কুড়িজন যোদ্ধা সঙ্গে সঙ্গে কাণ্ড ঘাড়ে বসিয়ে ছুটে দেউড়ির কাঠের দরজার সামনে চলে এলো। এখন আর স্লিং-এ চড়িয়ে পাথর ছুঁড়ে লাভ নেই। এত কাছে পাথর গিয়ে পড়বে না। স্লিং থেকে পাথর ছোঁড়া বন্ধ হল। শুধু তিরন্দাজরা তির ছুঁড়তে লাগল। ওদিকে সেনাপতির হুকুমে তার তিরন্দাজ বাহিনী তির ছুঁড়তে লাগল। সেনাপতি চিৎকার করে বলল–শুধু ওদের তিরন্দাজদের মারো নয়তো আহত করো। তিরন্দাজরা নিশান ঠিক করে তির ছুঁড়তে লাগল।
এবার সেনাপতি দ্রুতপায়ে সেতুটা পার হলেন। এলেন দুর্গের সদর দরজার কাছে। যোদ্ধাদের বললেন –এই গাছের কাণ্ডটার কুড়িজন কাঁধে নাও। তারপর ছুটে গিয়ে দুর্গের দরজায় একসঙ্গে কাণ্ডটা দিয়ে ঘা মারো। এভাবে বারবার ঘা মারো।
একজন যোদ্ধা সরু গলায় বলতে লাগল –ধাক্কা মারো একসঙ্গে। যোদ্ধারা সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গিয়ে গাছের কাণ্ডটা একসঙ্গে ধরে কাঠের দরজার মাঝখানে ঘা মারতে লাগল। দড়াম্ দড়াম্ শব্দ হতে লাগল। কাঠের দরজাটা নড়ে উঠতে লাগল।
কুড়িজন যোদ্ধা পরিশ্রান্ত হল। হাঁপাতে লাগল। সেনাপতি তা দেখে সেতুর ওপারে জড়ো হওয়া যোদ্ধাদের দিকে তাকিয়ে গলা চড়িয়ে বললেন-কুড়িজন চলে এসো। জদি। দৌড়ে আসবে।
কুড়িজন যোদ্ধা সেতুর ওপর দিয়ে দ্রুত ছুটে এলো। আগের কুড়িজনকে সেনাপতি হাতের ইঙ্গিতে চলে যেতে বললেন। কুড়িজন যোদ্ধা চলে গেল।
এবার নতুন কুড়িজন যোদ্ধা কাণ্ডটা ঠেলে নিয়ে দরজায় ঘা মারতে লাগল। ঘা পড়ছে আর দরজার মাঝখানের ফাঁকটা বড়ো হচ্ছে। কাঠের দুটো মোটা আগল দরজার মাঝখানে এবার দেখা যাচ্ছে। আগল দুটো দেখে যোদ্ধাদের উৎসাহ বেড়ে গেল। চলল দুম দুম্ শব্দ তুলে আগলদুটোয় ঘা মারা। পরিখার ওপারে দাঁড়ানোর সৈন্যরাও চিৎকার করে উৎসাহ দিতে লাগল। পর পর ঘা পড়তে লাগল বিরাট দরজাটা নড়তে লাগল।
হঠাৎ একটা ধাক্কায় কাঠের একটা আগল ভেঙে ছিটকে পড়ল। যোদ্ধারা চিৎকার করে উঠল। যোদ্ধারা হাঁপাচ্ছে তখন। সেনাপতি ওদের বলল–এবার অন্যদের ডাকছি। তোমরা যাও। ওরা বলে উঠলনা। দু’একজন বলল–একটা আগল ভেঙেছি অন্যটাও ভাঙবো। আমরাই ভাঙবো।
আবার ঘা পড়ল অন্য আগলটায় বারে বারে। যোদ্ধারা হাঁপাচ্ছে তখন। একজন যোদ্ধা বলে যেতে লাগল ধাক্কা মারো একসঙ্গে। কাঠের আগলটা ক্রমাগত এই ধাক্কা সামলাতে পারল না। একটা জোর ধাক্কা খেয়ে কাঠের আগলটা দু’টুকরো হয়ে ছিটকে পড়ল। বন্যার জলের মতো যোদ্ধারা চিৎকার করতে করতে দুর্গের মধ্যে ঢুকে পড়ল। দুর্গের ছাত থেকে দুর্গের ঘরগুলোর আশপাশ থেকে আল আমিরির যোদ্ধার তির বর্শা ছুঁড়তে লাগল। কিন্তু