হ্যারি আগে থেকে বন্দিদের কাছে গেল। গ্রীক ভাষায় ওদের সঙ্গে কথা বলতে লাগল। কিছুক্ষণ পরে হ্যারি ফিরে এলো। তখনই পাহারাদারেরা সকলের খাবার নিয়ে ঢুকল। বন্দিদের বসতে বলল। সামনে একটা করে বড়ো পাতা দেওয়া হল। খেতে দেওয়া হল গোল কাটা রুটি আর আলু শাক-সজীর ঝোল। খেতে খেতে হ্যারি বলল ওরা প্রায় সবাই দস্যুতার জন্যে এখানে কয়েদ হয়ে আছে। এখনকার শাসক দলপতি নাকি অদ্ভুত লোক। নিজেই টহলদার সৈন্যদের সঙ্গে পাহারা দেয়। দলপতির নাম সিক্কা। মাল্টা এখান থেকে বেশি দূরে নয়। হ্যারি একটু থেমে বলল–সবচেয়ে মারাত্মক খবর হল কয়েকদিন পরেই এখানে ক্রীতদাস কেনাবেচার হাট বসবে। সুস্থ সবল বন্দিদের সেই হাটে বিক্রি করা হবে।
-বলো কি! ক্রীতদাস কেনাবেচা যারা করে তাদের মধ্যে বিন্দুমাত্র মানবিকতা বোধ থাকেনা। তাদের কাছে ক্রীতদাসরা গরু ছাগলের মতো। বোঝাই যাচ্ছে আমরা ভয়ানক বিপদে পড়েছি। শুধু বন্দির জীবন মেনে নেওয়া যায় কিন্তু ক্রীতদাসের জীবন মেনে নেওয়া অসম্ভব। ফ্রান্সিস বলল।
–কী করবে এখন? হ্যারি বলল।
–পালাবার উপায় বের করতে হবে। এখানকার পাহারার ব্যবস্থা দেখে পালানোর উপায় ভাবতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
একটু বেলা হতে বন্দি শিবিরের দরজার সামনে সৈন্যদের তৎপরতা দেখা গেল। তার মানে ওদের দলনেতা সিক্কা হয়তো আসবে। তারই তোড়জোড় শুরু হল।
কিছুক্ষণ পরে দরজা খুলে গেল। একজন বৃদ্ধকে নিয়ে সিক্কা ঢুকল। এ কি? এ তো সেই থুতনিতে ছুঁচোলো দাড়িওয়ালা লোকটা। সিক্কা বুঝল ফ্রান্সিসরা একটু অবাকই হয়েছে। সিক্কা ফ্রান্সিসদের কাছে এলো। হাসি নয়। যেন দাঁত খিঁচিয়ে বলল–এবার ক্রীতদাসের হাটে আমরা ভালো দর পাবো। এরকম বলিষ্ঠদেহী সাদা মানুষ তো সব সময় পাওয়া যায় না। ফ্রান্সিস বুঝল ওদের ক্রীতদাসের কেনাবেচার হাটে বিক্রি করা হবে। ফ্রান্সিস বসেছিল। এবার দ্রুত উঠে দাঁড়াল। স্পেনীয় ভাষায় বলল–আমাদের কেন ক্রীতদাসের হাটে বিক্রি করা হবে? আমাদের অপরাধ কী?
