ভোর হতেই পালমার অধিবাসীরা দলে দলে এসে জড়ো হতে লাগল রাজপ্রাসাদের বাইরে। আস্তে আস্তে ভিড় বাড়তে লাগল। সকাল হতেই বহুলোক জড়ো হল। সবাই শ্রান্ত। কারো মুখে কথা নেই। এত লোক। কিন্তু কোনো শব্দ নেই। শুধু এখানে ওখানে দু’চারজন বুড়োবুড়ির ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ শোনা গেল।
হঠাৎ জনারণ্যে বেশ চাঞ্চল্য সৃষ্টি হল। দেখা গেল দূরে যুদ্ধসাজে সজ্জিত সেনাপতি ঘোড়া ছুটিয়ে আসছেন। তার পেছনে একটা ঘোড়ায়টানা গাড়িতে রাখা কাঠের কফিন। গাড়িটা চারদিক থেকে ঘিরে আসছে একদল অশ্বারোহী সৈন্য। দেখেই বোঝা যাচ্ছে সৈন্যরা সবাই পরিশ্রান্ত। অপেক্ষারত নগরবাসীদের মধ্যে চাঞ্চল্য জাগল। সবাই সেই কফিনের কাছে যেতে চায়। কিন্তু সৈন্যরা কাউকে এগোতে দিল না।
রাজা প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে এলেন। সঙ্গে মন্ত্রীমশাই। পেছনে প্রাসাদরক্ষীরা। রাজা ও মন্ত্রীমশাই পায়ে হেঁটে সিংহদ্বারের কাছে এলেন। সিংহদ্বার আগেই খুলে রাখা হয়েছিল। কফিনের গাড়ি আস্তে আস্তে সিংহদ্বার দিয়ে ঢুকল। রাজা আর মন্ত্রী মাথা নুইয়ে সম্মান জানালেন। সিংহদ্বারের সামনেই কফিনের গাড়িটা থামিয়ে দেওয়া হল। বন্ধ করে দেওয়া হল সিংহদ্বার। সিংহদ্বারের লোহার গরাদের ওপর মানুষের ঢল নামল। সবাই সেই কফিনটা দেখতে চায়। শেষ শ্রদ্ধা জানাতে চায় রামন লালের নশ্বর দেহকে।
ফ্রান্সিসরা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে সেই দৃশ্য দেখছিল। ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে বলল– বুঝলে মারিয়া–মাজোরকার মানুষরা সত্যিই রামন লালকে শুধু শ্রদ্ধাই করতো না ভালোবাসতো।
ওদিকে বন্দি আল আমিরিকে নিয়ে যাওয়া হল সৈন্য আবাসের লাগোয়া কয়েদখানায়। উদ্ধার করা দ্বিতীয় পাণ্ডুলিপিটা নিয়ে সেনাপতি রাজার পেছনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন। রাজা প্রাসাদে ফিরলেই পাণ্ডুলিপিটা দেবেন।
রামন লালের পবিত্র দেহ প্রাসাদ সংলগ্ন সমাধিস্থলে সমাধিস্থ করার আয়োজন চলল।
ফ্রান্সিস সালভাকে বলল–চলো–রামন লালের থাকার ঘর যেখানে ছিল সেখানে। মারিয়া শাঙ্কো এগিয়ে এলো। চলল সবাই।
শিক্ষাগুরুদের বাসস্থানের এলাকায় এলো ওরা। সালভা ওদের নিয়ে এলো পর পর কয়েকটা আলাদা আলাদা বাড়ির কাছে। বাড়িগুলো পাথরের দেয়াল ঘেরা। কয়েকটা বাড়ির পরে একটা বাড়ির সামনে সালভা দাঁড়াল। বাড়িটার সাধারণ কাঠের দরজায় তালা ঝুলছে। সালভা পকেট থেকে চাবি বের করতে করতে বলল–শ্রদ্ধেয় ম্যাস্ত্রোর কাছ থেকে আমি চাবিটা নিয়ে রেখেছি। জানি আপনারা এখানে আসবেন। রামন লালের আবাসস্থল দেখতে চাইবেন।
