙ্কোর ঘুম ভাঙার জন্যে অপেক্ষা করতে লাগল।
বেশ কিছুক্ষণ পরে শাঙ্কোর ঘুম ভাঙল। ও উঠে বসল। একটু সময় গেল বুঝতে যে ও এখন কোথায় আছে। সৈন্যটিকে দেখে বুঝল সব। সঙ্গে সঙ্গে ও হাত দুটো পকেটে পুরল। সৈন্যটি হেসে বলল–ঐ কাটা ছেঁড়া দাগ কি সবসময় পকেটে ঢেকে রাখতে পারবে? শাঙ্কো বোকার হাসি হাসল। সৈন্যটি ওর খাবার দেখিয়ে বলল–এবার তো হাত বের করতে হবেই। শাঙ্কো হেসে একবার মাথা ঝাঁকিয়ে নিয়ে খেতে লাগল। খেতে খেতে সৈন্যটি শাঙ্কোকে ইঙ্গিতে বোঝাল-তোমার হাত মুখ এরকমভাবে কেটে ছড়ে গেল কেন?শাঙ্কো গাছে চড়ার ইঙ্গিত দিয়ে বোঝাল গাছে উঠতে গিয়ে হাত মুখ কেটে ছড়ে গেছে। সৈন্যটি মাথা নেড়ে বোঝাল ও বুঝতে পেরেছে। সৈন্যটি বেরিয়ে গেল। শাঙ্কো আবার ঘুমিয়ে নিল।
ওদিকে খোলা আকাশের নীচে বন্দিশিবিরে ফ্রান্সিসরা ঝড়বৃষ্টিতে ভিজে গেল। জল বেশি জমে নি। পুবদিকে ঢাল বেয়ে বৃষ্টির জল চলে গেছে। তবু মাটি তো ভেজা। ফ্রান্সিসরা ভেজা মাটিতেই শুয়ে বসে রইল। ফ্রান্সিসদের এরকম অভিজ্ঞতা আগেও হয়েছে। বন্ধুরাও খুব একটা কাবু হয়নি। কিন্তু মারিয়া দুহাত বুকের কাছে নিয়ে জড়সড় হয়ে বসে রইল।
