কালমা ছোটো বড়ো কাঠের থালায় খাবার নিয়ে এলো। মারিয়ার ঘরের দরজা খুলে দিল। মূর পাহারাদারটি খাবার দিল মারিয়াকে। কালমা ফ্রান্সিসদের ঘরের দরজা খুলে খাবার নিয়ে ঢুকল। কালমার কোমরের খাপে তলোয়ার গোঁজা। নিচু হয়ে কালমা থালা নামাচ্ছে তখনই ফ্রান্সিস চাপাস্বরে ডাকল–শাঙ্কো। কালমা সরে উঠে দাঁড়িয়েছে। শাঙ্কো এক লাফে ছুটে গিয়ে কালমার গলায় ছোরাটা চেপে ধরল। কালমা তো অবাক। ফ্রান্সিসও লাফিয়ে উঠে কালমার তলোয়ারটা এক হ্যাঁচকা টানে খুলে নিল। তলোয়ারের ডগাটা কালমার গলায় চেপে ধরল। দাঁতচাপাস্বরে বলল–টু শব্দটি করেছো কি মরেছো। শাঙ্কো ছোরা দিয়ে কালমার বর্মের চামড়ার ফিতে কেটে দিল। খোলা ভারী বর্মটা আস্তে আস্তে ঘাসের বিছানায় নামিয়ে রাখল যাতে কোনো শব্দ না হয়। খোলা পাথরের মেঝেয় পড়লেই শব্দ হত। পাশের ঘরের মূর পাহারাদারটি কানে শব্দ পৌঁছতো।
ফ্রান্সিস চাপাস্বরে বলল–শাঙ্কো–কালমাকে সামলাও। ফ্রান্সিস তলোয়ার নামাল। শাঙ্কো কালমার বুকে ছোরা চেপে ধরল।
ফ্রান্সিস কয়েদঘর থেকে বেরিয়ে এলো। পাথরের দেয়ালে গা ঘেঁষে মারিয়ার কয়েদঘরের দিকে চলল। আসতে আসতে দেখল সামনের চত্বরে কোনো সৈন্য নেই। চত্বরের পরে কাঠের সদর দরজার কাছে মশাল জ্বলছে। তার আলোয় দেখল কয়েকজন মূর সৈন্য দাঁড়িয়ে আছে।
মারিয়ার ঘরের দরজার কাছে উঁকি দিয়ে দেখল মূর পাহারাদারটি জল ঢেলে দিচ্ছে। মারিয়া আঁজলা ভরে জল খাচ্ছে। পাহারাদারটি বেশ তাগড়াই জোয়ান। ওর সঙ্গে তলোয়ারের লড়াই চালানো যাবেনা। শব্দ হবেই। লড়াই করতে করতেমূর পাহারাদারটিও দরজার কাছে দাঁড়ালো। মূর সৈন্যদের চেঁচিয়ে ডাকতে পারে। না–অন্যভাবে ওকে ঘায়েল করতে হবে যাতে টু শব্দটিও গলা দিয়ে না বেরোয়। দেয়ালের আংটায় আটকানো দুটো মশাল জ্বলছে। মশালের আগুন হাওয়ায় কাঁপছে। পাহারাদারটি ঘর থেকে বেরোলেই ওকে দেখে ফেলবে। ফ্রান্সিস পাথরের দেয়ালে যেন সেঁটে রইল। পাহারাদারটি মারিয়ার ঘর থেকে বেরিয়ে দরজাটা ভেজিয়ে দিচ্ছে তখনই ফ্রান্সিস এক লাফ দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল পাহারাদারটির ওপর। আচমকা প্রচণ্ড ধাক্কায় পাহারাদারটির লোহার দরজায় হুমড়ি খেয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে ওর মাথার পেছনে তলোয়ারের বাঁট দিয়ে জোরে ঘা মারল। পাহারাদারটি লোহার দরজায় ঘাড় গুঁজে পড়ল। তারপর জ্ঞান হারিয়ে বারান্দায় গড়িয়ে পড়ল। আর উঠল না! ফ্রান্সিস চাপাস্বরে ডাকল–মারিয়া। মারিয়া অবাক চোখে এই কাণ্ড দেখছিল। ডাক কানে যেতেই ছুটে বেরিয়ে এলো ঘর থেকে। দু’জনে ছুটে এলো শাঙ্কোদের ঘরে। ফ্রান্সিস হাতের ইশারায় শাঙ্কো আর সালভাকে ডাকল। কালমার পিঠে ছোরা চেপে ধরল শাঙ্কো। বলল, চলো। ওরা ঘর থেকে বেরিয়ে আসতেই ফ্রান্সিস আংটায় রাখা জ্বলন্ত মশালটা তুলে ছুঁড়ে ফেলল ঘাসের বিছানায়। শুকনো ঘাসে আগুন লেগে গেল।
