সালভা বলল–ফ্রান্সিস টিলাটার ওপাশে চাষিদের বসতি আছে। ফ্রান্সিস বলল– ওখানে বৈদ্যিটদ্যি পাওয়া যাবে। সবারই হাত মুখ ঘাসের ঘষায় যেভাবে আঁচড়ে গেছে। জ্বালা জ্বালাভাব। ওষুধ চাই।–খোঁজ নিয়ে দেখি। চলুন। সালভা উঠে দাঁড়াল।ফ্রান্সিসও উঠে দাঁড়াল। বলল–শাঙ্কো–মারিয়া চলো।
ওরা আস্তে আস্তে হেঁটে চলল টিলাটার পেছন দিকে। একটু এগিয়ে যেতেই দেখল কিছু গাছপালা। তারই পরে দেখা যাচ্ছে পাথরের কিছু বাড়িঘর।
ওরা বাড়িগুলোর কাছে আসতেই বাড়ির বাইরে স্ত্রীপুরুষ যারা ছিল তারা ওদের দেখল। জলকাদামাখা মানুষগুলো কোত্থেকে এলো? সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। কে চেঁচিয়ে বলল–কারা আসছে গো? বাড়িঘর থেকে আরো মেয়েপুরুষ বেরিয়ে এলো। হঠাৎ সালভা ওদিকে ছুটতে ছুটতে ডাকল–বাবা-আ। দেখা গেল জেলেদের পোশাক পরা একজন মধ্যবয়স্ক লোক দু’হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসছে। সালভা ছুটে গিয়ে ওর বাবাকে জড়িয়ে ধরল। একটি ছোটো ছেলে আর একটি অল্পবয়সী মেয়েও ছুটে এসে সালভাদের ঘিরে দাঁড়াল। দুটি ছেলেমেয়েই খুশির হাসি হাসছে। বোঝা গেল সালভার ভাই বোন। সালভা ওর বাবার সঙ্গে কথা বলতে লাগল। ফ্রান্সিসরা এসে ওখানে দাঁড়াল। সালভা বলল–ফ্রান্সিস–আমার বাবা ভাইবোন বেঁচে আছে। মূর সৈন্যরা আমাদের বস্তীতে আগুন লাগিয়েছিল। অনেকেই পালিয়ে এসে এখানে আশ্রয় নিয়েছে।
-তোমার মা? মারিয়া বলল।
কয়েক বছর আগে মাকে হারিয়েছি। সালভা বলল।
–বাবা–এখানে কোনো বৈদ্যি আছে?
হা হা। তোরা স্নানটান করে আয়–আমি বৈদ্যিবুড়োকে ডেকে আনছি। সালভার বাবা চলে গেল।
সালভার বোনটি তখনও মারিয়ার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে। মারিয়ার হাতে সারা মুখে আঁচড়ের মতো দাগ। জলকাদা মাখা পোশাক। মারিয়া বেশ অস্বস্তিতে পড়ল। চলল বাড়িগুলোর পেছন দিকে। সালভা বলল-ফ্রান্সিস চলো স্নান সেরে নিই।শরীরের যা অবস্থা। সালভা চলল–ঢালু উপত্যকার দিকে। ফ্রান্সিস শাঙ্কোও চলল। ওর পেছনে পেছনে নেমে আসতেই দেখল–দুতিনটে পাথরের গা বেয়ে ছোটো ঝর্ণার জল নেমে আসছে। ঝিরঝির ঝর্ণার জল পাথর-ঘেরা একটা জায়গায় হাঁটু অব্দি জমে আছে। ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো স্নান করতে লাগল। সালভার পিঠের চাবুকের ঘা তখনও তো সারে নি। সালভা হাঁটু পর্যন্ত ভালো করে ধুলো। মাথায় বুকে জল দিল। ঐ যা স্নান হল ওর।
