সঙ্গে সঙ্গে সেনাপতি বেলো যোদ্ধাদের উদ্দেশে চিৎকার করে বলতে লাগলেন– সবাই পরিখা সাঁতরে পার হয়ে চলে এসো। যোদ্ধারা পরিখার জলে ঝাঁপিয়ে পড়তে লাগল জল গলা পর্যন্ত। কাউকে সাঁতরাতে হল না। জল ঠেলে যোদ্ধারা এপারে চলে এল। সেনাপতির হুকুমে সার বেঁধে দাঁড়াল। স্লিং থেকে ছোঁড়া পাথরের ছোটো ছোটো চাইগুলো এতদূর এলো না। যোদ্ধারা এবার নিরাপদ।
সেনাপতি বেলো এই স্লিং-এর কথা শুনেছেন কিন্তু আগে কখনো দেখেননি। এবারই প্রথম দেখলেন। স্লিং-এর কর্মক্ষমতা দেখলেন।
সেনাপতি বেলো ভেবে দেখলেন এভাবে দুর্গের বাইরে থেকে আক্রমণ করে দুর্গ দখল করা যাবে না। অন্য কোনো উপায় দেখতে হবে।
ওদিকে দুর্গ থেকে পাথর ছোঁড়া বর্শা ছোঁড়া বন্ধ হল। সেনাপতি বেলোর যোদ্ধারা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে অতদূর পর্যন্ত স্লিং দিয়ে ছোঁড়া ছোটো পাথরের চাঁই উড়ে আসছে না।
তখন পুবের আকাশ লাল হয়ে উঠেছে। একটু পরেই সূর্য উঠল। ভোরের নরম আলো ছড়ালো দুর্গের গায়ে গাছগাছালির মাথায়। পাখি-পাখালির ডাক শোনা গেল।
সেনাপতির যোদ্ধারা তখন অত্যন্ত ক্লান্ত, সেই পালমা নগর থেকে হেঁটে আসা সারারাত যুদ্ধ করা। কিছু যোদ্ধা এত ধকল সইতে পারল না। ঘাসের প্রান্তরে বসে পড়ল। সেনাপতি দেখলেন কিন্তু কিছু বললেন না।
এখন যুদ্ধবিরতি চলছে। সেনাপতির আদেশে কয়েকজন যোদ্ধাকে নিয়ে রসুইকর চলল বনজঙ্গলের দিকে। গাছগাছালির আড়ালে রসুইকররা সকালের খাবার তৈরির জন্য তিনটে পাথর বসিয়ে উনুনের মতো বানাল। রান্নার আয়োজন চলল।
ঘোড়ার তদারক করে যারা তাদেরই একজন সেনাপতির কাছে এলো। সেনাপতি ও ঘোড়া থেকে নামলেন। যোদ্ধাটি ঘোড়াটাকে হাঁটিয়ে নিয়ে চলল দানাপানি খাওয়াতে।
সেনাপতি প্রান্তরে পড়ে থাকা একটা পাথরের চাইয়ের ওপর বসলেন।
তখন বেলা হয়েছে। দুর্গ বড়ো সড়ক পুবদিকে বনজঙ্গল সবই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সেনাপতি একবার চারদিকে তাকিয়ে দেখলেন। ভাবতে লাগলেন কীভাবে দুর্গা দখল করা যায়। রাতের অন্ধকারে দুর্গের দেয়াল ডিঙানো যায়। কিন্তু দুর্গের ছাদে জ্বলন্ত মশালের আলোতে যোদ্ধারা ধরা পড়ে যেতে পারে। অন্য কোনো উপায় ভেবে বের করতে হবে।
সকালের খাবার খেল সবাই। সেনাপতিও ঐ পাথরে বসেই খাবার খেলেন। খেতে খেতে সর্বক্ষণ ভেবে চললেন কীভাবে দুৰ্গটা দখল করা যায়।
হঠাই একটা উপায়ের কথা মাথায় এলো। দুর্গের সদর দরজা ভেঙে ঢুকতে হবে। সেনাপতি দ্রুত উঠে দাঁড়ালেন। কয়েকন যোদ্ধাকে হাত তুলে ডাকলেন। যোদ্ধারা কাছে এসে মাথা নিচু করে সম্মান জানাল। সেনাপতি বললেন–ঐ বনজঙ্গলের সামনে দেখো। সকলে সেদিকে তাকাল। দেখা গেল ঐ দিকে মানুষের বসতি এলাকা। পাথরের বাড়িঘরদোর। সেনাপতি বললেন–ওখানকার লোকজনের কাছ থেকে কয়েকটা কুড়ুল জোগাড় কবো। চলো আমিও যাচ্ছি।
