ফেরার সময় সালভা বলল–দর্শনশাস্ত্র নিয়ে ঐ পাণ্ডুলিপিগুলোতে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা আছে।
ওদিকে প্রাসাদসংলগ্ন রাজপরিবারের সমাধিভূমিতে রামন লালের মৃতদেহ সমাধিস্থ করা হচ্ছে। বহুলোক জড়ো হয়েছে সেখানে। মারিয়া বলল–ফ্রান্সিস–এরকম একটা অনুষ্ঠান তো বড়ো একা দেখা যায় না। আমি যাবো দেখতে। ফ্রান্সিস বলল–তোমার সঙ্গে শাঙ্কোও থাক।
–তুমিও চলো না। মারিয়া বলল। ফ্রান্সিস মাথা নাড়ল। তারপর বিছানায় শুয়ে পড়ল।
রামন লালের পবিত্র দেহ সমাধিস্থ হওয়ার পরেও লোকের আসার বিরাম নেই। বিকেল নাগাদ সমাধিভূমি জনশূন্য হয়ে গেল।
সন্ধেবেলা ফ্রান্সিস সালভাকে বলল তুমি বলেছিলে এই প্রাসাদের চৌহদ্দির মধ্যে একটা ছোটো গীর্জা আছে। —-শিক্ষাগুরুদের বাড়িগুলোর ওপাশে। এই গীর্জাটা ছাত্র আর শিক্ষাগুরুদের জন্যে। সালভা বলল।
–রামন লালও কি ঐ গীর্জায় উপাসনা করতে যেতেন? ফ্রান্সিস বলল।
–না। তার থাকার ঘরের পাশে আছে একটা ছোটো ঘর। সেখানে যীশুর মূর্তি আছে। তিনি সেই ঘরেই নিয়মিত উপাসনা করতেন। সালভার কথাটা শেষ হতেই ফ্রান্সিস সাগ্রহে বলল–এরকম একটা ঘর আছে নাকি?কিন্তু তুমি তো আমায় বলোনি।
–রামন লাল শুধু উপাসনার সময় আধঘণ্টার জন্যে ঐ ঘরটায় যেতেন। সালভা বলল। ফ্রান্সিস বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। বলল চলো তো আর একবার রামন লালের ঘরগুলো দেখবো।
–কিন্তু অন্ধকারে এখন–সালভা বলল।
–মোমবাতির আলোয় দেখবো। ফ্রান্সিস বলল। মারিয়া বলে উঠল–কোথায় ভাবলাম পালমানগরটা আজকে সন্ধেবেলা একটু ঘুরেটুরে দেখবো–ফ্রান্সিস হাসল। বলল–
তুমি আর শাঙ্কো যাও–ঘুরে এসো তো। শাঙ্কো বলল–তুমিও চলো না।
–না শাঙ্কো–নকশার রহস্যটাই এখন আমার চিন্তায়–আর কিছু ভাবতে পারছি না। ফ্রান্সিস বলল। মারিয়া কিন্তু নগরে বেড়াতে গেল না। ফ্রান্সিস আর সালভার পিছু পিছু চলল। শাঙ্কোও চলল সঙ্গে।
তালার চাবিটা সালভাই নিজের কাছে ম্যাস্ত্রোর কাছ থেকে চেয়ে রেখেছিল।
রামন লালের ঘরের কাছে সবাই। সালভাদুটো মোমদানিতে দুটো বেশ মোটা লালচে রঙের মোম এনেছিল। মোম জ্বালাল। একটা মোমদানি নিজে নিল। আর একটা ফ্রান্সিসের হাতে দিল।
রামন লালের থাকার ঘরটা মোমবাতির আলোয় ফ্রান্সিস আবার খুঁটিয়ে দেখল। সেই ওপরের দিকে ফোকর মতো জানলা। চ্যাপ্টা লোহার গরাদ বানানো। নকশার রহস্যভেদে কাজে লাগবে এমন কিছুই পেল না। বলল–সালভা উপাসনার ঘরটায় চলো। সালভা আলো নিয়ে ঘরের বাঁদিকের কোণায় এলো। দেখা গেল একটা ছোটো সাধারণ কাঠের দরজা। সালভা কয়েকটা ধাক্কা দিতেই দরজাটা খুলে গেল। মাথা নিচু কী করে সবাইকে ঘরটায় ঢুকতে হল।
মোমবাতির আলোয় ফ্রান্সিসরা দেখল অন্য ঘরগুলোর মতো এই ঘরেও উঁচুতে দেয়ালের দুটো চ্যাপ্টা লোহার গরাদ বসানো চৌকোণো জানলামতো। তার নীচে দেয়ালে গায়ে যীশুর কাঠের একটা মূর্তি। একটা হালকা নীল সার্টিন কাপড়ে ঢাকা চৌকোণো লম্বাটে বেদীর ওপর মূর্তিটা রাখা। মূর্তির নীচে মেঝেয় একটা পশমের আসন এখনও পাতা রয়েছে। আলো নিয়ে ফ্রান্সিস ছোট ঘরটা ঘুরে ঘুরে দেখল। তারপর বলল সালভা–এই উপাসনার ঘরে কি তুমি আসতে?
