এতক্ষণ আল আমিরির তলোয়ার যত দ্রুত এদিক-ওদিক ঘুরছিল এখন কিন্তু সেই দ্রুততা আর নেই। তবু হঠাৎ দ্রুত ঘুরে আল আমিরি তলোয়ার চালাল। রোদে ঝলসে উঠল তলোয়ার। সেনাপতির বাঁ বাহু ছুঁয়ে তলোয়ারের ফলা নেমে এলো। পোশাকের কাপড় কেটে রক্ত বেরিয়ে এলো। সেনাপতি কাটা জায়গাটা দেখলেন। এবার সেনাপতি দ্রুত তলোয়ার চালাতে লাগলেন। আল আমিরি সেই তলোয়ারের মার ঠেকাতে ঠেকাতে পিছু হঠতে লাগল। সেনাপতি ওর ওপর সমান চাপ রেখে এগিয়ে চললেন। হঠাৎ সেনাপতি এত দ্রুত আর এত জোরে তলোয়ার চালালেন যে পরিশ্রান্ত আল আমিরি সেই মার ঠেকাতে পারল না। ওর হাত থেকে তলোয়ার ছিটকে গেল। সেনাপতি আল আমিরির গলায় তলোয়ারের ডগাটা ঠেকিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন–তোকে মেরে ফেলার হুকুম নেই। তারপর যোদ্ধাদের বললেন–এটাকে বন্দি করো। একজন যোদ্ধা ছুটে গেল। আল আমিরির কোমরের ফেট্টি খুলে তাই দিয়ে ওর হাত বাঁধল। সেনাপতি বললেন–মহামতি রামন লালের নশ্বর দেহ কোথায় সমাধিস্থকরা হয়েছে? আল আমিরি। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল–দুর্গের উত্তর দিকে প্রান্তরে।
–আমাদের নিয়ে চলো। সেনাপতি বললেন। তারপর বললেন–এখানে বেলচা কোথায় থাকে? আল আমিরি বলল–আমি জানি না। রামন লালের মৃতদেহ কবর দেবার সময় আমরা কেউ যাই নি। কবর খোঁড়েটোড়ে এমন দু’জন গিয়েছিল। সেনাপতি শুধু বলল–আশ্চর্য। তারপর যোদ্ধাদের দিকে তাকিয়ে বললেন–এই দুর্গের ঘরগুলো খোঁজ। কোথাও দু-একটা বেলচা নিশ্চয়ই পাবে। যোদ্ধারা কয়েকজন বেলচা খুঁজতে গেল।
কিছু পরে তারা দুটো বেলচা নিয়ে এলো। সেনাপতি আল আমিরিকে বললেন– চলোকবরের জায়গাটা দেখিয়ে দেবে।
–সেই জায়গাটা কোথায় তা তো আমি জানি না। আল আমিরি বলল।
তার মানে? সেনাপতি বললেন।
কবরের সময় তো আমরা যাই নি। আল আমিরি বলল।
–ও। ঠিক আছে আমরাই খুঁজে নেব। সেনাপতি বললেন। তারপর দু’জন যোদ্ধাকে বললেন–আল আমিরিকে কয়েদঘরে বন্দি করে রাখো।
সেনাপতি দুর্গ থেকে বেরিয়ে উত্তরমুখো চললেন। তরো যোদ্ধারাও নিঃশব্দে তার পেছনে পেছনে চলল। ওরা সেনাপতি আর আল আমিরির সব কথাই শুনেছে। উত্তরের প্রান্তরে এসে সেনাপতি যোদ্ধাদের দিকে তাকিয়ে বললেন–এখানে খুঁজে দেখো তো কোথায় মাটি কাটা আছে। দু’একদিন আগেই কবর কাটা হয়েছে। সবাই এদিক ওদিক ছড়িয়ে পড়ল। কবর খুঁজতে লাগল। পাওয়া গেল। ঘাসের মধ্যে সহজেই মাটি খোঁড়া জায়গাটা দেখা গেল।