সেনাপতি ঐ জেলেদের বসতির দিকে চললেন। পেছনে কয়েকজন যোদ্ধা চলল। বসতির পাথরের বাড়িগুলোর সামনে এসে সেনাপতি দেখলেন সব বাড়িই আগুনে পোড়া। আশেপাশে কোথাও মানুষজন নেই। সেনাপতি যোদ্ধাদের দিকে তাকিয়ে বললেন মনে হচ্ছে এখানে বসতি ছিল। পেছনেই বনজঙ্গল। এই বসতির লোকেরা নিশ্চয়ই বনজঙ্গ ল থেকে কাঠকুটো জোগাড় করত। কাজেই কুড়ুল ব্যবহার করতো। নিশ্চয়ই এই পোড়া বাড়িগুলো ভালো করে খুঁজলে কুড়ুল পাওয়া যাবে। তোমরা খোঁজো। যোদ্ধারা পোড়া বাড়িগুলোয় ঢুকে কুড়ুল খুঁজতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যেই যোদ্ধারা তিনটে কুড়ুল পেল। কুড়ুল নিয়ে ওরা সেনাপতির কাছে এলো। সেনাপতি বললেন–এবার চলো বনের মধ্যে। সেনাপতি বনের দিকে চললেন। পেছনে কুঠার নিয়ে যোদ্ধারা চলল।
বনের মধ্যে সেনাপতি একটা বড়ো গাছ খুঁজতে লাগল। পেয়েও গেল। একটা খাড়া উঠে-যাওয়া চেস্টনাট গাছ। বেশ মোটা গাছ। সেনাপতি যোদ্ধাদের গাছটা দেখিয়ে বলল–এই গাছটা কাটো। যোদ্ধারা কুঠার নিয়ে তৈরি হল। প্রথমে দু’জন কুঠার নিয়ে তৈরি হল। প্রথমে দু’জন কুঠারের কোপ পরপর বসিয়ে গাছের গোড়াটা কাটতে লাগল। দু’জনের মধ্যে একজন পরিশ্রান্ত হল। হাঁ করে হাঁপাতে লাগল। তৃতীয়জন এগিয়ে এলো। এবার দুজনে মিলে আগে পরে কুঠার চালিয়ে গাছটা কাটতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যে গোড়া কাটা হয়ে গেল। আশেপাশের গাছের ডালে শব্দ তুলে কাটা গাছটা ঝপ করে মাটিতে পড়ল। সেনাপতি বললেন–গাছটার ডালগুলো ছেটে ফেল। যোদ্ধারা কুঠার চালিয়ে গাছটার ডালগুলো কেটে ফেলল। শুধু লম্বা মোটা কাণ্ডটা রইল। সেনাপতি এবার শুধু কাণ্ডটা দেখে দেখে কী হিসেব করে কাটার ওপরের দিকে একটা জায়গা দেখিয়ে বললেন–এখানটা কাটো। একজন যোদ্ধা কুঠার চালিয়ে সেটা কাটল। এবার রইল শুধু বড়ো লম্বা মোটা কাণ্ডটা। সেনাপতি যোদ্ধাদের বললেন–এবার এটা নিয়ে চলো।
যোদ্ধারা এবার কাটা লম্বা কাণ্ডটা কাঁধে নিয়ে চলল। ওরা সেনাপতির নির্দেশমতো কাণ্ডটা নিয়ে দুর্গের প্রধান প্রবেশপথের দিকে চলল। এবার কাঠের সেতুটা পার হতে লাগল। তখনই দুর্গের ছাত থেকে আল আমিরির যোদ্ধারা স্লিং-এ পাথর চড়িয়ে ছুঁড়তে লাগল। একটা পাথর সেতুর মধ্যে এসে পড়ল। সেতুর ঐ জায়গার কাঠটা ভেঙে জলে পড়ে গেল। সেনাপতি গলা চড়িয়ে বললেন–ঐ কাঠের কাণ্ডটা নিয়ে কুড়িজন যোদ্ধা প্রধান দেউড়ির দরজার কাছে চলে যাও। ছোটো–যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।
