সৈন্যদের দল থেকে একজন লম্বামতো সৈন্য খোলা তলোয়ার হাতে এগিয়ে এলো। ওর চিবুকে কোকড়া দাড়ি। সালভাকে দেখে হলদেটে দাঁত বের করে হাসল। কালো ঘামে ভেজা শরীরে জ্যোৎস্নার আলো পড়েছে। চক চক করছে যেন। বুকে বর্ম। লোকটা আরবী ভাষায় কী বলল। সাভা মাথা নিচু করল। কোনো কথা বলল না। এতক্ষণে মারিয়াকে দেখে লোকটা বেশ আশ্চর্য হল। আরো আশ্চর্য হল মারিয়ার হাঁটুর নীচে পর্যন্ত কাটা গাউন দেখে। সালভাকে কী জিজ্ঞেস করল। সালভা ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে বলল–জিজ্ঞেস করছে আপনারা কে? ফ্রান্সিস বলল–বলো যে আমরা ভাইকিং। আমরা লড়াই চাই না। সালভা বলল সেকথা। লোকটা সালভাকে কী বলল। তারপর তলোয়ার ঘুরিয়ে সবাইকে হাঁটবার ইঙ্গিত করল। সালভা ঐ লোকটার দিকে যেতে যেতে বলল–চলুন আমাদের দুর্গে যেতে হবে।
আগে পিছে মুর সৈন্যরা চলল। মাঝখানে ফ্রান্সিসরা। দু’পাশে ছাড়া ছাড়া গাছগাছালি। মাঝখানে ধুলোবালির পথ। হেঁটে চলল সবাই।
যেতে যেতে ফ্রান্সিসরা দেখল এখানে-ওখানে কিছু পাথরের ঘরবাড়ি। মাথায় বড়ো বড়ো বুনো ঘাসের ছাউনি। চাঁদের আলোয় একটু দূরেই দেখা গেল পাথরের দুর্গের কালো মাথা। একটা ছোটো টিলার ওপরে ঐ দুর্গা। দুৰ্গটা ঘিরে পাথর গাঁথা প্রাচীর। বেশ উঁচু।
ডানহাতি একটা পাথর গাঁথা পথ দুর্গের সদর দরজায় গিয়ে শেষ হয়েছে। ফ্রান্সিসরা গিয়ে দরজার সামনে দাঁড়াল। দুর্গের বিরাট কাঠের দরজায় একটা বড়ো পাল্লা ঘর ঘ শব্দ তুলে খুলে গেল। ভেতরে ঢুকল সবাই।
একটা চওড়া পাথর বাঁধানো চত্বর পেরিয়ে টানা বারান্দামতো। দুপাশে পাথুরে দেওয়ালের খাঁজে মশাল জ্বলছে। বারান্দা দিয়ে একটু যেতেই ডানদিকে একটা লোহার গরাদ বসানো ছোটো লম্বাটে দরজা। বোঝা গেল কয়েদঘর। কয়েদঘরের পারারাদার এগিয়ে এলো। ফ্রান্সিস দেখল পাহারাদারটি মূর নয়। গায়ের রং, চেহারা দেখে মনে হল এদেশীয়। একটু বয়েস হয়েছে লোকটার। সেই লম্বাটে লোকটার নির্দেশে পাহারাদার কোমর থেকে লোহার বড়ো গোল রিং-এর চাবির গোছা খুলল। ঘরটার বড়ো তালাটা খুলে লোহার দরজাটা খুলে দিল। লম্বা সৈন্যটি মারিয়ার দিকে তাকিয়ে চড়া গলায় কী বলল। মারিয়া বুঝল না। সালভা বলল–এই কয়েদঘরে আপনাকে থাকতে হবে। মারিয়া একবার ফ্রান্সিসের দিকে তাকাল। তারপর ঘরটায় ঢুকল। ফ্রান্সিস ভাবল আপত্তি করবে। মারিয়াকে ওদের সঙ্গেই রাখতে বলবে। কিন্তু লম্বা সৈন্যটির কঠিন মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝল–এ লোকটি কোনো ওজর আপত্তিতে কান দেবে না। তারপরের ঘরাটির তালা খুলল পাহারাদারটি। শাঙ্কোর তির-ধনুক একজন সৈন্য খুলে নিল। ফ্রান্সিসের তলোয়ারটাও সেই রেখেছেহাতে। ওদের ঘরটায় ঢুকিয়ে দেওয়া হল।