বারান্দা দিয়ে নিঃশব্দে চলল ওরা। ফ্রান্সিস বারান্দার একটা জ্বলন্ত মশাল ছুঁড়ে ফেলল মারিয়ার কয়েদ ঘরটায়। ও ঘরেও আগুন লেগে গেল। অজ্ঞান মূর পাহারাদারটি তখনও বারান্দায় পড়ে আছে। ওকে ডিঙিয়ে পার হ’ল সবাই। এবার ফ্রান্সিস কালমার পিঠে তলোয়ারের ডগা ঠেকিয়ে বলল কালমা-মরণজলা দিয়ে পালাবো আমরা। মরণজলায় নিয়ে চলো। কালমা চমকে উঠল। ভয়ার্তস্বরে বলে উঠল–না-না-মরণজলা পার হতে পারবে না। মারা পড়বে।
-এখানে থাকলেও মরবো। ফ্রান্সিস বলল।
–কিন্তু–কালমা কী বলতে গেল।
–কোনো কিন্তু না। –তিনজন বন্দি ঐ পথে পালিয়েছিল। ফ্রান্সিস বলল।
–পরে ওদের কেউ দেখেনি। কালমা বলল।
–পলাতকরা কি পালানোর গপপো বলে বেড়ায়। নিশ্চয়ই ওরা পালাতে পেরেছিল। তাড়াতাড়ি চলো। ফ্রান্সিস তাড়া লাগাল।
ওদিকে কয়েদঘরে ধোঁয়া আগুন ততক্ষণে ছড়িয়ে পড়েছে। মূর সৈন্যরা হৈ হৈ করে উঠল। বারান্দার পরেই বাঁ দিকে অন্ধকার ঢালু পাথুরে জমি। ফ্রান্সিসরা সেই পাথুরে জমিতে ততক্ষণে নেমে পড়েছে। অল্প চাঁদের আলোয় ওরা দ্রুত চলেছে।
বেশ কিছুটা নেমে শুরু হল এবড়ো-খেবড়ো পাথর জংলা গাছ ঘাস ঢাকা জায়গা। কালমা সবার আগে নামতে লাগল। পেছনে ফ্রান্সিসরা। ওদিকে মূর সৈন্যদের হৈ হল্লা চলছে তখন। আগুন নেভানো চলছে। ফ্রান্সিস চাপাস্বরে বলল–কালমা জলদি।
একটু পরেই সামনে বিরাট দেয়াল। কালো রঙের পাথরের। কালমা দেয়ালের নীচে একটা ছোটো কাঠের দরজার সামনে এসে হাঁপাতে লাগল। দরজায় একটা তালা ঝুলছে। এখন হাঁপাচ্ছে সকলেই। অস্পষ্ট চাঁদের আলোয় কালমা চাবির গোল রিং-এ চাবি খুঁজতে লাগল। মারিয়ার দু’হাত তখনও বাঁধা। শাঙ্কো ছোরা দিয়ে তাড়াতাড়ি বাঁধা দড়ি কেটে দিল। মারিয়া মরণজলা কথাটা শুনে পর্যন্ত ভীষণ চিন্তায় পড়েছে। ও আর থাকতে না পেরে ফ্রান্সিসকে বলল–মরণজলা পার হতে পারবে?
–পারতেই হবে। নইলে এই দুর্গে পচে মরতে হবে। ফ্রান্সিস বলল। কালমার দুটো চাবি লাগল না। তার পরেরটা ঢুকিয়ে চাপ দিতেই কড়াৎ-তালা খুলে গেল। শাঙ্কো ছোটো দরজাটা খুলে দিল। প্রথমে শাঙ্কো ঢুকে গেল। তারপর সালভা মারিয়া। ফ্রান্সিস যখন ঢুকছে তখন শুনল কালমা বিড় বিড় করে বলছে–যীশু তোমায় রক্ষা করুন। ফ্রান্সিস একবার কালমার দিকে তাকিয়ে দরজা পার হল।
