–ঢাকনাটা দয়া করে খুলুন। ফ্রান্সিস বলল। রাজা দেরাজের ঢাকনাটা আস্তে আস্তে খুললেন। ভেতরে দেখা গেল একটা মরোক্কো চামড়ায় বাঁধানো পাণ্ডুলিপি। রাজা পাণ্ডুলিপিটা আস্তে আস্তে বের করে আনলেন। সামান্য ছাইরঙা পার্চমেন্ট কাগজের পাণ্ডুলিপির পাতা ওল্টালেন। কিছুটা পড়লেন। তারপর মন্ত্রীমশাইর দিকে তাকিয়ে বললেন–হ্যাঁ–এটাই প্রথম পাণ্ডুলিপি। তারপর ফ্রান্সিসের দিকে সপ্রশংস দৃষ্টিতে তাকালেন। বললেন–তুমি নশার সমাধান বের করলে কী করে? ফ্রান্সিস রাজার হাতে নটা দিয়ে বলল–মাননীয় রাজা-মহামতি রামন লাল মৃত্যুকালীন দুঃসহ কষ্টের মধ্যেও যা আঁকতে চেয়েছিলেন কিন্তু পারেন নি আমি সেটাই সম্পূর্ণ করে এঁকে এবং লিখে দিয়েছি। রাজা নকশাটা দেখলেন–
আনন্দিত রাজা বললেন, “আমি নিজে এবং মাজোরকার অধিবাসীদের পক্ষ থেকে তোমাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।” রাজা পাণ্ডুলিপি নিয়ে ঘরের বাইরে এলেন। প্রাসাদের দিকে চললেন। পেছনে মন্ত্রী।
ফ্রান্সিসরা নিজেদের ঘরে এলো। তখনই সালভা ঘরে ঢুকল। বলল, “ফ্রান্সিস, আপনার বন্ধুরা জাহাজ চালিয়ে পালমা বন্দরে এসেছে। ওরা রাজপ্রাসাদের বাইরে অপেক্ষা করছে।”
ফ্রান্সিস বলে উঠল, “আমাদের কাজ শেষ।মারিয়া, শাঙ্কো, চলো আমাদের জাহাজে।”
ওরা রাজপ্রাসাদের বাইরে আসতে হ্যারি, বিস্কো, পেড্রো ছুটে এলো। হ্যারি ফ্রান্সিসকে জড়িয়ে ধরে প্রায় কাঁদো কাঁদো স্বরে বলল, “তোমাদের সব কথা আমরা শুনেছি।” বন্ধুরা আনন্দের ধ্বনি তুলল, “ও হো-হো।” পালমার লোকেরা ওদের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে রইল। ভাইকিংরা এত আনন্দের কারণ বুঝল না।
ফ্রান্সিসরা দলবেঁধে এগিয়ে চলল জাহাজঘাটার দিকে। নকশাটা ভালো করে দেখে রাজা ফ্রান্সিসের দিকে তাকালেন। বললেন–সত্যি তুমি যথেষ্ট বুদ্ধি ও চিন্তাশক্তির পরিচয় দিয়েছে। তারপর রাজা মন্ত্রীমশাইকে বললেন মহান রামন লালের পরিভ্রমণের দুটি পাণ্ডুলিপিই এই পবিত্রস্থানে রাখা হবে। ফ্রান্সিস মাথা নুইয়ে সম্মান জানিয়ে বলল
–মহামান্য রাজা–যদি অভয় দেন তাহলে আমি বিনীতভাবে একটা অনুরোধ করছি।
-বলো। রাজা বললেন। ফ্রান্সিস বলল সালভা দ্বিতীয় পাণ্ডুলিপিটা পড়েছে। প্রথম পাণ্ডুলিপির বিষয়ে সে জানে। সে বলেছে মহামতি রামন দেশে দেশে তার বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথা এই দুটি পাণ্ডুলিপিতে লিখেছেন। শুধু অ্যালকেমির তথ্য ও সূত্র আলাদা করে এই পবিত্রস্থানে রাখুন। কিন্তু তার পরিভ্রমণের মূল্যবান কাহিনী থেকে এখানকার শিক্ষাগুরু ও ছাত্রদের বঞ্চিত করবেন না। মহামতি রামন লালের রচনা তাদের জ্ঞানভাণ্ডার সমৃদ্ধ করুক একটা কি মহামান্য রাজা চান না? রাজা ফ্রান্সিসের কথা মন দিয়ে শুনলেন। বললেন–তোমার কথাটা ভেবে দেখবো। ফ্রান্সিস মাথা নুইয়ে সম্মান জানিয়ে বলল মহামান্য রাজা–আমার কর্তব্য শেষ। আমাকে আমাদের জাহাজে ফিরে যেতে হবে। আপনি অনুমতি দিন। রাজা বললেন—
