সে কি ফ্রান্সিস বলল–সেই ভোর থেকে দাঁড়িয়ে আছো! মাথা নেড়ে হ্যারি হাসল। বলল–সালভাকে প্রধান ফটকের দিকে আসতে দেখে আমরা চাঁচামেচি শুরু করে দিলাম। সালভা ছুটে এলো। তারপর এখন–হে বন্ধু তোমার সম্মুখে। হ্যারির বলার ভঙ্গী শুনে ফ্রান্সিস মারিয়া হেসে উঠল। ফ্রান্সিস বলল–শোনো হ্যারি–এখন আমি জাহাজে যাবো না। মারিয়া আর শাঙ্কো যাক। মারিয়াকে দেখিয়ে বলল–মারিয়ার পোশাকের চেহারা দেখেছো?মারিয়া বলে উঠল–পোশাক পাল্টাতে নয়। আমি জাহাজে যাবো আমার বন্ধুদের দুশ্চিন্তা দূর করতে।
কিছুক্ষণ গল্পগুজব করে মারিয়া শাঙ্কো হ্যারিদের সঙ্গে জাহাজঘাটার দিকে চলে গেল।
ফ্রান্সিস রামন লালের লেখাটা পড়তে পড়তে হঠাৎ ডাকল–সালভা। সালভাদরজার কাছে সেই ন্যাড়া ছেলেটাকে বলছিল–কীরে তুই এখানে কবে থেকে কাজ করছিস্? ছেলেটা কী বলতে যাচ্ছিল ফ্রান্সিসের ডাক শুনে থেমে গেল। সালভা ফ্রান্সিসের দিকে তাকাল–কী হল? ফ্রান্সিস দ্রুত পায়ে দরজার কাছে এলো। বলল-রামন লালের উপাসনা ঘরে চলো।
–কেন? সালভা আশ্চর্য হয়ে বলল। ফ্রান্সিস বলল–
–রামন লাল তার লেথায় বলেছেন–”পবিত্রস্থান’-এ তিনি পাণ্ডুলিপি গোপনে রেখে গেছেন। উপাসনা ঘরের মতো পবিত্রস্থান আর কী আছে। চলো। যেতে যেতে। বলল–সালভানক্শার রহস্যের কুয়াশা কেটে যাচ্ছে।
দু’জনে রামন লালের উপাসনা ঘরে এলো। ফ্রান্সিস ঘরটার চারদিকেতাকাতে লাগল। এখন দিনের বেলা। ওপরের চ্যাপ্টা লোহার গরাদ বসানো দুটো জানলা দিয়ে ঘরটায় আলো আসছে। জানলাটা দেখতে দেখতে ফ্রান্সিস বলল–সালভা এখানকার শিক্ষাগুরুদের ঘরগুলো সব একদিকে আর সব ঘরেই এরকম জানলা আছে–তাইনা?
–মনে তো হয়। লক্ষ্য করি নি তেমন। সালভা বলল।
এখন যাও–সব ঘরে ক’টা করে জানলা আছে আর ক’টা করে গরাদ আছে। দেখে এসো। ফ্রান্সিস বলল।
–আপনার মাথায় বোধহয় ভূত চেপেছে। বিড় বিড় করে কথাটা বলতে বলতে সালভা চলে গেল।
কিছুক্ষণ কাটাল। ফ্রান্সিস তাকিয়ে আছে যীশুর মূর্তি আর বেদীর দিকে।
সালভা ফিরে এলো। বলল–তিনটে করে জানলা আর ছ’টা করে গরাদ। তাতে হলটা কী? ফ্রান্সিস বলল।
–এ ঘরে জানলা দুটো আর গরাদ পাঁচটা করে দেখো। সালভা জানলা দুটো দেখল। গরাদগুলো গুনল। পাঁচটা।বলল–হ্যাঁ। ফ্রান্সিস হাতের নকশাটা ওকে দেখিয়ে বলল– এই দেখো এই দুটো জানলা আঁকা। সালভা দেখল। বলল–কিন্তু গরাদ তো পাঁচটা আঁকা নেই।
–যেটা আঁকা আছে সেটা রোমান অক্ষরে পাঁচ কিনা। দেখো ভালো করে। ফ্রান্সিস বলল! সালভা দেখে বলল হ্যাঁ পাঁচই তো! ফ্রান্সিস বলল–
–ভুলে যেও না–রামন লাল যখন নক্শাটা আঁকেন তখন তার মৃত্যুকাল উপস্থিত। অসাড় হয়ে আসতে থাকা হাতে পাঁচটা দশটা টান দেওয়ার ক্ষমতা তার ছিল না। তাই রোমান ‘দ্দ” এঁকেছেন। এই ঘরের জানলার গরাদও পাঁচটা। মিলে গেল কিনা। সালভা বলেউঠল–সত্যিই তো। ফ্রান্সিস বলল–এবার শেষ সূত্র। দেখো নীচে একটা লম্বাটে চৌকোণা দাগ আছে কিনা।