স্নান সেরে ওরা ফিরে এলো। দেখল একটা ঘরের সামনে একটা পাথরের ওপর মারিয়া স্নান সেরে চাষি মেয়েদের পোশাক পরে বসে আছে। ওর সামনে দাঁড়িয়ে একজন বুড়ো। হাতের একটা পুঁটুলি খুলছে। বোঝা গেল–বৈদ্যিবুড়ো। একটা ছেঁড়া ন্যাকড়ায় বৈদ্যি একটা কাঠের বাটি ভর্তি জল তুলে নিল। পুঁটুলিটা জলে নাড়তে লাগল। আস্তে আস্তে জলের রঙ হলুদ হয়ে গেল। এবার বৈদ্যিবুড়ো ঐ পুঁটুলিটা মারিয়ার আঁচড় কাটা হাতে মুখে গলায় বুলোতে লাগল। কয়েকবার বুলোতেই মারিয়া হেসে ফ্রান্সিসের দিকে তাকাল। বলল–আঁচড়গুলোর জ্বালা অনেক কমে গেছে। মারিয়ার পর ফ্রান্সিসদেরও বদ্যিবুড়ো ওষুধ লাগিয়ে দিল। সবাইয়ের জ্বালা কমে গেল। সালভা পিঠের ঘা-এর কথা বলল। পোশাক খুলে দেখাল। বৈদ্যিবুড়ো ওষুধ তৈরি করতে বসল। ওদিকে বাড়ির মেয়েরা ফ্রান্সিসদের খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা করতে লাগল।
সালভাকে ওষুধ দিয়ে বৈদ্যিবুড়ো ওষুধের ঝোলা গোছাতে লাগল। ফ্রান্সিস বলল– সত্যি আপনার ওষুধে অনেক উপকার হল। জ্বালাভাবটা প্রায় নেই বললেই হয়। বদ্যিবুড়ো ফোকলামুখে হাসল। বলল–মরণজলার মতো লম্বা লম্বা ঘাস এখানে অনেক জায়গায় আছে। এই ঘাস শুকিয়ে ঘরের ছাউনিতে লাগে। ঘাস কাটতে গিয়ে ধারালো ধারগুলোয় লেগে হাতমুখ নখের আঁচড়ের মতো কেটে যায়। জ্বালা করে। এই ওষুধেই সেরে যায় সেসব।
তবে মরণজলার ঐ নাম হয়েছে কেন? ফ্রান্সিস জানতে চাইল। বৈদ্যিবুড়োর মুখ গম্ভীর হল। বলল –তোমরা ভিনদেশী জানো না। মরণজলার ঘাসের আঁচড় সেরে যায়। কিন্তু মরণজলার মারাত্মক জলকাদায় তুমি যদি একবার পড়ে যাও–ঐ আঁচড়কাটা জায়গা বিষিয়ে উঠে কিছুক্ষণের মধ্যেই তুমি জ্ঞান হারাবে–তারপর। বৈদ্যিবুড়ো চুপ করে গেল। তারপর আনমনে হেঁটে চলে গেল। সে কি! মারিয়া ভীত মুখে ফ্রান্সিসের দিকে তাকাল। ভয়ার্ত স্বরে বলল–ফ্রান্সিস–আমরা–মানে–আমরা– ফ্রান্সিস মারিয়ার দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসল। বলল–হ্যাঁ–আমরা বেঁচে আছি। শাঙ্কো দু’হাতে মুখ ঢেকে মাটিতে বসে পড়ল। কী সাংঘাতিক! মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছে ওরা।
ফ্রান্সিসরা সেই রাতটা ঐ চাষিদের বস্তিতেই কাটাল। ওদের একটা ঘর চাষিরা ছেড়ে দিয়েছিল।
পরদিন সকালে ফ্রান্সিস শাঙ্কোকে বলল সালভাকে ডেকে আনতে। সালভা এলো। দেখা গেল সালভা ওর তলোয়ার কাটা চাবুকে ছেঁড়া পোশাটা পাল্টে নতুন পোশাক পরেছে। ফ্রান্সিস বলল সালভা তোমার শরীর এখন কেমন? সালভা বলল–এমনিতে ভালোই। তবে বৈদ্যিবুড়ো বলল–পিঠের ঘা এখনো সম্পূর্ণ সারে নি। আর দু’দিন ওষুধ পড়লেই সেরে যাবে।
–কিন্তু আমরা তো বেশি দেরি করতে পারবো না। তাড়াতাড়ি জাহাজে ফিরতে হবে আমাদের। বন্ধুরা চিন্তায় পড়বে নইলে। ফ্রান্সিস বলল।
–ঠিক আছে। আপনারা এখন কি করবেন? জাহাজে ফিরে যাবেন? সালভা বলল।
