–আমি জানি। এটা পাহাড়ি এলাকা। পাথরের কোনো গোপন ফাটল দিয়ে চুঁইয়ে চুঁইয়ে জল এসে জমা হয়। মাটির ভাগে মিশে কাদা তৈরি করে। ঠিক আছে বলো– ফ্রান্সিস বলল।
জলাভূমিটা লম্বা লম্বা ঘাসে ঢাকা। ঘাসগুলো কোনোদিন সবুজ হয় না। শুকনো হলুদ রঙের। কেউ এই জলার ধারেকাছে আসে না। ঘোড়া খচ্চরও এই ঘাস খেতে আসে না। দিনের আলোতেও জলাটার অন্ধকার ভাবটা কাটতে চায় না। কেমন ধোঁয়াটে সারা জলাভূমিটা। লোকে তাই এটাকে মরণজলা বলে। সালভা বলল।
–হুঁ, মরণজলা। ফ্রান্সিস চিন্তা করতে করতে বলল। তারপর শুয়ে পড়তে পড়তে বলল–রাত শেষ হয়ে এসেছে। ঘুমিয়ে নাও। বিশ্রাম চাই। শরীর ঠিক রাখো। শাঙ্কো আর সালভা শুয়ে পড়ল।
ঠঠাং-ঠং দরজা খোলার শব্দে ফ্রান্সিসের ঘুম ভেঙে গেল। দেখল–পাহারাদার খোলা দরজা দিয়ে ঢুকছে। হাতে একটা কাঠের বড় থালামতো। তাতে গোল কাটা রুটির টুকরো। অন্য ছোটো কানা উঁচু থালাটায় টুকরো আলু-ডুমুরের ঝোলমতো। পাহারাদার দুটো থালা ফ্রান্সিসদের সামনে শুকনো ঘাসের ওপর রাখল। ফ্রান্সিস উঠে বসল। বাঁধা হাত উঁচু করে দেখাল। পাহারাদার মাথা নাড়ল। স্পেনীয় ভাষায় বলল– হাত খোলার হুকুম নেই। বাঁধা হাত দিয়েই খেতে হবে। শাঙ্কো লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল। চিৎকার করে বলল–পেয়েছো কী? আমরা কি কুকুর বেড়াল? পাহাদার শাঙ্কোর দিকে তাকাল। কোনো কথা বলল না। শাঙ্কোর চিৎকার করে কথা বলা শুনে দু’জন মূর সৈন্য দরজায় এসে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস আস্তে বলল-শাঙ্কো মাথা গরম করো না। খেয়ে নাও। পেটপুরে খাও। শরীর ঠিক রাখো। শাঙ্কো বসল। তিনজনে খেতে লাগল রুটি ভেঙে ভেঙে। ঝোলটা ভালোই লাগল। খেতে খেতে ফ্রান্সিস পাহারাদারটিকে বলল– ভাই, তুমি তো মূরও নও। পাহারাদারটি মাথা নাড়ল।
–নাম কী তোমার? ফ্রান্সিস বলল।
–কালমা। পাহারাদারটি বলল। খাওয়া হয়ে গেছে। ঘরের কোণার রাখা পীপে থেকে কাঠের বাটিতে জল এনে ফ্রান্সিসদের কালমা জল খাওয়াল। কালমা এঁটো থালা নিয়ে চলে গেল। ঠ ঠঙাং দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
একটু বেলা হল। আবার দরজা খুলল কালমা। ঢুকল সেই লম্বামতো লোকটা। সালভাকে কী বলল। সালভা বলল–ফ্রান্সিস, আল আমিরির কাছে আমাদের হাজির করা হবে। সবাই উঠে দাঁড়াল। ফ্রান্সিসের চিন্তা–আল আমিরি কেমন লোক। সালভার ওপর রাগ আছে। কিন্তু আমাদের কী করবে? আটকে রাখবে না ছেড়ে দেবে?
