ফ্রান্সিস ফ্রেজারের কাছে এলো। বলল–ফ্লেজার, দিক ঠিক করে জাহাজ দেশের দিকে চালাও। কথাটা শুনেই সব ভাইকিং বন্ধুরা চিৎকার করে উঠল–ও-হো-হো। এই ধ্বনি ওদের আনন্দের, প্রতিবাদের আবার সঙ্কল্পেরও ধ্বনি।
একদল উঠে গেল পাল খাটাবার কাঠের ওপরে। দড়িদড়া টেনে–পালগুলো ঠিক করে দিতেই পালগুলো ফুলে উঠল হাওয়ার তোড়ে। জাহাজ চলল দ্রুতগতিতে। দাঁড় বাইবার প্রয়োজন নেই। তবু দাঁড় বাইতে বেশ কয়েকজন ভাইকিং দাঁড়ঘরে নেমে এসে দাঁড়ে হাত লাগাল। জাহাজের গতি আরো বাড়ল। সমুদ্রের ঢেউ ভেঙে জাহাজ চলল দ্রুতগতিতে। মারিয়ার দিকে তাকিয়ে ফ্রান্সিস হেসে বলল–কি? খুশি তো?
ভীষণ খুশি। মারিয়া প্রায় লাফিয়ে বাচ্চা মেয়ের মতো বলে উঠল।
ফ্রান্সিসদের জাহাজ চলেছে। নির্মেঘ আকাশ। বাতাসও বেগবান। জাহাজ চলেছে দ্রুতগতিতে।
সেদিন ভোর ভোর সময়ে নজরদার পেড্রোর হাঁক শোনা গেল–ডাঙা-ডাঙা দেখা যাচ্ছে। কয়েকজন ভাইকিং জাহাজের ডেক-এ শুয়ে ছিল। একজন উঠে বসল। গলা চড়িয়ে বলল–পেড্রো ভালো করে দেখো ডাঙা বালির মাটির না পাথরের। পেড্রো চোখ কুঁচকে তাকাল। তখনই সূর্য যেন সমুদ্রের জলের ঢেউয়ের মধ্যে থেকে উঠল। রোদ ছড়াল। পেড্রো তাকিয়ে দেখতে দেখতে গলা চড়িয়ে বলল-পাথুরে ডাঙা। ঢালু হয়ে সমুদ্রের পার পর্যন্ত এসেছে। ডেক-এ বিস্কোও শুয়ে ছিল। ওর ঘুম ভেঙে গেল। বিস্কো উঠে দাঁড়াল। মাস্তুলের ওপরে বসে থাকা পেড্রোকে চেঁচিয়ে বলল–পেড্রো ভালো করে দেখো। আমি ফ্রান্সিসকে ডাকতে যাচ্ছি। পেড্রোও গলা চড়িয়ে বলল কিছুক্ষণের মধ্যে তোমরাও দেখতে পাবে।
বিস্কো চলল ফ্রান্সিসকে ডাকতে। একটু পরেই ফ্রান্সিস আর হ্যারি ডেক-এ উঠে, এলো। পেছনে মারিয়া।ফ্রান্সিস রেলিঙে ভর দিয়ে ডাঙার দিকে তাকিয়ে রইল। সমুদ্রের না বুকে ঘন কুয়াশা। স্পষ্ট কিছুই দেখা যাচ্ছে না। ফ্রান্সিস অপেক্ষা করতে লাগল কখন কুয়াশা কেটে যায়। ওদের ভাগ্য ভালো। একটু পরেই হঠাৎ সব কুয়াশা কেটে গেল। সকালের রোদে স্পষ্ট দেখা গেল ডাঙা। পাথুরে ডাঙা। ঢালু হয়ে সমুদ্রের জল পর্যন্ত নেমে এসেছে। হ্যারি ফ্রান্সিসকে বলল কী করবে এখন?
-ফ্লেজারের কাছে চলো। ফ্রান্সিস বলল। তিনজনে এবার চলল জাহাজ চালক ফ্লেজারের কাছে। ওরা ফ্লেজারের কাছে এলো। ফ্রান্সিস বলল–ফ্লেজার–ডাঙা দেখা যাচ্ছে। জাহাজকিতীরে ভেড়ানো যাবে?না নৌকো নিয়ে যেতে হবে? ফ্লেজার জাহাজের হুইল ঘোরাতে ঘোরাতে বলল–যতদূর মনে হচ্ছে সমুদ্রের তির পর্যন্ত জাহাজ নিয়ে যাওয়া যাবে।
–তাই নিয়ে চলো। ফ্রান্সিস বলল। মারিয়া একটু ভীত স্বরে বলল—এখানে নামবে নাকি?
