ছপ ছপ হাঁটুর নিচ অব্দি কাদাজলে ডুবে গেল সকলের। চারদিকে চাঁদের অনুজ্জ্বল আলো। এখানে অন্ধকার কাটেনি তাতে।
ফ্রান্সিস সামনে তাকিয়ে দেখল–লম্বা লম্বা বুনো ঘাসের জঙ্গল। আশ্চর্য!
ঘাসগুলো সবুজ নয়। মরা ঘাসের মতো হলুদ ঘাসের বনের এখানে-ওখানে ঘন কুয়াশা জমে আছে। বুনো ঘাসের জঙ্গলের উপরে কিছুই দেখা যাচ্ছেনা। সাদাটে কুয়াশা ঢাকা। বোঝাও যাচ্ছে না–এই বন কতদূর বিস্তৃত। ওদিকে দুর্গের মধ্যে মূর সৈন্যদের চিৎকার চাঁচামেচি কমে এসেছে। ফ্রান্সিস বলল–সালভা–মূর সৈন্যরা কি আমাদের ধাওয়া করতে পারে?
–পাগল হয়েছেন। এই মরণজলার কথা ওরা এরমধ্যেই ভালো করে জেনে গেছে। সালভা বলল।
–জলাটা কতদুর ছড়িয়ে আছে? ফ্রান্সিস বলল।
-বড়ো রাস্তা থেকে তো বহুদিন দেখে আসছি। জলাটা ডাইনে বাঁয়ে লম্বাটে। কিন্তু পাশে কম। উত্তরমুখো গেলে পার হতে কম সময় লাগবে। সালভা বলল। ফ্রান্সিস তলোয়ার হাতে ঘাসের বনের মধ্যে ঢুকতে ঢুকতে গলা চড়িয়ে বলল–উত্তরমুখো চলো। আমার পেছনে পেছনে এসো। সবাই ঘাসের বনে ঢুকল।
জলকাদা ভেঙে চলল। উঁচু উঁচু ঘাসের জঙ্গলে ওরা ঢাকা পড়ে গেল। শুধু মাথার ওপরে সাদাটে মেঘের আকাশ আর অনুজ্জ্বল চাঁদ। দিক ঠিক রেখে ফ্রান্সিস এগিয়ে চলল। পেছনে মারিয়া, শাঙ্কো, সালভা। কাদাজলের নীচে পাথরকুচি রয়েছে। ওরা এগিয়ে চলল। ফ্রান্সিস তলোয়ার চালিয়ে ঘাস কাটতে কাটতে এগিয়ে যেতে লাগল। তলোয়ারের কোপে হলুদ ঘাসগুলো বেশি কাটছে না। যতখানি কাটা পড়ছে তার মধ্যে দিয়েই ওরা চলল। শুধু জলকাদা ভাঙার ছপছপাৎ শব্দ। চারদিকে আর কোনো শব্দ নেই। চারপাশের ঘাসগুলো ওদের গায়ে মুখে হাতে ঘষে যাচ্ছে। ফ্রান্সিস হাতে জ্বালা। অনুভব করল। চাঁদের অল্প আলোয় দেখল-ধারালো ঘাসের ঘষায় হাত আঁচড়ে গেছে। সেই জায়গাগুলোয় জ্বালা শুরু হ’ল। মারিয়া বলে উঠল–ফ্রান্সিস হাতে-মুখে ভীষণ জ্বালা করছে। শাঙ্কো সালভাও বলে উঠল–হাতমুখ জ্বালা করছে। ফ্রান্সিস অস্পষ্ট চাঁদের আলোয় দেখল–মারিয়ার সারা মুখে ঘাসের আঁচড়ের দাগ। অল্প রক্তেরও দাগ এখানে-ওখানে। হাতে-মুখে জ্বালা সহ্য করতে করতে ফ্রান্সিস বুঝল–কেন এটাকে মরণজলা বলে।
জলকাদা ঠেলে চলতে চলতে তখন ভীষণ হাঁপাচ্ছে সবাই। একদিকে পা সাবধানে ফেলতে হচ্ছে। দু’হাতে সরাতে হচ্ছে ঘাসের বাধা। তারপর প্রায় অন্ধকারে হাঁটতে হচ্ছে। তার ওপর আঁচড়কাটা হাতে-মুখে জ্বলুনি।