লম্বা দড়িগুলো থেকে খুলে হাত বাঁধা অবস্থাতেই ফ্রান্সিসদের সামনে পেছনে খোলা তলোয়ার হাতে চারজন সৈন্য। একটু এগোতেই মারিয়ার কয়েদঘর। লোহার দরজার ফাঁক দিয়ে ফ্রান্সিস দেখল ঘাসের বিছানায় মারিয়া চুপ করে বসে আছে। ফ্রান্সিসদের পায়ের শব্দে মুখ তুলে তাকাল। ফ্রান্সিস দাঁড়িয়ে পড়ল। সালভাকে বলল-সালভা লোকটিকে বললো–মারিয়াও যাক আমাদের সঙ্গে। সালভা লোকটিকে বলল সেকথা। লোকটি মারিয়ার দিকে তাকাল। কী ভাবল। কালমাকে দরজা খুলে দিতে ইঙ্গিত করল। দরজা খোলা হল। মারিয়া বেরিয়ে এলো। বাইরের আলোয় ফ্রান্সিস দেখল মারিয়ার মুখ শুকিয়ে গেছে। হয়তো রাতে ঘুম হয়নি। ফ্রান্সিস মাথা নিচু করে এগোল। ভাবল মারিয়াকে না আনলেই ভালো হত। অন্ধকার থেকে হঠাৎ বাইরের উজ্জ্বল রোদে এসে ফ্রান্সিসদের তাকাতে অসুবিধা হচ্ছিল। চোখ কুঁচকে তাকাতে হচ্ছিল।
বাইরের চত্বরে নামল সবাই। চলল সামনের একটা কাঠের দরজার দিকে।
দরজা দিয়ে একটা বিস্তৃত ঘরে ওরা ঢুকল। দিনের বেলায়ও ঘরটা কেমন অন্ধকার। দেয়ালে মশাল জ্বলছে। একটা পাথরের লম্বাটে আসনে রঙচঙে কাপড় পাতা। দু’পা ছড়িয়ে একটু আয়েসী ভঙ্গীতে বসে আছে আল আমিরি। বেশ ফর্সা রঙ। চিবুকে সামান্য দাড়ি। লম্বা শক্তসমর্থ চেহারা। পরনে সাধারণ সাদাকালো রঙের জোব্বামতো। আল আমিরির চোখের দিকে তাকিয়ে ফ্রান্সিস বুঝল লোকটা ধূর্ত আর ক্ষমতালোভী। তার দু’পাশের ছোটো আসনে দু’জন আরবীয় বৃদ্ধ বসে আছে। বোধহয় আল আমিরির পরামর্শদাতা।
ফ্রান্সিসরা দাঁড়িয়ে রইল। লম্বা লোকটি আদাবের ভঙ্গীতে সম্মান জানিয়ে কী বলে গেল। আল আমিরি ভরাট গলায় ডাকল–সালভা? সালভা একটু মাথা নিচু করল। আল আমিরি স্পেনীয় ভাষায় বলল–তুমি খুব বেঁচে গিয়েছিলে। এবার আর তোমার বাঁচার আশা নেই। একটু থেমে বলল
–বল্ কোথায় আছে রামনের পাণ্ডুলিপি?
“আমি সত্যি জানি না সিনির (মহাশয়)। সালভা ভীতকণ্ঠে বলল। আল আমিরি ডান দিকে তাকিয়ে আঙ্গুল নেড়ে কী ইঙ্গিত করল। একটি খালি গা বলশালী মূর কালো লম্বা চামড়ার চাবুক শপাং-শপাং-প্রচণ্ড জোরে চাবুক চালাতে লাগল সালভার গায়ে। সালভা চিৎকার করে উঠল। চোখে জল এলো ওর। আল আমিরি হাত তুলল। বন্ধ হল। চাবুক মারা।
এবার বলো–নইলে–আল আমিরি গলা চড়াল। সালভা যন্ত্রণায় কেঁদে ফেলল। বলল–সেই পাণ্ডুলিপি কোথায় আমি জানি না। বিশ্বাস করুন–আমি সত্যি কিছু : জানি না।
–তুই রামনের মৃতদেহ নিয়ে গোর দিতে যাচ্ছিলি। তুই সব জানি। বল–। আল আমিরি বলে উঠল।
না-না। সালভা জোরে মাথা নাড়তে নাড়তে বলল–আমি কিছু জানি না। আবার আঙ্গুলের ইঙ্গিত। আবার চাবুকের মার। সালভার পিঠের দিকে পোশাক ছিঁড়ে গেল। রক্ত ফুটে উঠল পোশাকে। ও যন্ত্রণায় কাঁদতে লাগল। ফ্রান্সিসের আর সহ্য হল না। ও বাঁধা দু’হাত ওপরে তুলল। বলল–আমার অনুরোধ–সালভাকে চাবুক মারা বন্ধ করুন। আল আমিরি একবার ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে ফ্রান্সসের মুখের দিকে তাকাল। বলল তাহলে সালভার হয়ে তুই চাবুকের মার খাবি?