দরজা খোলা হল। ভেতরে ঢুকল সবাই। সামনেই একটু বাঁধানে জায়গা। তার পরে ঘর। ওরা ঘরটার কাছে এলো। দরজা ভেজানো ছিল। ধাক্কা দিতেই খুলে গেল। ঘরে ঢুকল সবাই। ঘরের একপাশে মেঝেয় বিছানা রয়েছে। অন্যপাশে দেয়ালে পাথরের তাক। তাতে হাতে লেখা চামড়া বাঁধানো পাণ্ডুলিপি। পরপর সাজানো। সবই পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন। বোঝা গেল–নিয়মিত ঘরটা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার ব্যবস্থা আছে। ঘরটা বেশ বড়ো। পেছনের দেয়ালের ওপরের দিকে তিনটি চ্যাপ্টা লোহার গরাদ বসানো জানলামতো চৌকোণো ফোকর। আলো হাওয়া আসছে। সালভা বলল–এখানেই মহামতি রামন লাল থাকতেন।
ফ্রান্সিস ঘুরে ঘুরে ঘরটা দেখতে লাগল। বলল–সালভা–তুমি তো অনেকবার এখানে এসেছো।
–হ্যাঁ হা। ঐ যে জানলার নীচে একটা বড়ো চৌকোণো পাথর আর তার পাশে নিচুতে একটা পাথর ওটাই ছিল মহামতি রামনের লেখাপড়ার জায়গা। ফ্রান্সিস ওখানটায় গেল। দেখল ওপরের জানলা দিয়ে এখানে যথেষ্ট আলো আসছে। এবার ফ্রান্সিস পাথরের তাকে রাখা পাণ্ডুলিপির পাতা উল্টে দেখতে লাগল। মারিয়াকে ডেকে বলল–
–এই পাণ্ডুলিপিগুলো দেখো তো। আমার বিদ্যে তো জানো। মারিয়া এগিয়ে এলো। পাতা উল্টে দেখতে লাগল। দেখে নিয়ে বলল–গ্রীক আরবী আর ল্যাতিন ভাষায় লেখা। এটুকু বুঝতে পারছি। তার বেশি বোঝার বিদ্যে আমারও নেই। সালভা বলল– এসব পুরোনো সংগ্রহের কিছু কিছু আমার পড়ার কাজে লেগেছে। দর্শন, রয়াসন আর জ্যোতির্বিদ্যার ওপরেই লেখা বেশি।
–আচ্ছা–গ্রীক ভাষায় লেখা রামন লালের কোনো পাণ্ডুলিপি এখানে আছে? মারিয়া বলল। ফ্রান্সিস বলে উঠল-আমিও ঠিক এই কথাটাই জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিলাম। সালভা সেই পাথরপাতা জায়গাটায় গেল। পাশেই পাথরের তাকটার দিকে তাকিয়ে বলল–রামন লালের নিজের পাণ্ডুলিপিগুলো সব এখানেই থাকতো। এখন দেখছি না। শ্রদ্ধেয় ম্যাস্ত্রো হয়তো বলতে পারবেন।
–চলো তো। ফ্রান্সিস বলল। ওরা বাড়ির বাইরে এলো। দরজায় তালা লাগিয়ে সালভা চলল ম্যাস্ত্রোর ঘরের দিকে। যেতে যেতে সালভা বলল–শ্রদ্ধেয় ম্যাস্ত্রো এখানকার ছাত্রাবাসের দায়িত্বে আছেন। তাই শুধু উনিই ছাত্রাবাসের ঘরে থাকেন। কিন্তু ম্যাস্ত্রোর ঘরের সামনে এসে দেখল ঘরে তালা ঝুলছে। ম্যাস্ত্রো নেই। সালভা ছাত্রদের ঘরে গিয়ে জেনে এলো যে রমন লালের পবিত্র দেহ সমাধিস্থ করার আয়োজনে উনি এখন ব্যস্ত।
দুপুরে খাওয়াদাওয়ার সময় ম্যাস্ত্রো এলেন। তখন সালভা ফ্রান্সিসকে নিয়ে গেল। ম্যাস্ত্রোকে ফ্রান্সিস বলল–মহামতি রামন লালের নিজের হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি একটু দেখতে চাই। ম্যাস্ত্রো পাশের দেয়ালের তাক থেকে চারটে পাণ্ডুলিপি বের করলেন। মরক্কো চামড়ায় বাঁধানো বড়ো বই মতো বেশ মোটা ভারী। ফ্রান্সিস বইটার লেখাগুলো দেখল। তারপর মারিয়ার হাতে দিল। মারিয়াও দেখল–গ্রীক ও আরবী ভাষায় লেখা। বাকিগুলোও দেখল ওরা। খুব পরিচ্ছন্ন হস্তাক্ষর। ফ্রান্সিস ভাবল এমনি হাতে লেখা একটা পাণ্ডুলিপি নিখোঁজ। এখন সেটাই খুঁজে বের করতে হবে। ভরসা শুধু নকশাটা।
