কিছুক্ষণের মধ্যেই সেনাপতি বেলো আর ঘোড়সওয়ার বাহিনী দুর্গের বাইরের রাস্তায় এসে থামলেন। সেনাপতি বেলো একজন ঘোড়সওয়ার সৈন্যকে বললেন–যাও–ঐ মূরবাহিনীর দলনেতা কে তা জানো আর তাকে আমার কাছে আসতে বলে। যুদ্ধের চেয়ে যদি কথা বলে সমস্যাটা মেটানো যায় সেই শেষ চেষ্টাটা করবো আমি।
ঘোড়সওয়ার সৈন্যটি দ্রুত ঘোড়া ছুটিয়ে আল আমিরি যোদ্ধাবাহিনীর কাছে এলো। যোদ্ধাদের দিকে তাকিয়ে বলল–তোমাদের দলনেতা কে? একজন যোদ্ধা বলল– আল আমিরিআমাদের দলনেতা। সেনাপতির পাঠানো যোদ্ধাটি বলল–আল আমিরিকে এখানে আসতে বলো। আমাদের সেনাপতি বেলো তার সঙ্গে কথা বলবেন। আল আমিরির এক সৈন্য বলল–যদি একা পেয়ে আমাদের দলনেতাকে মেরে ফেলে। সেনাপতির যোদ্ধা বলল–আমাদের সেনাপতিও একাই থাকবেন। আল আমিরির সৈন্যরা আর কিছু বলল না। দু’জন দুর্গের দিকে চলল আল আমিরিকে প্রস্তাবটা জানাতে।
সেনাপতি বেলোর একটু সন্দেহ ছিল আল আমিরি আসবে কিনা। কিছুক্ষণ পরেই দেখা গেল আল আমিরি ঘোড়ায় চড়ে দুর্গ থেকে বেরিয়ে এলো। ঘোড়া ছুটিয়ে তার যোদ্ধাবাহিনীর সামনে এসে দাঁড়াল। সেনাপতি বেলো আস্তে আস্তে ঘোড়া চালিয়ে আল আমিরির কাছে এসে বললেন–শুনলাম–আপনার নাম আল আমিরি। আপনি আরবীয় দলনেতা।
–ঠিকই শুনেছেন। আল আমিরি বলল।
–আপনি রাজা দ্বিতীয় জেমসের এই দুর্গ অন্যায়ভাবে দখল করে আছেন সেনাপতি বললেন।
হ্যাঁ। লড়াইয়ে রাজার যোদ্ধাদের হারিয়ে তবে দখল করেছি। আল আমিরি বলল।
–ঠিক আছে–এবার আমি রাজা জেমসের সেনাপতি বেলো আপনাকে বলছি। আপনি ভালোয় ভালোয় দুর্গ ছেড়ে দিয়ে চলে যান। সেনাপতি বললেন।
–যদি না যাই। আল আমিরি বলল।
–তাহলে যুদ্ধ হবে। আমাদের যোদ্ধাবাহিনীর যোদ্ধাদের সংখ্যা আপনার যোদ্ধাদের চেয়ে অনেক বেশি। শুধু শুধু রক্তপাত মৃত্যুকে ডেকে আনবেন না। আপনার দুর্গ ছেড়ে চলে যান। সেনাপতি বললেন।
–না। আমরা লড়াই করবো। আল আমিরি বলল।
–আমি শেষ পর্যন্ত শান্তি সব মিটিয়ে নিতে চেয়েছি। আপনারা তা হতে দিলেন না। তবে যুদ্ধই হোক। সেনাপতি বললেন।
সেনাপতি নিজের যোদ্ধাবাহিনীর কাছে ফিরে এলেন। আল আমিরিও ঘোড়া ছুটিয়ে দুর্গে ঢুকল।
চাঁদের আলো অনুজ্জ্বল। দুর্গে প্রান্তরে সেই আলো ছড়িয়ে আছে। সেনাপতি বেলো নিজেদের বাহিনীর কাছে ফিরে এলেন।
দু’পক্ষের যোদ্ধাবাহিনীর অনড় অপেক্ষা চলছে। সমুদ্রের দিক থেকে জোরালো বাতাস আসছে। শাঁ শাঁ শব্দ উঠছে। একটু দূরের বন-জঙ্গলে।
