আমার কথাটা আগে শুনুন। তারপর আমাকে চাবুকমারতে চান মারবেন। ফ্রান্সিস বেশ দৃঢ়স্বরে বলল।
আল আমিরি আঙ্গুল তুলল। চাবুক মারা বন্ধ হল। ফ্রান্সিস একটু চুপ করে রইল। দেখল–সালভা পাথরের মেঝেয় হাঁটু গেড়ে বসে গোঙাচ্ছে। ফ্রাসিস বলল–রামন লাল অত্যন্ত অসুস্থ অবস্থায় সালভাদের ঘরে স্থান পেয়েছিলেন। মুমূর্ষ অবস্থায় তিনি সালভাকে একটা নকশা এঁকে দিয়েছিলেন। তারপরই বাকরোধ অবস্থায় তিনি মারা যান। ফ্রান্সিস থামল। শাঙ্কোকে বলল–জামার নিচ থেকে নক্শাটা বের করো। শাঙ্কো বাঁধা হাত ফ্রান্সিসের গলার কাছে জামার ফাঁক দিয়ে ঢুকিয়ে নকশাটা বের করে আনল। ফ্রান্সিস নকশাটা বাঁধা হাতে ধরে বলল–এই সেই নকশা। আমার দৃঢ় বিশ্বাস রামন লাল এইনশার মধ্যে সালভাকে হদিশ দিয়ে গেছেন–প্রথম পাণ্ডুলিপিটা তিনি কোথায় গোপনে রেখে দেশত্যাগ করেছিলেন। কারণ সালভা তার স্নেহাস্পদ শিষ্য ছিল। আল আমিরি একজন সৈন্যকে ইঙ্গিত করল। সৈন্যটি এসে ফ্রান্সিসের হাত থেকে নকশাটা নিয়ে আল আমিরিকে দিল। আল আমিরি খুব মনোযোগ দিয়ে নকশাটা দেখতে লাগল। তারপর কিছুই বুঝতে না পেরে বলল–এই নক্শার তো কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। তুই কী করে বুঝলি যে এটাতে গোপন পাণ্ডুলিপির হদিশ আছে? ফ্রান্সিস বলল–
দেখুন রামন লাল বুঝেছিলেন যে তার মৃত্যু আসন্ন। তখন তার বাকরোধ হয়েছে। সালভাকে যে মুখে কিছু হদিশ বলবেন তার উপায় ছিল না। প্রায় অসাড় হয়ে আসা হাতে বেশি আঁকাও সম্ভব ছিল না। তাই খুব ছোটো টানে নক্শাটা এঁকে দিয়েছিলেন। কোথাও কোথাও টান অস্পষ্ট হয়ে গেছে। আল আমিরি নক্শাটা আবার দেখতে লাগল। ফ্রান্সিস বলল–লক্ষ্য করুন নীচে একটা ছোটো চৌকোণোর মধ্যে হয়তো একটা বিন্দু বসাতে গিয়েছিলেন বা কিছু লিখতে চেয়েছিলেন। অসাড় হয়ে আসা হাতের কলমের টান বেঁকে নেমে এসেছে। আর আঁকতে পারেননি। আল মিরি ভালো করে নকশাটা দেখতে দেখতে বলল–তোর বুদ্ধি আছে দেখছি। ফ্রান্সিস বলল–আর একটা কথা। নকশাটার মধ্যে যে জায়গাটার ইঙ্গিত করা হয়েছে সেটা নিশ্চয়ই সালভার পরিচিত জায়গা। কারণ সালভাকেই তিনি হদিশটা দিয়ে গেছেন। আল আমিরি এবার একটু উঠে পাথরের আসনে ভালো করে বসল। বলল–তুই তো ভিনদেশী–পারবি এই নকশার নির্দেশ বের করতে?
