মারিয়া নিজের কয়েদঘরে ঢুকে পড়ল। ফ্রান্সিসরাও নিজেদের ঘরে ঢুকল। শাঙ্কো প্রায় পিঠে করে সালভাকে নিয়ে ঢুকল। সালভা দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। শুয়ে পড়ল। কালমা দরজা বন্ধ করে দিল। ফ্রান্সিস ঘাসের বিছানায় শুয়ে পড়ল। বাঁধা হাত মাথার নীচে রাখল। অনেক চিন্তা মাথায়।
ঠাং-ঠঠাং শব্দ তুলে দরজা খুলে গেল। একজন পাকা দাড়ি গোঁফঅলা বৃদ্ধ ঢুকল। মাথায় হলদে কাপড়ের ফেট্টি। গলায় নীলরঙের পাথরের মালা। কাঁধে একটা ছোটো কাপড়ের বোঁচকামতো ঝোলানো। কালমা বলে উঠল–বৈদ্যি। বৈদ্যি বোঁচকা নামিয়ে বসল সালভার কাছে। সালভা উঠে বসল। বৈদ্যি ওর পিঠের দিকে পোশাকটা তুলল। দেখা গেল পিঠে চাবুকের কালশিটে দাগ। কয়েকটা জায়গা বেশ কেটে গেছে। চুঁইয়ে রক্ত পড়ছে। বৈদ্যি বোঁচকা থেকে একটা কাঠের ছোটো বাটি বের করে রাখল। শাঙ্কোর দিকে তাকিয়ে জল আনতে ইঙ্গিত করল। শাঙ্কো উঠে কোণা থেকে জল নিয়ে এলো। বৈদ্যি বোঁচকা থেকে একটা লাল কাপড়ের টুকরো বের করল। একটা কাঠের ছোটো লম্বা কৌটো বের করল। কৌটো থেকে কীসের গুঁড়ো নিয়ে জলে ফেলল। জলটা কালো হয়ে গেল। কাপড়ের টুকরোটা সেই জলে ভিজিয়ে সালভার ক্ষতস্থানে বুলিয়ে দিতে লাগল। সালভা প্রথমে একটু ঝাঁকিয়ে উঠল। তারপর চুপ করে রইল। কিছুক্ষণ ওষুধটা লাগাল বৈদ্যি। তারপর কী বলে চলে গেল। কালমা দরজায় তালা লাগাতে লাগাতে বলল-”বৈদ্যি আবার সন্ধেবেলা আসবে।
দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর ফ্রান্সিস নক্শাটা নিয়ে বসল। অনেকক্ষণ ধরে দেখে দেখে বুঝল যে জায়গাটা খুব কম টানে কাগজে আঁকা হয়েছে। সেই জায়গাটা রামন লাল আর সালভা দু’জনেরই খুব পরিচিত। জায়গাটা পালমার রাজপ্রাসাদেরই কোনো জায়গা। ফ্রান্সিস ডাকল–সালভা। সালভা শোয়া অবস্থায়ই ফ্রান্সিসের দিকে তাকাল। ফ্রান্সিস বলল–সালভা তোমরা কোথায় থাকতে? পড়শুনো করে?
–আলমুদাইলা রাজপ্রাসাদের দক্ষিণকোণে। সালভা বলল।
–রামন লালও কি ওখানেই থাকতেন? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
–হ্যাঁ–আরো কয়েকজন পণ্ডিতও থাকতেন। সালভা বলল।
তারাও কি রামন লালের মতোই পণ্ডিত ছিলেন? ফ্রান্সিস বলল।
–না-না। রামন লাল ছিলেন অলৌকিক শক্তির অধিকারী। দেশের লোক তার নাম দিয়েছিল–ডক্টর ইলিউমিনাডো।
–তাহলে তো এ দেশের খুব সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন তিনি। ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে বলল।
নিশ্চয়ই। সালভা বলল।
সন্ধে হ’ল। বৈদ্যি আবার এলো। ওষুধ দিয়ে গেল। ফ্রান্সিস বলল–সালভা– এখন কেমন লাগছে? সালভা দুপুর থেকেই উঠে বসে ছিল। হেসে বলল–অনেকটা ভালো।
রাত হতেই ফ্রান্সিস বেশ চঞ্চল হয়ে উঠল। ঘাসের বিছানায় পায়চারি করতে লাগল। শাঙ্কো বুঝল ফ্রান্সিস পালাবার ফন্দি আঁটছে। ফ্রান্সিস লোহার দরজার কাছে গেল। দেখল কালমা খোলা তলোয়ার হাতে বারান্দায় পাহারা দিচ্ছে। মারিয়ার ঘরের সামনেও একজন মূর পাহারাদার। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে ডাকল–
