ছাত্রাবাস শিক্ষাগুরুদের আবাস ঐদিকে। সেইদিকে চলল ওরা। তখনি প্রাসাদের দক্ষিণ দিককার দেয়ালের ওপাশ থেকে বহু মানুষের কোলাহল ঘোড়ার ডাক শোনা গেল। সালভা বলল–ঐ দিকেই সৈন্যবাস। একটা বিরাট প্রান্তর আছে ঐদিকে। বোধহয় সৈন্যসজ্জা চলছে সেখানে।
হাঁটতে হাঁটতে উত্তরের ঘরগুলোর কাছে ওরা এলো। সালভা প্রথম ঘরটার দরজায় দাঁড়াল। ফ্রান্সিসরাও এসে ওর পেছনে দাঁড়াল। দেখা গেল ছোটো একটা ঘর। একপাশে পাথরের মেঝেয় কম্বলমতো মোটা কাপড়ের বিছানা পাতা। বিছানায় একজন বৃদ্ধ বসে আছেন। গায়ের ছাইরঙের মোটা কাপড়ের একটা অংশ ঘোমটার মতো তার মাথায় টানা। বৃদ্ধ একটি পাণ্ডুলিপি পড়ছেন।
সালভা গিয়ে বৃদ্ধের সামনে মেঝেয় বসল। বৃদ্ধ মুখ তুলে সালভার দিকে তাকালেন। সালভা মাথা নুইয়ে সম্মান জানাল। হেসে বলল–শ্রদ্ধেয় ম্যাস্ত্রো আমাকে চিনতে পারছেন? বৃদ্ধ ওর দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর হাসলেন। কপালে মুখে বলিরেখা স্পষ্ট হল। বললেন–তুমি সালভা–তাই না? সালভা হেসে মাথা ঝাঁকাল। বলল শ্রদ্ধেয় ম্যাস্ত্রো–মহামতি রামন লালের প্রথম পাণ্ডুলিপিটা তো এখনো পাওয়া যায় নি। ম্যাস্ত্রো মাথা নাড়লেন। সালভা ইশারায় ফ্রান্সিসকে ডাকল। ফ্রান্সিস এগিয়ে এলো। ফ্রান্সিসকে দেখিয়ে সালভা বলল–এর নাম ফ্রান্সিস। আমার বন্ধু। ম্যাস্ত্রো একবার তাকিয়ে ফ্রান্সিসকে দেখলেন। সালভা বলল–রাজা এই ফ্রান্সিসকেই দায়িত্ব দিয়েছেন ঐ পাণ্ডুলিপিটা খুঁজে বের করার জন্যে।
“ভালোই তো। ম্যাস্ত্রো বললেন।
তাই ফ্রান্সিস তার বন্ধুদের নিয়ে এখানে থাকবেন। একটা ঘরের ব্যবস্থা আপনাকে করে দিতে হবে। সালভা বলল।
–এ আর বেশি কথা কি। তুমি তো সবই চেনো। যেকোনো একটা খালি ঘর পছন্দ করে থাকো। ম্যাস্ত্রো বললেন। একটু থেমে সালভা বলল–এবার আপনাকে একটা শোক সংবাদ জানাচ্ছি। আমাদের গুরুদেব মহাতি রামন লাল কিছুদিন আগে দেহত্যাগ করেন। ম্যাস্ত্রো কেমন বিহ্বলচোখে সালভার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন– দীর্ঘদিন আমরা অনেক চেষ্টা করেও তার কোনো খোঁজ পাই নি। কিন্তু তুমি জানলে কী করে?
পরে সব বলবো আপনাকে। সালভা বলল। মাথা নাড়তে নাড়তে ম্যাস্ত্রো বললেন–এখানে বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলবার চেষ্টা করছি আমরা। আশা ছিল, যশস্বী রামন লাল ফিরে আসবেন। আমরা তার সাহায্য ও পরামর্শ পাবো। আঃ বড়ো কষ্ট হচ্ছে। ম্যাস্ত্রো মাথা নাড়লেন। সালভা উঠে দাঁড়াল। মাথা নুইয়ে সম্মান জানিয়ে ঘরের বাইরে এলো। চলল টানা বারান্দা ধরে। ফ্রান্সিসরাও চলল। পর পর বেশ ক’টা ঘর পার হল ওরা। প্রত্যেকটাতেই ছাত্ররা রয়েছে। পাথরের বারান্দাটা যেখানে বাঁক নিয়েছে সেখানে একটা খালি ঘর পাওয়া গেল। ঘরটায় ঢুকল সবাই। ঘরটা বড়ো। কিন্তু ঘরটার মেঝেয় কোনো বিছানামতো কিছু নেই। ঘরটার পাথুরে দেয়ালের ওপরের দিকে চ্যাপ্টালোহার কয়েকটা গরাদ বসানো জানলা। ওরা ঘরটা দেখছেতখনই একটি অল্পবয়সী ছেলে এসে দরজায় দাঁড়াল। ছেলেটার মাথা ন্যাড়া। সালভা বলল–কীরে–তুই এখানে কাজ করিস?