সেনাপতি যোদ্ধাদের থামাতে পারল না। দুর্গের ঘরগুলো থেকে আল আমিরির যোদ্ধারা খোলা তলোয়ার হাতে সেনাপতির যোদ্ধাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। সেনপতির যোদ্ধারা তলোয়ারের লড়াই চালাল। ততক্ষণে বাইরে পরিখার ওপারে দাঁড়ানো সেনাপতির যোদ্ধারা চিৎকার করতে করতে ছুটে এলো। আল আমিরির যোদ্ধারা তাদের রুখতে পারল না। আল আমিরির সৈন্যদের ঘিরে ফেলল সেনাপতির যোদ্ধারা চলল তলোয়ারের লড়াই দুর্গের চত্বরে। চত্বরটা ভরে উঠল আহতের আর্ত চিৎকারে গোঙানিতে। কিছুক্ষণের মধ্যে আল আমিরির যোদ্ধারা হার স্বীকার করতে লাগল। সেনাপতির যোদ্ধারা সাহসী আর রণনিপুণ। আমিরির মূর সৈন্যরা পেরে উঠল না।
দুর্গের ঘরগুলোর বারান্দায় দাঁড়িয়ে সেনাপতি চিৎকার করে বললেন–বীর যোদ্ধারা–আর ইত্যা নয়। ওরা আর কিছুক্ষণের মধ্যেই হার স্বীকার করবে। ওদের এখন বন্দি কবো। এই দুর্গে নিশ্চয়ই কয়েদঘর আছে। ওদের কয়েদঘরে ঢুকিয়ে দাও।
সেনাপতির যোদ্ধারা তার নির্দেশমতো আল আমিরির যোদ্ধাদের বন্দি করতে লাগল। ওদের দু’হাত দড়ি দিয়ে বেঁধে নিয়ে চলল কয়েদঘরের দিকে।
লড়াই শেষ। সেনাপতির যোদ্ধারা তখন হাঁপাচ্ছে। সেনাপতি গলা চড়িয়ে বললেন– কিছু যোদ্ধা ছাতে চলে যাও। ওখান থেকে মাঝে মাঝেই তির বর্শা ছোঁড়া হচ্ছে। কিছু যোদ্ধা ছুটল ছাতে ওঠার সিঁড়ির দিকে। ছাতে উঠে আল আমিরির যোদ্ধাদের আক্রমণ করল। তারা কিছুক্ষণের মধ্যেই আত্মসমর্পণ করল। তাদের ছাদ থেকে নামিয়ে এলে কয়েদঘরে বন্দি করে রাখা হল।
তখনই দেখা গেল আল আমিরি খোলা তলোয়ার হাতে ছুটে এলো। সেনাপতি দ্রুত তার সামনে এলেন। বললেন–আল আমিরি–অস্ত্র ত্যাগ করো। লড়াই শেষ হয়ে গেছে। তোমার যোদ্ধারা হয় মরেছে নয়তো আহত হয়েছে অথবা কয়েদঘরে বন্দি হয়ে আছে। তুমি একা লড়ে কী করবে?
আল আমিরি মাথা ঝাঁকিয়ে বলল–আমি লড়াই করবো। মরতে হয় মরবো তবু লড়াই থেকে পিছিয়ে আসবো না।
–তাহলে আমার সঙ্গেই লড়াই করো। সেনাপতি কথাটা বলেই তলোয়ার হাতে আল আমিরির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। আল আমিরি কোনোরকমে সেই মার আটকাল। শুরু হল আল আমিরির সঙ্গে সেনাপতির লড়াই।
তলোয়ারের লড়াইতে কেউ কম যায় না। সেনাপতির যোদ্ধারা লড়াইয়ের জায়গাটা ঘিরে গোল হয়ে দাঁড়াল। লড়াই দেখতে লাগল।
তলোয়ারের লড়াই চলল। সেনাপতি এগিয়ে পিছিয়ে নিপুণ হাতে তলোয়ার চালাতে লাগলেন। আল আমিরিও কম যায় না। সেনাপতির মার ঠেকাতে লাগল। আবার আক্রমণও করতে লাগল। দু’জনেই তখন হাঁপাচ্ছে। তরোয়ারের ঠোকাঠুকির শব্দ আর শাস ফেলার শব্দ।