কবরের জায়গাটাতে সেনাপতি এলেন কবরের সামনে কিছুক্ষণ চোখ বুজে দাঁড়ালেন। এ তারপর যে দু’জন যোদ্ধা বেলচা নিয়ে এসেছিল তাদের বললেন কবরটা খোঁড়। কফিনটা তুলতে হবে। যোদ্ধা দু’জন বেলচা দিয়ে কবর খুঁড়তে লাগল। হাত দুয়েক খুঁড়েই কফিনটা পাওয়া গেল। একটা সস্তা দামের কাঠের কফিন। সালভার পক্ষে এর চেয়ে বেশি দামের কফিন জোগাড় করা সম্ভব ছিল না।
কফিনটা উপরে তোলা হল। সবাই মাথায় বুকে ক্রশ চিহ্ন আঁকল। এবার সেনাপতির নির্দেশে কয়েকজন কফিনটা কাঁধের কাছে তুলল। সবার আগে সোনপতি কফিনটার সামনের দিকেকঁধ দিল।তখনও সেনাপতির বাঁ বাহু থেকে রক্ত পড়ছিল। কিন্তু সেনাপতি সেটা গ্রাহ্য করল না। বাকি কয়েকজন কঁধ দিল। সেনাপতি সেটা গ্রাহ্য করল না। বাকি কয়েকজন কঁধ দিল। সেনাপতি কফিন নিয়ে চলল।
দুর্গের বাঁ দিকে বনজঙ্গলের কাছে পালমা থেকে আনা দামি কাঠের তৈরি সোনা রুপোর ফুল লতা পাতার কাজ করা কফিনটা রাখা ছিল। সেই কফিনের কাছে এই কফিনটা আনা হল। নতুন কফিনটার মুখ খোলা হল। আগের কফিনের মুখটা খোলা হল। রামন লালের শায়িত মৃতদেহ বেশ কয়েকজন হাত লাগিয়ে তুলল। তারপর নতুন কফিনে আস্তে আস্তে রাখল। কফিনের মুখ বন্ধ করা হল। সেনাপতির দু’চোখে জলে ভরে গেল। যোদ্ধাদের মধ্যেও অনেকে কাঁদছিল।
দুপুরের খাওয়া-দাওয়ার পর সব যোদ্ধারা ঘাসের প্রান্তরে শুয়ে বসে বিশ্রাম করছিল। সেনাপতি সেখানে এলেন। গলা চড়িয়ে বললেন–বীর যোদ্ধারা এখন সবাই বিশ্রাম করো। রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর আমরা পালমা নগরের দিকে যাত্রা করবো। ভোর ভোর সময়ে পালমা পৌঁছে যাবো।
রাতের খাওয়া-দাওয়া শেষ হল। চারদিক খোলা যে গাড়িটা সেনাপতি এনেছিল সেই গাড়িতে কফিনটা রাখা হল। দুটো ঘোড়া গাড়িটা টানবে। আল আমিরিকে হাত বাঁধা অবস্থায় একটা ঘোড়ায় বসানো হল। একজন অশ্বারোহী যোদ্ধা সেই ঘোড়ায় আল আমিরির পেছনেই বসল।
একেবারে সামনে রাখা হল কফিনের গাড়িটাকে। তারপর ঘোড়ায় চড়ে সেনাপতি। তারপর অশ্বারোহী যোদ্ধারা। তারপর পদাতিক যোদ্ধারা, তিরন্দাজরা। সবশেষে বন্দি আল আমিরি।
সেনাপতি তলোয়ার কোষমুক্ত করল। রাজধানী পালমা নগরের দিকে তলোয়ার তুলে চিৎকার করে বললেন–যাত্রা শুরু।
যাত্রা শুরু হল।
আজ চাঁদের আলো খুব উজ্জ্বল নয়। চাঁদ মেঘেও ঢাকা পড়ছে মাঝে মাঝে। সমুদ্রের দিক থেকে জোরালো হাওয়া বইছে!
পালমা নগরে পৌঁছোবার আগেই ভোর হল।
ওদিকে রাজবাড়ি থেকে ফিরে সালভা বলল–ফ্রান্সিস এখন কী করবেন?
ফ্রান্সিস বলল-রামন লাল কোথায় থাকতেন?
ছাত্রাবাসের পাশেই শিক্ষাগুরুদের আলাদা আবাস। তারই একটিতে রামন লাল থাকতেন। সালভা বলল।
–তাহলে ঐ ছাত্রাবাসেই একটা আলাদা ঘরের ব্যবস্থা করো। আমরা সেই ঘরেই থাকবো। ফ্রান্সিস বলল। উত্তরমুখো কিছু পাথরের ঘরের দিকে দেখিয়ে সালভা বলল–
