তখন রাত গভীর। ফ্রান্সিস হ্যারি আর শাঙ্কোকে নিয়ে জাহাজের ডেকে উঠে এলো। দেখল ফ্রেজার হুইলের কাছে দাঁড়িয়ে আছে।দু’জন ভাইকিং বন্ধু নোঙর তুলল। কয়েকজন ভাইকিং ফ্লেজারের নির্দেশে দাঁড়ঘরে নেমে গেল। দাঁড় বাওয়া চলল। ফ্লেজার হুইল ঘুরিয়ে জাহাজ চালাল তীরের দিকে। জাহাজটা আস্তে আস্তে সমুদ্রতীরে ভিড়ল। কাঠর পাটাতন পাতা হল। যথাসম্ভব নিঃশব্দেই সব কাজ হল।
পাটাতনের ওপর দিয়ে ফ্রান্সিস হ্যারি আর শাঙ্কো হেঁটে তীরে নামল। একটু মাঠমতো। তারপরই জঙ্গল শুরু হয়েছে। ওরা মাঠ পার হয়ে চলল। জোছনা উজ্জ্বল। কাছাকাছি সবই দেখা যাচ্ছে। ওরা একটু পরেই জঙ্গলে ঢুকল। বন খুব ঘন নয়। ছাড়াছাড়া গাছপালা। ঘাস-ঢাকা মাটিতে কোথাও কোথাও ভাঙা জোছনা পড়েছে। ওরা জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে চলল।
বনজঙ্গল শেষ হল। বনজঙ্গল থেকে বেরিয়ে দেখল একটা বড়ো রাস্তা উত্তরমুখো চলে গেছে! দুপাশে পাথর আর কাঠের বাড়ি। বস্তি এলাকা।
ফ্রান্সিরা দাঁড়িয়ে পড়ল। কোনো বাড়িতে ডেকে খোঁজ নেবে ফ্রান্সিস এরকমই ভাবছিল। তখনই হঠাৎ ডানদিকে গলিমতো একটা পথ দিয়ে জনা দশেক সৈন্য এসে হাজির হল। সৈন্যদের বুকে বর্ম মাথায় শিরস্ত্রাণ নেই। ঝোলা হাতা হাঁটুঝুল ঢোলা জামা। কোমরে ফেট্টি তাতে তলোয়ার গোঁজা। প্রয়োজনে এঁদের সঙ্গে লড়া যাবে। একেবারে ফ্রান্সিসদের মুখোমুখি। চাঁদের উজ্জ্বল আলোয় সবই পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। দুদলই দাঁড়িয়ে পড়ল। এক মুহূর্ত। সৈন্যরা প্রায় ফ্রান্সিসদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে এগিয়ে এলো। ফ্রান্সিস তলোয়ার ফেলে দিল। পাথুরে মাটিতে শব্দ হল-ঝনাৎ। ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে বলল–হ্যারি শাঙ্কো-তলোয়ার ফেলে দাও। ফ্রান্সিসদের অস্ত্র ত্যাগ করতে দেখে সৈন্যদের মধ্যে থেকে থুতনিতে ছুঁচোলো দাড়িওয়ালা একজন সর্দার গোছের সৈন্য এগিয়ে এলো। গ্রীক ভাষায় বলল–তোমরা তো এখানকার লোক নও।
হ্যারি বলল।–না। আমরা ভাইকিং। বিদেশি।
–এখানে কেন এসেছো? লোকটি বলল।
–দেশ দেশান্তরে ঘুরে বেড়ানো আমাদের নেশা। হ্যারি বলল।
সর্দার ওর সঙ্গীদের দিকে তাকাল।
তখন সঙ্গীদের মধ্যে একজন বলল–তোমরা এখানে কী করে এলে?
