শাঙ্কো এতক্ষণ ফ্রান্সিসদের কথাবার্তা শুনছিল। এবার বলল–ফ্রান্সিস আমি আজ রাতেই পালাবো। ফ্রান্সিস আর হ্যারি চমকে উঠল। ফ্রান্সিস বলল–শাঙ্কো–তুমি কি পাগল হলে। এই কাঁটাতারে ঘেরা বন্দিশিবির থেকে পালানো অসম্ভব বলবো না। কিন্তু জীবনের ঝুঁকি নিতে হবে।
–ফ্রান্সিস, শুধু আমিই পালাবো। বাইরে থেকে তোমাদের মুক্তির ব্যবস্থা করবো। শাঙ্কো বলল।
–ঠিক আছে। আমাকে বোঝাও কী করে পালাবে? ফ্রান্সিস বলল। শাঙ্কো উঠে দাঁড়াল। বলল–চলো–দেখাচ্ছি। ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। দু’জনে চলল সদর দরজার দিকে।
দরজার কাছে এসে শাঙ্কো একজন পাহারাদারকে স্পেনীয় ভাষায় বলল-জল আনন। জল ফুরিয়ে গেছে। পাহারাদারটি বলে উঠল–তা কি করে হয়। সকালেই কাঠের পীপেয় জল ভরা হয়েছে।
–ঠিক আছে। তুমি দেখবে এসো। শাঙ্কো বলল। পাহারাদার দরজার তালা খুলে ঢুকল। চলল খাবার জল আছে কিনা দেখতে। অন্য পাহারাদারটি তলোয়ার উঁচিয়ে দরজা পাহারা দিতে লাগল।
শাঙ্কো মৃদুস্বরে বলল–ফ্রান্সিস দরজার দুপাশে আর ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখো শুধু তারে বাঁধা। ফ্রান্সিস পায়চারি করতে করতে লক্ষ্য করল। শাঙ্কোর কথা ঠিক। ফ্রান্সিস বলল–ঠিক আছে। কিন্তু ওপরে হাত পাঁচেক কাটা-তারে ঘেরা।
–ঐটুকু সাবধানে পেরোতেই হতে হবে। শাঙ্কো বলল।
–তবু তুমি আহত হবেই। ফ্রান্সিস বলল।
–ঠিক আছে। সেসব কাটাটাটা ভেন-এর ওষুধেই সেরে যাবে। কিন্তু পালাবার এই সুযোগ ছাড়া যাবে না। শাঙ্কো বলল। ফ্রান্সিস আর কিছু বলল না। তখনই পাহাদারটি এলো। ভাঙাভাঙা স্পেনীয় ভাষায় বলল–তোমাকে কে বলেছে যে জল নেই। পীপে ভর্তি জল।
–তাহলে কেউ মিথ্যে করে বলেছে। শাঙ্কো বলল।
ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো নিজেদের জায়গায় ফিরে এলো।
ফ্রান্সিস বলল–শাঙ্কো–তুমি দরজার মাথা দিয়ে পালাতে চাও। কিন্তু ঐখানে রাতে মশাল জ্বলে আর পাহারাদারেরা পাহারা দেয়।ওদের নজর এড়িয়ে উঠে পালাতে পারবে?