–বাঃ তোমরা তো রাজা পিটারের গুপ্তচর। তোমাদের মেরেই ফেলতাম কিন্তু তোমাদের বাঁচিয়ে রেখেছি ক্রীতদাসের হাটে বিক্রি করবো বলে। সিক্কাও স্পেনীয় ভাষায় বলল।
–আগে প্রমাণ করুন যে আমরা রাজা পিটারের গুপ্তচর। যদি প্রমাণ করতে পারেন তাহলে যে শাস্তি দিতে চান দেবেন। আমরা সেই শাস্তি মেনে নেব। ফ্রান্সিস বলল।
–তোমাদের ব্যাপারে অত খোঁজখবর করা যাবে না। তোমাদের ক্রীতদাস কেনাবেচার হাটে বিক্রি করা হবে। ব্যস। সিক্কা বলল।
ফ্রান্সিস আর কোনো কথা বলল না। মাটিতে বসে পড়ল।
সিক্কা দস্যুদলের কাছে গেল। বলল–তোমাদেরও বিক্রি করা হবে। সব মিলিয়ে এবার আমার ব্যবসা ভালোই হবে। সিক্কা খুক খুক করে হাসল। তারপর দরজার দিকে চলল। যেতে যেতে গলা চড়িয়ে বলল–এদের যত্নটত্ন করবি। ভালো খেতে দিবি। কারো যেন অসুখ না করে। সবারই একেবারে তরতাজা চেহারা চাই। তবে না ক্রীতদাস বেচাকেনার হাটে বেশি দাম পাবো।
সিক্কা বেরিয়ে গেল। দরজা বন্ধ হল।
ফ্রান্সিসদের বন্দিজীবন কাটতে লাগল। ফ্রান্সিস সারাক্ষণ শুয়ে থাকে আর ভাবে কীভাবে এই বন্দি শিবির থেকে পালানো যায়।
দুদিন একইভাবে কাটল।
তৃতীয় দিন। তখন ফ্রান্সিসরা সকালের খাবার খেয়েছে। ফ্রান্সিস সামান্য ঘাসধুলোর ওপর শুয়ে পড়ল। মাথায় এক চিন্তা কী করে মুক্তি পাবো।
একটু পরে হ্যারি বলল–ফ্রান্সিস–ওঠো আমাদের সমস্যা আরো বাড়ল। ফ্রান্সিস চোখের ওপর থেকে দুহাতের কনুই সরিয়ে তাকাল। বলল–ওকথা বলছো কেন?
রাজকুমারী বিস্কো পেড্রো আরো কয়েকজন বন্দি হল। হ্যারি বলল।
বলো কি? ফ্রান্সিস দ্রুত উঠে বসল। দেখল-দরজা খোলা হল। রাজকুমারী বিস্কোরা ঢুকছে। ফ্রান্সিস বলে উঠল–সর্বনাশ। আর পালাবার ভরসা নেই। ক্রীতদাসের হাটে আমরা বিক্রি হয়ে যাবো।
মারিয়ারা ফ্রান্সিসদের কাছে এলো। বসল।
ফ্রান্সিস রেগে বলে উঠল–তোমরা এত অধৈর্য হয়ে পড়লে কেন?মারিয়াবিস্কো– তোমরা কেন এলে?
–তোমাদের কোন খোঁজ নেই দুদিন ধরে। আমরা চুপ করে বসে থাকতে পারি? মারিয়া একটু কান্নাভেজা গলায় বলল।
–আমাদের খুঁজতে এসে লাভের মধ্যে আমাদের সমস্যা বাড়ালে। ফ্রান্সিস বলল।
–আমরা তোমারিয়া বলতে গেল। ফ্রান্সিস ওকে থামিয়ে দিয়ে বলে উঠল– খুব অন্যায় করেছো। জানো দুদিন পরে এখানে ক্রীতদাস কেনাবেচার হাট বসবে। ভেবেছিলাম তার আগেই পালাবো। তোমরা ধরা পড়লে–আর কোনো উপায় নেই। ক্রীতদাসের হাটে বিক্রি হতে হবে।
–এর মধ্যে তো একটা উপায় বের করতে পারবে। মারিয়া বলল।
-ক্রীতদাস কেনাবেচা যারা করে তারা যে কী হৃদয়হীন তা তোমার জানা নেই। এদের কবল থেকে বাঁচতে গেলে হয় মরতে হবে নাতো সারাজীবন পঙ্গু হয়ে থাকতে হবে। ফ্রান্সিস বলল। মারিয়া চুপ করে রইল তারপর কেঁদে ফেলল। বলল–তাহলে এদের আমি বলবো যে আমাকে বিক্রি করুক তোমাদের যেন মুক্তি দেয়।
–এ কথাটা তুমি বলতে পারলে? ফ্রান্সিস আস্তে বলল। মারিয়া কোনো কথা না বলে কাঁদতে লাগল। হ্যারি মারিয়ার কাছে এসে বসল। বলল-রাজকুমারী আপনি কান্নাকাটি করলে আমাদের মন দুর্বল হয়ে যাবে। আপনি শান্ত হোন। ফ্রান্সিস নিশ্চয় পালাবার কোনো উপায় বের করবে। শুধু আপনি ভেঙে পড়বেন না–এই অনুরোধ। মারিয়া চোখ মুছল। আস্তে আস্তে শান্ত হল।