জাহাজে চড়ে। হ্যারি বলল।
–তোমাদের জাহাজ কোথায়? সর্দার জানতে চাইল।
–ঐ জঙ্গলের পরে সমুদ্রতীরে ভিড়িয়ে রাখা হয়েছে। হ্যারি বলল।
–তোমরা এখন কোত্থেকে আসছো? সর্দার জিজ্ঞেস করল।
সাইপ্রাস দ্বীপ থেকে। হ্যারি বলল।
–মিথ্যে কথা। সদার গলায় জোর দিয়ে বলল।
–ভাইকিংরা মিথ্যে কথা বলে না। হ্যারিও গলা চড়িয়ে বলল।
–তোমরা রাজা তৃতীয় পিটারের গুপ্তচর। খোঁজ নিতে এসেছো আমাদের সৈন্য সংখ্যা কত। কোথায় কোথায় আমাদের ঘাঁটি। লোকটি বলল।
–আমি আবার বলছি। আমরা কোনো রাজার গুপ্তচরনই। আমরা ভাইকিং। জাহাজে চড়ে দেশে দেশে ঘুরে বেড়াই। সমস্ত পৃথিবীই আমাদের ঘরবাড়ি। হ্যারি বলল।
সর্দার থুতনির ছুঁচোলো দাড়িতে কয়েকবার হাত বুলোলো। তারপর বলল–যাক গে–তোমাদের বন্দি করা হল। কালকে দলপতি যা হুকুম দেবেন তাই পালিত হবে।
কী কথা হল বলো। ফ্রান্সিস বলল।
হ্যারি আস্তে আস্তে সর্দার যা বলল সেসব জানাল। ফ্রান্সিস বলল হ্যারি উপায় নেই। রাজা তৃতীয় পিটারের নাম আমরা এই প্রথম শুনলাম এসব বলেও রেহাই পাবো না। অগত্যা এখন বন্দিদশা মেনে নেওয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। সর্দার বলল– এবার চলো। একজন সৈন্য ফ্রান্সিসদের তলোয়ার নিয়ে চলল।
সর্দার ফ্রান্সিসদের আগে রাখল। পেছনে সৈন্যরা আসতে লাগল। চাঁদের উজ্জ্বল আলোতে দেখা গেল দুপাশে নিঝুম বাড়িঘরদোর। ফ্রান্সিসরা হেঁটে চলল। ফ্রান্সিসের শুধু এক চিন্তা–ওদের যে বন্দিশালায় রাখা হবে সেটা কেমন।
কিছুক্ষণ পরে সর্দার ওদের একটা খোলা মাঠমতো জায়গায় নিয়ে এলো। মাঠটার চারদিক কাটা তারে ঘেরা। প্রবেশদ্বারের সামনে আনা হল। প্রবেশদ্বারও কাটা তার পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে তৈরি। সবাই প্রবেশদ্বারের সামনে এসে দাঁড়াল। দু-তিনজন পাহারাদার খোলা তলোয়ার হাতে পাহারা দিচ্ছিল।
সর্দার পাহারাদারদের কী বলল। একজন পাহারাদার কোমরের ফেট্টি থেকে চাবির তোড়া বেরকরল। চাঁদের আলোয় তোড়ার ঠিক চাবিটা বের করল।কাঁটাতারের দরজাটা খুলল। ফ্রান্সিসদের ঠেলে ঠেলে ঢুকিয়ে দিল। হ্যারি জানে এ ধরনের ব্যবহার ফ্রান্সিস সহ্য করবে না। তাই গলা চড়িয়ে বলল–ফ্রান্সিস–সব মেনে নাও। মাথা গরম করো না। ফ্রান্সিস কোনো কথা বলল না রুখে দাঁড়াল না। ওরা বন্দি শিবিরে ঢুকল। দেখল–আগেও কিছু বন্দি মাটিতে শুয়ে বসে আছে।
ফ্রান্সিসরা কাঁটাতারের বেড়ার কাছে বসল। ফ্রান্সিস ধুলোটে মাটিতে শুয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে বলল–হ্যারি তুমি ঘুমিয়ে নাও। রাত জাগা তোমার সইবে না।
–কিন্তু তুমি? হ্যারি বলল।
–বাকি রাতটা জেগেই কাটাবো। ফ্রান্সিস বলল।
শাঙ্কো বলল–না ফ্রান্সিস–তুমি ঘুমোও আমি জেগে থাকবো। কপালে দুহাত রেখে ফ্রান্সিস চোখ বুজল। কিন্তু ঘুমিয়ে পড়ল না। নানা চিন্তা মাথায়।
ভোর হল। সকালের উজ্জ্বল রোদ ছড়ালা কাঁটাতারে ঘেরা বন্দি শিবিরে। উত্তর দিকের জঙ্গল থেকে বিচিত্র পাখির ডাক শোনা গেল। ফ্রান্সিস হ্যারিকে বলল-যাও তো ঐ বন্দিদের সঙ্গে কথা বলে এসো। এই দলপতি কেমন লোক। ওদের বন্দি করেছেন কেন-মাল্টা এখান থেকে কতদূর সব খবর নিয়ে এসো।