–এখনই সেটা বলতে পারবো না। পালমার রাজপ্রাসাদে সালভা রামন লালের কাছে বেশ কয়েক বছর পড়াশুনো করেছে। এই পড়াশুনোর জায়গাটা রামন লাল যেখানে থাকতেন–মানে সেইসব জায়গাগুলো ভালো করে দেখতে হবে। এর জন্যে সালভাকে আমার সঙ্গে থাকতে হবে। ওর সাহায্য ছাড়া কিছুই করা যাবে না। ওকে নিয়েই আমাকে পালমার রাজপ্রাসাদে যেতে হবে। কারণ মৃত্যুকালে রামন লাল অনেক কষ্টে আলমুদাইলা মানে পালমার রাজপ্রাসাদের নাম বলেছিলেন।
–হুঁ। আল আমিরি একটু ভাবল। তারপর বলল–ঠিক আছে সালভা যাবে তোর, সঙ্গে। তোরা পাণ্ডুলিপিটি উদ্ধার করে গোপনে এখানে নিয়ে আসবি।
–আমি চেষ্টা করবো। ফ্রান্সিস বলল।
–কিন্তু একটা শর্ত আছে। আল আমিরি আবার পা ছড়িয়ে বসতে বসতে বলল।
ফ্রান্সিস বুঝল–আল আমিরি অত সহজে ওদের ছেড়ে দেবে না। আল আমিরি মারিয়ার দিকে ইঙ্গিত করে বলল।
–এ কে? ফ্রান্সিস বলল–আমাদের দেশের মাননীয়া রাজকুমারী।
–তা রাজপ্রাসাদ ছেড়ে এখানে এসেছে কেন? আল আমিরি বলল।
–আমি ওঁর স্বামী। তাই আমার সঙ্গে এসেছেন। ফ্রান্সিস বলল।
আল আমিরি এবার একটু ভদ্র হবার চেষ্টা করল। মুখে শব্দ করল। তারপর সেঁতো হাসি হেসে বলল–তোমরা যতদিন না পাণ্ডুলিপি উদ্ধার করে নিয়ে আসছো ততদিন তোমার স্ত্রী এখানে কয়েদঘরে বন্দি থাকবে। কী? রাজি?
ফ্রান্সিস এ ধরনের একটা কিছু আগে থেকেই আঁচ করেছিল।
ও বলল–বেশ, আমি আপনার শর্তে রাজি আছি।
মারিয়া চমকে উঠে ফ্রান্সিসের দিকে তাকাল। বলল–
-কী বলছো তুমি? শাঙ্কোও বলে উঠল–ফ্রান্সিস–এরকম একটা সাংঘাতিক শর্তে তুমি রাজি হলে? তোমার কি মাথা খারাপ হল? ফ্রান্সিস কোনো কথা বলল না।
আল আমিরি বলল–তোমরা কালকে পালমা রওনা হবে।
এবার আর একটা শর্ত–তোমরা কাউকে বলতে পারবে না যে আমি এই পালমা নোভার দুর্গ অধিকার করে এখানেই আছি। যদি বলো–
–ঠিক আছে। আমরা বলবো না–ফ্রান্সিস বলল–এবার আমাদের বাঁধা হাত খুলে দিতে বলুন।
–না এখন নয়–কালকে যখন রওনা হবে তখন। আল আমিরি বলল। ফ্রান্সিস। বলল–বেশ–কিন্তু আমার একটা অনুরোধ আছে।
–বলো। আল আমিরি বলল। মারিয়াকে দেখিয়ে ফ্রান্সিস বলল–
–রাজকুমারী মারিয়া কয়েদঘরের জীবনে অভ্যস্ত নন। মারিয়াকে দুর্গের অন্দরমহলে নজরবন্দি করে রাখুন–আপত্তি নেই।
–ভেবে দেখি–আল আমিরি বলল।
–সালভার চিকিৎসার ব্যবস্থা করবেন–আমার অনুরোধ–ফ্রান্সিস বলল।
–হুঁ। আল আমিরি মুখে শব্দ করল। ফ্রান্সিস বলল–এবার তাহলে নকশাটা দিন। ওটা নিয়ে তো আমাকে ভাবতে হবে। আল আমিরি নকশাটা একজন সৈন্যকে ইশারায় ডেকে দিল। ফ্রান্সিস নশাটা নিয়ে ফিরে দাঁড়াল। শাঙ্কো গিয়ে আহত সালভাকে বাঁধা হাতে কোনোরকমে উঠে দাঁড় করাল। নিজে নিচু হয়ে বসল। দু’হাত বাঁধা সালভাকে নিজের পিঠের ওপর ভর রাখতে বলল। সেইভাবে সালভাকে প্রায় পিঠে করে নিয়ে চলল।
মূর সৈন্যদের পাহারায় ওরা ঘরের বাইরে এলো। পাথুরে চত্বর দিয়ে চলল কয়েদঘরের দিকে। ফ্রান্সিস মারিয়ার থমথমে মুখের দিকে তাকাল। বুঝল–মারিয়া রাগ করেছে। হাঁটতে হাঁটতে আস্তে ডাকল–মারিয়া। মারিয়া বেশ বিরক্ত গলায় বলল–তোমার এক কোনো কথা আমি শুনতে চাই না। ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে বলল–সঠিক মুহূর্তে বুঝতে পারবে শর্তে রাজি হয়ে আমি ভুল করেছি না ঠিক করেছি। মাথা ঠাণ্ডা রাখো। এখন রাগারাগির সময় নয়। মারিয়া কিছু বলল না। হাঁটতে লাগল।