কালমা? কালমা এগিয়ে এলো।
–খেতে-টেতে দাও। ফ্রান্সিস বলল।
–এখনও সময় হয়নি। কালমা বলল।
কী মুস্কিল। ভীষণ খিদে পেয়েছে যে। ফ্রান্সিস বলল।
–হুঁ।কালমা মারিয়ার ঘরের দিকে গেল। ওখানকার মূর পাহারাদারটিকে কী বলল। চলে গেল। এবার ঐ পাহারাদারটি দুটো ঘরের সামনেই খোলা তলোয়ার হাতে পাহারা দিতে লাগল।
ফ্রান্সিস দেখল–মুস্কিল। এই মূরটাকে তো সরাতে হয়। ফ্রান্সিস দরজার কাছে মুখ নিয়ে নিজেদের দেশীয় ভাষায় চিৎকার করে বলল–মারিয়া শুনতে পাচ্ছো? মারিয়ার কানে ডাক পৌঁছল। ও চম্কে চেঁচিয়ে বলল–
–হ্যাঁ শুনতে পাচ্ছি। ফ্রান্সিস আবার চেঁচিয়ে বলল
–চিৎকার কান্নাকাটি জুড়ে দাও। তাড়াতাড়ি। মারিয়ার সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে উঠলো তারপরই গলা ছেড়ে কান্না জুড়ে দিল। মূর পাহারাদারটি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। ও কী করবে বুঝে উঠতে পারল না। ও জাতিতে মূর। ফ্রান্সিসদের কথার বিন্দুবিসর্গও বুঝল না। ও একবার ফ্রান্সিসদের ঘরের সামনে আর একবার মারিয়ার ঘরের সামনে ছুটোছুটি করতে লাগল। এবার ফ্রান্সিসদের শেখানোমতো সালভা আরবীতে বলল–শিগগির দেখো ঐ রাজকুমারীর কী হয়েছে? যদি রাজকুমারীর কিছু হয় আল আমিরি তোমার মুণ্ডু উড়িয়ে দেবে। পাহারাদারটি ছুটে গেল মারিয়ার ঘরের দিকে। এত জোরে মারিয়া জীবনেও চাঁচায়নি। ওর গলা ভেঙে গেল। তবু চাঁচাতে লাগল। কাঁদতে লাগল।
ফ্রান্সিস এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। চাপাস্বরে বলল শাঙ্কো-ছোরাটা। শাঙ্কো ছুটে এলো ফ্রান্সিসের কাছে। মাথাটা নিচু করল। ফ্রান্সিস ওর পোশাকের মধ্যে দিয়ে বাঁধা হাত দুটো গলিয়ে দিয়ে ছোরাটা বের করে আনল। শাঙ্কো ওর বাঁধা হাতদুটো এগিয়ে ধরল। ফ্রান্সিস বাঁধা হাতে দ্রুত শাঙ্কোর হাতবাঁধা দড়িতে ছোরাটা ঘষতে লাগল। তাড়াহুড়োয় ছোরার মুখটা এদিক-ওদিক সরে যেতে লাগল। ছোরার খোঁচা লেগে শাঙ্কোর হাত কেটে ছড়ে গেল। রক্ত বেরোলো। শাঙ্কো চুপ করে রইল। দড়ি বেশ কিছুটা কেটে যেতেই শাঙ্কো এক ঝটকা টানে দড়িটা ছিঁড়ে ফেলল। খোলা হাতে ফ্রান্সিসের হাতবাঁধা দড়ি কাটতে লাগল। এবার দড়ি তাড়াতাড়ি কেটে গেল। শাঙ্কো যখন সালভার হাতের দড়ি কাটছে তখন ফ্রান্সিস চেঁচিয়ে বলে উঠল–মারিয়া চুপ। মারিয়া কান্না চাঁচামেচি থামাল। ওদিকে দু’তিনজন সৈন্য ছুটে এসেছে মারিয়ার ঘরের সামনে। ওখানকার পাহারাদারটি হড়বড় করে সৈন্যদের কী বলল। ফ্রান্সিসরা লম্বা দড়ি হাতে পেঁচিয়ে চুপ করে ঘাসের বিছানায় বসে রইল। ও ঘরের পাহারাদারকে নিয়ে সৈন্য ক’জন ফ্রান্সিসদের ঘরের সামনে এলো। দেখল–কয়েদীরা শান্তভাবে বসে আছে। হাতে দড়ি বাঁধা। সৈন্য ক’জন চলে গেল। মূর পাহারাদারটি আবার খোলা তলোয়ার নিয়ে ঘুরে ঘুরে পাহারা দিতে লাগল।