–উপায় নেই। কোথায় এলাম এটা না জানতে পারলে কতদূরে কোনোদিকে আমাদের দেশ–সেটা বুঝবো কী করে। ফ্রান্সিস বলল। হ্যারি বলল–রাজকুমারী আপনার কী মনে হয়? কোথায় এলাম আমরা?
–সঠিক তো বলতে পারবো না। তবে এটুকু বুঝতে পারছি আমরা এখনও ভূমধ্যসাগর থেকে বেরোতে পারিনি। আমরা সাইপ্রাস দ্বীপ থেকে দক্ষিণ মুখে আসছি। যদি আমার হিসেব ঠিক থাকে তবে এখন যে ডাঙা দেখছি সেটা মাল্টা দ্বীপপুঞ্জের কোনো দ্বীপ।
রাজকুমারীর অনুমান সঠিক। হ্যারি বলল।
–সেটা জেনে খোঁজ না করলে জানা যাবে না। ফ্রান্সিস বলল। ফ্লেজারকে বলল ফ্লেজার, জাহাজ যদি তির পর্যন্ত যায় তবে তীরের কাছে যাও।
–হ্যাঁ–জাহাজ তির পর্যন্ত যাবে। ফ্লেজার বলল। তারপর তীরের দিকে জাহাজ চালাল।
দূর থেকে দেখা গেল–একটা ছোটো জাহাজ তীরে দাঁড়ানো আছে। বোঝাই যাচ্ছে এটা জাহাজঘাটা। এবার জাহাজঘাটার পরেই লোকজন যাওয়া আসা করছে এটা দেখা গেল। ফ্রান্সিস এবার সাবধান হল। দিনের বেলা জাহাজ ভেড়ানো ঠিক হবেনা। ফ্রান্সিস বলল-ফ্লেজার-জাহাজঘাটায় এখন এই দিনের বেলা জাহাজ ভেড়ানো ঠিক হবে না। এখানকার খোঁজখবর আমরা রাতে আনতে যাবো। একটু থেমে ফ্রান্সিস বলল ডানদিকের ঐদিকের তীরের কাছেই ঝোঁপজঙ্গল শুরু হয়েছে। আমরা সন্ধেবেলা ঐদিকের তীরেই জাহাজ ভেড়াবো। এখন তো এখানেই নোঙর ফেলো। আমরা এখন আর এগোবো না।
–বেশ। ফ্লেজার বলল। তারপর বিস্কো আর কয়েকজনকে বলল–নোঙর ফেলো। বিস্কোরা নোঙর ফেলতে গেল। ফ্লেজার আর কয়েকজন বন্ধুদের বলল–পাল নামাও। আমরা আর এগোব না। বন্ধুরা চলল পাল নামাতে। নোঙর ফেলা হল। পাল গুটিয়ে ফেলা হল। জাহাজ থামল। ঢেউয়ের ধাক্কায় জাহাজটা দোল খেতে লাগল।
এখন কোনো কাজ নেই। ভাইকিংরা এখানে-ওখানে জড়ো হয়ে গল্পগুজব করতে লাগল।
বিকেলে পশ্চিম আকাশে রঙিন মেঘ দেখা গেল। গভীর কমলা রঙের সূর্য আস্তে আস্তে সমুদ্রের ঢেউয়ের মধ্যে যেন ডুবে গেল। কিছুক্ষণ পরেই পশ্চিম আকাশের কমলা রং মিলিয়ে গেল। অন্ধকার নামল।
রাতের খাওয়াদাওয়া সেরে ফ্রান্সিস হ্যারি আর শাঙ্কোকে বলল–রাত গম্ভীর হলে আমরা ডাঙায় নামবো। তৈরি হয়ে এসো। মারিয়া পাশেই দাঁড়িয়েছিল। ও বলে উঠল আমিও যাবো। ফ্রান্সিস মাথা নেড়ে বলল–না। তোমাকে নিয়ে যাবো না।
–আপনাকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না। বিদেশ বিভুই। আমরা এখানকার কিছুই জানি না। যদি বিপদে পড়ি আপনি থাকলে আমাদের বিপদ বেড়ে যাবে কমবে না। হ্যারি বলল।
-ঠিক আছে ঠিক আছে। মারিয়া মাথা ঝাঁকিয়ে বলল। তারপর চলে গেল।