সেনাপতি বেলোই প্রথম খোলা তলোয়ার মাথার ওপর তুলে চিৎকার করে বলল– আক্রমণ করো। ঘোড়সওয়ার বাহিনী ছুটল।মূর যোদ্ধারা মুখে শব্দ তুলে ঘোড়সওয়ারদের মোকাবিলায় এগিয়ে এলো। ওরা ঘোড়সওয়ার বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। শুরু হল যুদ্ধ। ঘোড়ার ক্ষুরের আঘাতে চাপে বেশ কিছুমূর সৈন্য আহত হল। তবু অশ্বারোহী যোদ্ধাদের শরীরে ঘোড়ার গায়ে তলোয়ারের কোপ বসাল। বর্শা দিয়ে বিদ্ধ করল। কিন্তু রাজা জেমসের সুশিক্ষিত যোদ্ধাবাহিনীর সামনে মূরবাহিনী আর কতক্ষণ দাঁড়াবে। তবুওরা লড়াই করতে লাগল। প্রান্তর ভরে উঠল আর্ত চিৎকার গোঙানি আর তলোয়ারের ঠোকাঠুকির শব্দে।
এবার সেনাপতির নির্দেশে পদাতিকবাহিনী ছুটে এলো। যুদ্ধে নামল। চলল যুদ্ধ। কিছুক্ষণের মধ্যেই আল আমিরির যোদ্ধারা হার স্বীকার করতে লাগল। ওদের সংখ্যাও কমে আসতে লাগল। জীবন বিপন্ন দেখে কিছুমূর যোদ্ধা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালাল। মূর যোদ্ধাবাহিনী পরাস্ত হল। বেশ কিছু দূর যোদ্ধাকে বন্দি করাও হল। এবার সেনাপতি বেলো ঘোড়ায় চড়ে চললেন দুর্গের প্রধান প্রবেশপথের দিকে। তার পেছনে পেছনে যোদ্ধাবাহিনীও চলল।
দুর্গা ঘিরে চারদিকে পরিখা। পরিখা জলে ভর্তি। পরিখা পার হয়ে দুর্গের পাথুরে দেয়ালের কাছে পৌঁছোতে হবে।
প্রধান প্রবেশপথে যেতে পরিখার ওপর কাঠের সেতু দিয়ে যেতে হয়।
ঘোড়ায় চড়ে সেনাপতি বেলো সেতুর কাছে এলেন। দেখলেন দুর্গের বিরাট কাঠের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। দরজার কাছে দেয়ালে তখনও মশাল জ্বলছে। আল আমিরির কোনো প্রহরী ওখানে নেই। সেনাপতি বেলো গলা চড়িয়ে যোদ্ধাদের বললেন–আমার বীর যোদ্ধারা–সেতু দিয়ে ওপারে গিয়ে দেয়ালের চারপাশ ঘিরে দাঁড়াও। যোদ্ধারা কাঠর সেতুর ওপর দিয়ে পরিখার ওপরে গেল। দেয়াল ঘিরে দাঁড়াল। সেনাপতি বেলো আবার উচ্চস্বরে আদেশ দিলেন–দেয়াল ধরে ধরে ওপরে ছাদের দিকে ওঠো।
যোদ্ধারা দেয়ালের কাছে ছুটে এলো। দুর্গের এবড়ো-খেবড়ো দেয়াল ধরে ধরে ওপরের দিকে উঠতে লাগল। এবার শুরু হল আল আমিরির যোদ্ধাদের আক্রমণ। ওরা দুর্গের ছাত থেকে যোদ্ধাদের লক্ষ্য করে তির বর্শা ছুঁড়তে লাগল। কিছু যোদ্ধা আহত হল। মারাও রগেল।
তখন সেনাপতি বেলো চিৎকার করে যোদ্ধাদের চলে আসতে বললেন পরিখার কাছে কাছে যোদ্ধাদের দাঁড়াতে বললেন। যোদ্ধারা তাই দাঁড়াল।
এবার আল আমিরির যোদ্ধারা দুর্গের ছাত থেকে পাথরের ছোটো ছোটো চাই স্লিং এ চড়িয়ে ছুঁড়তে লাগল। স্লিং হচ্ছে কাঠের লম্বা পাটাতন। দড়ি দিয়ে পাটাতন বাঁকিয়ে তার ওপর পাথরে ছোটো ছোটো চাই রাখা হয়। দড়ির বাঁধন খুলে দিলেই বাঁকা পাটাতন প্রচণ্ড জোরে সোজা হয়। পাটাতনে রাখা পাথরের চাঁই ছিটকে গিয়ে মাটিতে দাঁড়ানো যোদ্ধাদের ওপর পড়ে। কিছু যোদ্ধা মরে কিছু আহত হয়। এভাবেই সাত আটটা স্লিং থেকে পাথরের ছোটো ছোটো চাই ছোঁড়া হতে লাগল।