-হা আছে তো। সালভা বলল। ফ্রান্সিস বলল–
যীশুর মূর্তির নীচে বেদীটা কাপড়ে ঢাকা। তাই বুঝতে পারছি না ওটা পাথরের না কাঠের। তুমি কাপড়টা একটু সরিয়ে দেখো–ওটা কীসের? সালভা বেদীর সামনে গেল। বুকে ক্রশ এঁকে মাথা নুইয়ে যীশুকে শ্রদ্ধা জানিয়ে আস্তে কাপড়টা কিছু সরিয়ে দেখল–লম্বাটে কাঠের দেরজামতো। ফ্রান্সিস দেখল সেটা। আরও দেখল সামনেটায় কাঠের ঢাকনা মতো। সালভা কাপড়টা ছেড়ে দিল। দেরাজ ঢাকা পড়ে গেল। পেছনে ফিরে সালভা দেখল–ফ্রান্সিস মাথা নিচু করে চোখ বুজে দাঁড়িয়ে আছে। একটুক্ষণ। চোখ মেলে ফ্রান্সিস বলে উঠল–মহামতি রামন লাল–আপনার আশীর্বাদে আমি আপনার পাণ্ডুলিপি উদ্ধার করতে পারলাম। সালভা তো অবাক। বলল–কিন্তু পাণ্ডুলিপি কোথায়? ফ্রান্সিস দরজার দিকে যেতে যেতে বলল–সব বলবো মহামান্য রাজাকে।
তুমি এক্ষুণি রাজাকে গিয়ে বলে তিনি যেন এখানে একবার দয়া করে আসেন। কারণ পাণ্ডুলিপি পাওয়ার অধিকারী একমাত্র তিনিই।
নিজের ঘরে ফিরে এলো ওরা। ফ্রান্সিস কলমে কালি নিল। তারপর নকশাটায় কী লিখতে লাগল। লেখা শেষ হলে ফ্রান্সিস সেই উপাসনা ঘরে গিয়ে রাজার জন্যে অপেক্ষা করতে লাগল।
অল্পক্ষণের মধ্যেই রাজা এলেন। সঙ্গে মন্ত্রীমশাই। পেছনে সালভা আর ম্যাস্ত্রো। ফ্রান্সিস মাথা নুইয়ে দু’জনকেই সম্মান জানাল। রাজা বললেন–পাণ্ডুলিপি কোথায়? ফ্রান্সিস রাজার হাতে নকশাটা দিল। উল্টোপিঠটা দেখিয়ে বলল–মহামতি রামনের শেষ সংকল্পটা আপনি আর একবার পড়ুন–এই অনুরোধ। রাজা একবার ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে নিয়ে অনুবাদটা পড়লেন। মন্ত্রীমশাইকে দিলেন। মন্ত্রীমশাইও পড়লেন। ফ্রান্সিস বলল–মহামতি রামনের অ্যালকেমিচর্চার আগ্রহ ছিল। কিন্তু তার শেষ সংকল্প তো জানেন। এরপরও কি প্রথম পাণ্ডুলিপি উদ্ধারের প্রয়োজনীয়তা আছে মাননীয় রাজা? রাজা একটু চুপ করে থেকে বললেন–দেখোনিকৃষ্ট ধাতুকে সোনায় রূপান্তরিত করার আগ্রহ নিয়ে আমি প্রথম পাণ্ডুলিপি উদ্ধারের চেষ্টা করিনি। আমরা ধরে নিয়েছিলাম তিনি দেহরক্ষা করেছেন। তার পবিত্র স্মৃতিচিহ্ন হিসেবেই প্রথম পাণ্ডুলিপি উদ্ধারের চেষ্টা করেছি।
–তাহলে–আপনিই ঐ বেদীর ঢাকনার কাপড়টি দয়া করে সরান। ফ্রান্সিস বলল । রাজা একবার ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে নিয়ে যীশুর মূর্তির বেদীর সামনে এলেন। মাথা নিচু করে বুকে ক্রশ আঁকলেন। তারপর আস্তে আস্তে বেদী তক কাপড়টা সরালেন। সেই ওক কাঠের লম্বাটে দেরাজমতো।