ফ্রান্সিস সালভাকে বলল–ঐ সৈন্যটিকে বলো আমাদের কয়েক করা হল কেন? সালভা লম্বা সৈন্যটিকে বলল সেকথা। লম্বা সৈন্যটি ফ্রান্সিসের দিকে কড়া চোখে তাকাল। তারপর কী বলে উঠল। সালভা বলল কালকে আল আমিরির দরবারে হাজির করাবে আমাদের। তারপর উনি যা করেন। ফ্রান্সিস আর কোনো কথা বলল না। শুধু মারিয়া যাতে শুনতে পায়। সেভাবে চেঁচিয়ে বলল–মারিয়া কোন ভয় নেই। আমরা পাশের ঘরেই আছি।
এই ঘরটা বেশ বড়ো। মেঝে শুকনো ঘাস পুরু করে বিছানো। দু’পাশের পাথরের দেয়ালে পোঁতা দুটো লোহার আঙুটা থেকে লোহার শেকল ঝুলছে। শেকলের সঙ্গে বাঁধা লম্বা লম্বা দড়ি। আগে ছোটো দড়ি দিয়ে ফ্রান্সিসদের হাত বাঁধা হল। তারপর। শেকলের লম্বা দড়িগুলোর সঙ্গে বেঁধে দেওয়া হল আলাদা আলাদা ভাবে। ফ্রান্সিস ঘাসের বিছানায় শুয়ে পড়ল। শাঙ্কো সালভা ঘাসের বিছানায় বসে পড়ল। সৈন্যরা চলে গেল।
ফ্রান্সিস একটুক্ষণ চোখ বুজে শুয়ে রইল। তারপর চোখ খুলল। পাথুরে দেয়ালের আংটায় বসানো মশালের আলোয় ওপরের দিকে তাকাল। বেশ উঁচুতে পাথরের ছাত। দু’পাশে দুটো চৌকোণো মতো এবড়ো-খেবড়ো পাথরের ফোকর। অনেক উঁচুতে সেই গরাদহীন ফোকর। ওটার কাছে পৌঁছোনো অসম্ভব। চারপাশে তাকিয়ে দেখল–আরো শেকলবাঁধা আংটা রয়েছে। শাঙ্কো আস্তে ডাকল–ফ্রান্সিস? ফ্রান্সিস ওর দিকে তাকাল। শাঙ্কো বলল–এখান থেকে পালানো যাবে? শুধু তো আমরা নই। রাজকুমারীও রয়েছেন।
–দেখি–আগে। ক’জন পাহারাদার সৈন্য থাকে কতক্ষণ, পরপর পাহারাদার পালটায় কীভাবে খেতে দেয় তারপর ভাববো। সালভাকে বলল–সালভা এখানে অনেক বন্দি রাখা হয় তাই না?
রাজা জেমসের আমলে শত্রুপক্ষের বন্দি সৈন্যদের রাখা হত। এখন তো আল আমিরির দখলে। আল আমিরি অন্তত জনা পঁচিশেক বন্দিকে এখানে এনে রেখেছিল। দিন চার-পাঁচ আগে এক আরবী ব্যবসায়ী জাহাজ নিয়ে এসেছিল। ক্রীতদাস কেনাবেচা ওর ব্যবসা। আল আমিরি সব বন্দিকে বিক্রি করে দিয়েছিল। সালভা বলল।
বন্দিরা কেউ এখান থেকে পালাতে পেরেছিল? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
–হ্যাঁ, শুনেছি তিনজন বন্দিনাকি কীভাবে দুর্গের পেছনের মরণজলা দিয়ে পালাবার চেষ্টা করেছিল। শোনা যায় ওরা নাকি মরণজলাতেই মারা গেছে। সালভা বলল।
ফ্রান্সিস দ্রুত উঠে বসল। বলল–মরণজলাটা কী? সালভা বলল–কে জানে কেন এই দুর্গের পেছনেই আছে একটা জলাভূমি।
–খুব বড়ো? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
-না, না, তবে কী করে যে এই জলায় জল আসে–কাদা থাকেনা মেরীই জানেন। বলল সালভা।