–হ্যাঁ হ্যাঁ–কত এসেছি। সকালবেলা রামন লাল উপাসনা করতেন ঐ আসনে বসে। আমিও মাঝে মাঝে আসতাম। দেখতাম রামন লাল চোখ বুজে মাথা নিচু করে আসনে বসে আছেন। আমিও চুপ করে তার পেছনে বসে প্রার্থনা করতাম। উপনাস সেরে আমাকে দেখে খুশি হতেন। একটু থেমে সালভা বলল–উনি আমাকে পুত্রের মতো স্নেহ করতেন। সালভার দু’চোখ জলে ভরে উঠল। ও হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখ মুছল। মারিয়া বলল-যীশুর মূর্তিটা কী সুন্দর। সালভা বলল-রামন লাল যখন প্রথম পরিভ্রমণে বেরিয়েছিলেন তখনই মূর্তিটা এনেছিলেন। জুডিয়ার এক গ্রাম্য মিস্ত্রির হাতে তৈরি।
ফ্রান্সিস কয়েকবার সমস্ত ঘরটা দেখল। তারপর বলল–চলো সব। সবাই ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।
রাতে সবাই শুয়ে পড়েছে তখন। ফ্রান্সিস ডাকল–সালভা। সালভা ওর দিকে তাকাল। ফ্রান্সিস বলল–দেখো নকশাটা প্রথম দেকে আমি যা অনুমান করেছিলাম এখন সেটা আর অনুমান নেই। আমার দৃঢ় বিশ্বাস–রামন লাল নকশায় যে জায়গাটা নির্দেশ করেছেন সেই জায়গাটা তোমার খুবই পরিচিত।
–কিন্তু আমি তো সেই জায়গাটা কোথায় কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। সালভা বলল।
–সেটা আমিই তোমাকে বোঝাবো। আমার মনে হচ্ছে আমি সমাধানের কাছাকাছি এসেছি। ফ্রান্সিস বলল। তারপর বলল–রামনের দ্বিতীয় পাণ্ডুলিপিটা তুমি পড়েছে। সবশেষের পাতায় যা লেখা আছে তুমি কি সেদিন সেটা ঠিক ঠিক আমাকে বলতে পেরেছিলে? সালভা একটু ভেবে বলল তখন আমার যা মনের অবস্থা–ঠিক ঠিক মনে রাখা সম্ভব ছিল না।
–যা হোক–দ্বিতীয় পাণ্ডুলিপিটা রাজার কাছে রয়েছে। কাল সকালে তুমি আমাদের রাজার সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দাও। ঐ পাণ্ডুলিপিটা আমি চাইবো। রাজা দিলে পড়বো মানে তুমি পড়ে আমাকে অর্থ বলবে। রামন লাল ঠিক কী বলতে চেয়েছেন সেটা আমি জানতে চাই। ফ্রান্সিস বলল।
পরদিন সকালে সালভা রাজপ্রাসাদে গেল। একটু পরেই ফিরে এলো। বলল– রাজা নিজেই তোমাকে দেখা করবার জন্যে একজন প্রহরীকে পাঠিয়েছেন।
তাহলে তো ভালোই হল। ফ্রান্সিস বলল।
