প্রহরীর সঙ্গে ফ্রান্সিসরা রাজার সাক্ষাতের জন্যে রাজপ্রাসাদের দিকে চলল। প্রহরী ফ্রান্সিসদের রাজার মন্ত্রণাকক্ষে নিয়ে এসে বসাল।
কিছু পরে রাজা এলেন। ফ্রান্সিসরা উঠে দাঁড়িয়ে সম্মান জানাল। রাজা বললেন– তোমরা পাণ্ডুলিপি খোঁজার ব্যাপারে কতদূর এগিয়েছো?
মহামান্য রাজা–ফ্রান্সিস বলল–আমরা অনেকটা এগিয়েছি।
–খুশি হলাম। রাজা বললেন। তারপর মারিয়াকে বললেন–শুনলাম তুমি নাকি রাজকুমারী?
ফ্রান্সিস বলল হা মহামান্য রাজা-উনি আমাদের দেশের রাজকুমারী।
-কী আশ্চর্য তোমার পোশাক দেখে আমি ভেবেছিলাম তুমি এই দেশের গ্রামের লোক। রাজা বললেন। মারিয়া বলল–আমি এই পোশাক স্মারক হিসেবে আমাদের দেশে নিয়ে যাবো। রাজা একটুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন–সত্যিই আমি প্রীত হলাম। এবার ফ্রান্সিস বলল
মাননীয় রাজা–একটা অনুরোধ ছিল।
বলো। রাজা বললেন।
–মহামতি রামন লালের দ্বিতীয় পাণ্ডুলিপিটা কিছুক্ষণের জন্যে আমি পড়তে চাই– বিশেষ করে শেষাংষটুকু।
–বেশ তো। সালভা নিয়ে যাবে তোমাদের পড়ে বুঝিয়ে দেবে। রাজা উঠলেন। ভেতরে গেলেন। সালভাকে রেখে ফ্রান্সিসরা চলে এলো।
কিছুক্ষণ পরে সালভা ফ্রান্সিসদের ঘরে এলো। হাতে রামন লালের দ্বিতীয় পাণ্ডুলিপিটা। মারিয়া হাত বাড়িয়ে নিল ওটা। গ্রীক ভাষায় লেখা। ওর বোঝার কথা নয়। ফ্রান্সিস বলল–সালভা-কালিকলমের ব্যবস্থা করতে পারো? সালভা হাসল। বলল–এটা লেখাপড়ারই পীঠস্থান। আপনি বোধহয় ভুলে গেছেন। ফ্রান্সিস হাসল। মাথা নেড়ে বলল–সত্যিই ভুলে গিয়েছিলাম। সালভা চলে গেল। মারিয়া পাণ্ডুলিপিটা ফ্রান্সিসদের হাতে দিল। একটু পরেই সালভা রুপোর দোয়াতদানি আর পালকের কলম নিয়ে এলো। ফ্রান্সিসদের বিছানায় বসল। ফ্রান্সিস বিছানার তলা থেকে নকশাটা বের করল।–নকশাটা মারিয়াকে দিয়ে বলল–সালভা পাণ্ডুলিপির শেষাংশটুকু স্পেনীয় ভাষায় অনুবাদ করে বলবে তুনি নকশার কাগজের পেছনে সেটা লিখবে। মারিয়া বসল। নকশার উল্টোপিঠে শেষ পাতাটা বের করল। অনুবাদ করে বলতে লাগল। মারিয়া লিখতে লাগল। পাণ্ডুলিপির পার্চমেন্ট কাগজগুলো খোলা। তখনও বাঁধানো হয় নি।
লেখা শেষ হলে ফ্রান্সিস পড়তে লাগল–গ্রীস, মিশর, মেসোপটেমিয়া আরো নানা জায়গায় ঘুরে আমি নানাভাবে যেসব জায়গার অ্যালকোমিচর্চার তথ্য সংগ্রহ করেছিলাম এবং যেসব তথ্য সূত্রাকারে লিখে রেখেছিলম সেসব আমার পরিভ্রমণকালে লেখা প্রথম পাণ্ডুলিপিতে।
এবার পরিভ্রমণে বহির্গত হবার পূর্বে সেই পাণ্ডুলিপি এক পবিত্রস্থানে গোপনে রেখে এসেছিলাম।