–ফ্রান্সিস–আকাশের দিকে তাকাও। শাঙ্কো বলল। ফ্রান্সিস কথাটার অর্থ বুঝল না। ওপরে খোলা আকাশের দিকে তাকাল। দেখল আকাশে কালো মেঘের আসা যাওয়া চলছে। ফ্রান্সিস মৃদু হেসে বলল–বৃষ্টি হবে। দরজার মাথায় রাখা মশাল নিভে যাবে। পাহারাদাররাও সৈন্যদের ছাউনিতে চলে যাবে। তখন সাধারণ তারে পা রেখে রেখে ওঠা যাবে। বাকি হাত চার-পাঁচেক কাটা-তার পার হতে হবে। এই বলতে চাও।
শাঙ্কো হেসে বলল–ফ্রান্সিস তোমার বুদ্ধি চিন্তার কাছে আমরা ছেলেমানুষ।
ফ্রান্সিস মাথা নেড়ে বলল–উঁহুশাঙ্কো–তুমি অনেক চিন্তাভাবনার পরিচয় দিয়েছে। এবার কাজটা করা। তার জন্যে এখন প্রয়োজন ঝড় বৃষ্টির। আকাশের মেঘ দেখে যা বুঝতে পারছি সন্ধে নাগাদ ঝড়বৃষ্টি শুরু হবে। আমরা ভাইকিং। সমুদ্রে সমুদ্রে ঘুরে বেড়াই। ঝড়বৃষ্টির আগাম সংকেত আমরা সহজেই বুঝি। সাবাস–শাঙ্কো।
ফ্রান্সিসদের অনুমান সত্যি হল। সন্ধের পরেই আকাশ ঘন মেঘে ঢেকে গেল। আকাশে ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকাতে লাগল। বিদ্যুতের আঁকাবাঁকা রেখা আকাশটা যেন চিরে ফেলতে লাগল। সেই সঙ্গে বাজ পড়ার প্রচণ্ড শব্দ।
প্রচণ্ড হওয়ার ঝড় ঝাঁপিয়ে পড়ল বন্দিশিবিরের ওপরে। শুরু হল বৃষ্টি। দরজার মাথায় রাখা মশাল নিভে গেল। পাহারাদার দু’জন সৈন্যদের ছাউনিতে চলে গেল। একজন ছাউনির জানালা দিয়ে বন্দিশিবিরের দিকে নজর রাখল।
গভীর অন্ধকারে শুধু বিদ্যুতের আলো ঝলসে উঠছে যখন, তখন যা মুহূর্তের জন্যে দেখা যাচ্ছে।
–ফ্রান্সিস পালাচ্ছি। এই বলে শাঙ্কো দ্রুত বন্দিশিবিরের দরজার কাছে এলো।
সাধারণ তারগুলোয় পা রেখে রেখে হাত দিয়ে ধরে ধরে উঠতে লাগল। এবার কাটাতার পার হওয়া। এটুকু উঠতে কয়েক প্যাঁচ কাঁটাতার হাত দিয়ে ধরতে হল। পায়ে ভর নিতে হলো। তাতেই কাটাতারের খোঁচায় হাত পা জখম হল।
এবার শুধু কাঁটা তার পার হওয়া। শাঙ্কো উঠতে লাগল। তাতে পায়ে গায়ে কাঁটাতারের কাটা ফুটতে লাগল। বুকে গায়েও কাটা ফুটতে লাগল। শাঙ্কোর পোশাক রক্তে ভিজে গেল। কানের কাছে বৃষ্টিঝরার একটানা শব্দ। অন্ধকার চোখের সামনে। শুধু বিদ্যুৎ ঝলসে ওঠা। ঐ দু এক মুহূর্তে। তারপর নিচ্ছিদ্র অন্ধকার।
শাঙ্কো মুখ বুজে সব যন্ত্রণা সহ্য করতে লাগল। একসময় ওঠা শেষ হল। এবার নামা। শাঙ্কো কাঁটা ছাড়া তার দেখে দেখে নামতে লাগল। তখনও বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। পাহারাদার তার সৈন্যদের ছাউনির জানালা দিয়ে দেখল, সঙ্গীকে ডাকাডাকি করল। সঙ্গীকে পেল না। ওদিকে বন্দি পালাচ্ছে। পাহাদারটি খোলা তলোয়ার হাতে ছুটে এলো। শাঙ্কোও লাফ দিয়ে মাটিতে নেমেছে পাহারাদার তখনই ওর সামনে এসে দাঁড়াল। শাঙ্কোর পোশাক ছেঁড়া খোঁড়া।শাঙ্কো সঙ্গে সঙ্গে উঁবুহয়ে পোশাকের মধ্যে হাত বাড়িয়ে ছোরাটা বের করল। পাহারাদার তলোয়ার চালাল। শাঙ্কো ছোরা দিয়ে ঠেকাল। শাঙ্কো ভালো করেই বুঝেছিল শুধু ছোরা দিয়ে পাহারাদারের আক্রমণ ঠেকানো যাবে না। শাঙ্কো দ্রুত একবার চারপাশটা দেখে নিল। বাঁদিকে একটু দূরেই দেখল জঙ্গলমতো। শাঙ্কো সঙ্গে সঙ্গে সেদিকে ছুটল। পাহারাদারও তলোয়ার হাতে ওর পেছনে পেছনে ছুটল।
শাঙ্কো জঙ্গলে ঢুকে পড়েই দিকপাল্টে বাঁদিকে সরে গেল। দ্রুত জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এলো। পাহারাদার তখনও জঙ্গলে শাঙ্কোকে খুঁজছে।