–হ্যাঁ। কর্তা আমাকে পাঠিয়ে দিলেন। ছেলেটি বলল। বোঝা গেল ম্যাস্ত্রো পাঠিয়েছেন।
ন্যাড়া মাথা ছেলেটিই ফ্রান্সিসদের ওখানে স্নান খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিল।
ঘরে এসে দেখল চারজনেরই বিছানার ব্যবস্থা হয়েছে। ফ্রান্সিস বিছানায় শুয়ে পড়ল। তারপর ক্লান্তিতে চোখ বুজল। শাঙ্কো আর মারিয়াও বিছানায় বসল। ক্লান্ত সকলেই। সালভা বলল–আমি রাজবৈদ্যির কাছ থেকে পিঠের ওষুধটা নিয়ে আসছি। ঘা শুকিয়ে এসেছে কিন্তু টনটনানিটা যাচ্ছে না। সালভা চলে গেল।
শাঙ্কো টান টান হয়ে শুয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস চোখ বন্ধ অবস্থাতেই বলল–মারিয়া শুয়ে বিশ্রাম করো। অনেক ধকল গেছে। মারিয়া শুয়ে পড়তে পড়তে বলল–ফ্রান্সিস পারবে পাণ্ডুলিপি উদ্ধার করতে? চোখ না খুলেই ফ্রান্সিস বলল–আগে রামন লালের থাকার ঘর–পড়ার ঘর–পেছনের ছোটো গীর্জাটা–শিক্ষাগুরুদের থাকার জায়গাগুলো–এসব দেখি–তারপর বুঝবো পারবো কি পারবো না।
বিকেল হয়ে এলো। সালভা ফিরল তখন। ওর পোশাকের পকেট থেকে একটা তামার চৌকোণো চাকতি বেরকরল। ফ্রান্সিসের হাতে দিয়ে বলল–পাঞ্জা। রাজা পাঠিয়ে দিয়েছেন। এটা দেখিয়ে যেখানে খুশি আমরা যেতে পারবো। মারিয়া হাত বাড়িয়ে পাঞ্জাটা নিল। দেখতে লাগল। শাঙ্কো দেখল। ওরা নিশ্চিন্ত হল যে এখন রাজপ্রাসাদে ঢোকবার বা বেরোবার জন্যে আর সমস্যা থাকবে না। সালভা ফ্রান্সিসকে বলল– জানেন–মহামতি রামন লালের দেহরক্ষার সংবাদে সারানগর শোকে মুহ্যমান। বন্দরে সব কাজকর্ম বন্ধ হয়ে গেছে। দোকানটোকানও বন্ধ হয়ে গেছে। পথ জনশূন্য। সবাই অধীর আগ্রহে আপেক্ষা করছে কালকে কখন সেনাপতি রামন লালের পবিত্র দেহ নিয়ে আসে। ফ্রান্সিস শুনল। কোনো কথা বলল না। ওর তখন চিন্তা নক্শায় কীভাবে কী। নির্দেশ দিয়েছেন রামন লাল?
সন্ধে হ’ল। ফ্রান্সিস তখনও চুপ করে শুয়ে ভাবছে। সালভা বলল–কী করবেন এখন?
সন্ধে হয়ে গেছে। অন্ধকারে শুধু মোমবাতির অলোয় কিছু বোঝা যাবে না। আজ রাতে শুধু বিশ্রাম। কালকে সকাল থেকে কাজে লাগতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
রাতে খাওয়াদাওয়ার পর ফ্রান্সিস মোমবাতির আলোয় নকশাটা দেখল বেশ কিছুক্ষণ। তারপর মোমবাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়ল।