এবারের পরিভ্রমণকালে আমি অনেক কষ্টে কখনও জীবন বিপন্ন করে আরো তথ্য সংগ্রহ করেছি। এখন মাজোরকা ফিরে যাবো। সব তথ্য সূত্র একত্র করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবো। যদি সত্যিই আমি নিকৃষ্ট ধাতু সীসে দস্তা আর পারদ সোনায় রূপান্তরিত করতে পারি তাহলে সমস্ত সূত্র তথ্য ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাগজপত্র অগ্নিতে নিক্ষেপ করবো।” এই পর্যন্ত পড়ে ফ্রান্সিস আশ্চর্য হয়ে গেল। ও একবার সালভার মুখের দিকে তাকাল। মারিয়ার দিকে তাকাল। তারপর আবার পড়তে লাগল–”পৃথিবীর কাছে প্রমাণ করবো যে মানুষও পারে বিপুল স্বর্ণসম্পদ সৃষ্টির অধিকার লাভ করেও তা তুচ্ছজ্ঞানে পরিত্যাগ করতে।”
পাণ্ডুলিপি এখানেই শেষ। ফ্রান্সিস কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইলি। তারপর আস্তে আস্তে বলল–সালভারামন লাল শুধু মনস্বীই ছিলেন না–মহামতিও ছিলেন। এককথায় খাঁটি মানুষ ছিলেন। তারপর মাথা নিচু করে বলল–আমি তাকে নতমস্তকে আমার অন্তরের গভীর শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। সবাই চুপ করে রইল।
একটু পরে সালভা উঠে দাঁড়াল। বলল–সৈন্যদের ছাউনিতে আল আমিরির বিচার চলছে। আমাকে যেতে হবে। আমাদের আগুনে পোেড়া বস্তির পুননির্মাণের খরচ আল আমিরির কাছ থেকে আদায় করবো। সালভা চলে গেল।
ফ্রান্সিস বিছানায় আধশোয়া হ’ল। রামন লালের সংকল্পটা আবার পড়তে লাগল।
হঠাৎ দরজার কাছে কাদের পায়ের শব্দ শোনা গেল। শোনা গেল–ফ্রান্সিস ফ্রান্সিস ডাক। ফ্রান্সিস উঠে বসল। মারিয়া উঠে দাঁড়ল। ঘরে ঢুকল হ্যারি। পেছনে বিস্কো। হ্যারি আর ফ্রান্সিসকে উঠতে দিল না। বসা অবস্থাতেই ফ্রান্সিসকে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরল। ফ্রান্সিসের গায়ে হাত বুলোতে লাগল। ওর দু’চোখ জলে ভরে উঠল। ফ্রান্সিস বুঝল সেটা। ধমক লাগাল–এই হ্যারি–কী ছেলেমানুষি হচ্ছে। বিস্কো তখন মারিয়াকে বলছে–দিন কয়েক আমরা অপেক্ষা করলাম। যেদিন রাতে রাজার সৈন্যবাহিনী পালমা নোভার দুর্গ দখল করল, আল আমিরিকে বন্দি করল সেদিনই আপনাদের জন্যে ভীষণ চিন্তা হল। পরদিনই এলাম। আগুনে পোড়া জেলেবস্তিতে তখন কয়েকটা পরিবার ফিরে এসেছে। সালভার কথা জিজ্ঞেস করতে ওরা সালভার বাবার কাছে আমাদের নিয়ে গেল। তার কাছেই আপনাদের সব সংবাদ পেলাম। বিস্কো থামতেই হ্যারি বলে উঠল–ফ্রান্সিস তোমরা মরণজলা পার হয়েছিলে? মারিয়া বলে উঠল–আমি তো মরেই যাচ্ছিলাম। ফ্রান্সিস মুখে শব্দ করল। বলল–তারপর তোমরা জাহাজ চালিয়ে পালমা বন্দরে এলে। হ্যারি বলল–হ্যাঁ। আজ খুব ভোরে এসেছি। জাহাজ থেকে নেমে সোজা ছুটে এলাম এখানে। আমি রামন লাল এখানে থাকতেন। তোমরা এখানেই আসবে। কিন্তু দ্বাররক্ষীরা আটকাল। ভিনদেশি আমাদের রাজপ্রাসাদে ঢুকতে দেবে না। অগত্যা প্রধান ফটকের বাইরে আমরা ঠায় দাঁড়িয়ে রইলাম যদি তোমরা কেউ বেরিয়ে আসো বা তোমাদের কাউকে যদি দেখতে পাই।