আমি নিজে এবং মাজোরকার অধিবাসীদের পক্ষ থেকে তোমাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। ফ্রান্সিস মাথা নুইয়ে সম্মান জানিয়ে ঘরের বাইরে এলো। সালভা ছুটে এল। বলল–চলুন–আপনাকে জাহাজঘাটায় নিয়ে যাই। ফ্রান্সিস হেসে বলল–ধন্যবাদ সালভা–আমি একাই যেতে পারবো। তুমি রাজা ও মন্ত্রীমশাইয়ের কাছে থাকো।
বন্দরে যখন ফ্রান্সিস পৌঁছল তখন বেশ বেলা হয়ে গেছে। বেশ কটা জাহাজ রয়েছে বন্দরে। নিজেদের বহু পরিচিত অনেক সুখ-দুঃখের সঙ্গী সেই জাহাজ খুঁজে নিতে দেরি হল না।
ফ্রান্সিস যখন পাতা পাটাতন দিয়ে জাহাজে উঠছে রেলিঙে দাঁড়ানো বন্ধুরা চেঁচিয়ে বলল–ফ্রান্সিস এসেছে। মুহূর্তে বন্ধুরা অনেকেট ডেক-এ উঠে এলো। ফ্রান্সিস জাহাজের ডেক-এ পা ফেলা মাত্র ওরা ছুটে এলো। সবাই ফ্রান্সিসকে জড়িয়ে ধরতে চায়। আনন্দের ধ্বনি তুলল ওরা—ও হো হো। মারিয়া আর হ্যারি ছুটে এলো। মারিয়া বলল পাণ্ডুলিপি উদ্ধার করতে পেরেছো? ফ্রান্সিস হেসে বলল–হ্যাঁ। মারিয়া বলে উঠল– আমাকে তো থাকতেই দিলে না। ফ্রান্সিস মারিয়া–তোমার অনেক ধকল গেছে। পরিচিত পরিবেশে তোমার বিশ্রামের দরকার ছিল। তাই তোমাকে জহাজে পাঠিয়েছিলাম। মারিয়া আর কিছু বলল না। ফ্রান্সিস হেসে দু’হাত ছড়িয়ে বলল–মারিয়া–এবারও আমার হাত শূন্য। আমি কিছুই আনতে পারিনি। মারিয়া মাথা নেড়ে বলল– তাতে আমার বিন্দুমাত্র দুঃখ নেই। শাঙ্কো বলল–সবাই জানতে চাইছে তুমি কী করে পাণ্ডুলিপি উদ্ধার করলে।
ফ্রান্সিস বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল–ভাইসব–সব তোমাদের বলবো কিন্তু। তার আগে আমাকে খেতে দাও। বড্ড খিদে পেয়েছে।
বন্ধুরা ফ্রান্সিসকে প্রায় পাঁজাকোলা করে নিয়ে চলল।
চার্লসের স্বর্ণসম্পদ
কেরিনিয়া বন্দর ছেড়ে ফ্রান্সিসদের জাহাজ এলো মাঝ সমুদ্রে। এবার দেশে ফিরে যাওয়ার কথা তুলল ফ্রান্সিসের ভাইকিং বন্ধুরা। মারিয়া কিছু না বললেও সেও যে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দেশে ফিরে যেতে চায় এটা ওর মুখ দেখেই ফ্রান্সিস বুঝল।
অগত্যা ফ্রান্সিস সেদিন বিকেলে জাহাজের ভেক-এ উঠে এলো। পেছনে মারিয়া, হ্যারি, বিস্কো। ফ্রান্সিস মুখে কিছু বলে নি। বন্ধুদের দেশে ফেরার জন্য বার বার তাগাদা শুনে গেছে।এখন ফ্রান্সিস জাহাজ চালক ফ্লেজারকেকী নির্দেশ দেয় সবাই সেটা শোনবার জন্যে ভেক-এ এসে জড়ো হল।