কতদূর এলো। আরো কতদূর যেতে হবে কিছুই বুঝতে পারছে না ওরা। মারিয়া আর সহ্য করতে পারল না। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল–ফ্রান্সিস–সারা গা জ্বলে যাচ্ছে। ফ্রান্সিস হাঁটতে হাঁটতে বলল–ভাবো যে, দেশের রাজধানীর পাথরবাঁধানো পরিষ্কার পথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছো, দেখবে পারছো। মারিয়া মুখ দিয়ে শ্বাস নিতে নিতে এলোমেলো পা ফেলে চলল। আর পারল না। ভীষণ হাঁপাতে হাঁপাতে বলে উঠল–প্রান্সিস আমি পড়ে যাচ্ছি। ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে পড়ল। তলোয়ারটা কোমরে গুঁজল। দু’হাত নিচু করে একহ্যাঁচকা টানে মারিয়াকে তুলে কাঁধে শুইয়ে দিল। তারপর বাঁ হাতে মারিয়াকে চেপে ধরে হাঁটতে লাগল। আস্তে আস্তে সকলেরই সারা গায়ে জ্বলুনি শুরু হল। শাঙ্কো মুখ বুজে সহ্য করতে লাগল। একে সালভা চাবুকের মার খেয়ে আহত। বৈদ্যির ওষুধে একটু সুস্থ হয়েছিল। এখন এই পরিশ্রম সারা শরীরে জ্বলুনি। ওর মুখ থেকে গোঙানির শব্দ শোনা গেল। ফ্রান্সিস ডান হাত বাড়িয়ে সালভাকে চেপে ধরে রাখল যাতে পড়ে না যায়। সালভা এলোমেলো পা ফেলে চলল।
হঠাৎ ঘাসের জঙ্গল পাতলা হয়ে এলো। অল্পক্ষণের মধ্যেই পায়ের নীচে শক্ত পাথুরে জমি ঠেকল। সালভা অনেক কষ্টে সামনের দিকে তাকাল। ঘাসের বন শেষ। আবছা দেখল একটা ঘাসে ঢাকা টিলা। সালভা সমস্ত গায়ের শক্তি একত্র করে চিৎকার করে উঠল–ফ্রান্সিস–অমরা এসে গেছি। সামনে–টিলা।
আস্তে আস্তে হেঁটে ওরা পাথুরে জমিতে উঠল। প্রায় ভেঙে পড়া শরীর নিয়ে টলতে টলতে গিয়ে সালভা পাথুরে জমিতে শুয়ে পড়ল। শাঙ্কোও বসল। তারপর শুয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে কাঁধ থেকে মারিয়াকে নামিয়ে দিল। মারিয়া শুয়ে পড়ল। চোখ বোজা ফ্রান্সিস মারিয়ার এই অসাড় অবস্থা দেখে চমকে উঠল। ডাকল—মারিয়া?মারিয়া চোখ মেলে তাকাল। একটু হাসল। ফ্রান্সিস হেসে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর আস্তে আস্তে পাথুরে জমিতে বসে পড়ল। তাকিয়ে রইল মরণজলার দিকে। তারপর শুয়ে পড়ল।
পুব আকাশ লাল হয়ে উঠল। একটু পরেই সূর্য উঠল। আস্তে আস্তে রোদের তেজ বাড়তে লাগল। এতক্ষণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে শুয়ে থাকা ফ্রান্সিসরা যেন শরীরে একুট সাড় পেল। প্রথমে ফ্রান্সিসই উঠে বসল। দেখো রোদ পড়েছে টিলার গায়ে মরণজলায় দূরের দুর্গের মাথায়। হাতে মুখের জ্বালাভাবটা এখনও আছে। এ যে বাড়ে নি। ও তাকাল পায়ের দিকে। প্রায় হাঁটু পর্যন্ত জলকাদায় মাখামাখি। গায়ের পোশাকেও জলকাদার ছিটে। পায়ের কালো কাদা এখনও শুকোয় নি। শাঙ্কোদের দিকে তাকাল। ওদেরও এক অবস্থা। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে ডাকল–শাঙ্কো, সালভা–ওঠো। ডাক শুনে মারিয়া উঠে বসল। এবার শাঙ্কো আর সালভা উঠল। ফ্রান্সিস নিজের ঢোলা পোশাকটার মধ্যে ঢোলা গলা দিয়ে হাত ঢোকাল। নকশাটা বের করে আনল। যাক–নকশাটা ঠিকই আছে। জলকাদা লেগে আঁকা মুছে যায়নি।
