জীবন এই পোশাকের চেয়ে অনেক বেশি দামি আর অনেক সুন্দর বেঁচে থাকা। মারিয়া হেসে বলল। ফ্রান্সিসও হাসল। কিছু বলল না। একটু পরে দু’জনে অসুস্থ হ্যারিকে দেখতে গেল। হ্যারি এখন অনেকটা সুস্থ। জ্বর কমেছে। তবুঅভিযানে যাবার মতো সুস্থ ) হয়নি শরীর।
রাত একটু বাড়তে ফ্রান্সিস তৈরি হল। পোশাক পরে কোমরে চামড়ার ফেট্টিতে তলোয়ার গুজল। মারিয়া কাটা গাউনটা পরল। পোশাকটা না হল গাউন না হল ফ্রক। ধনুক তুনীর ঝুলিয়ে শাঙ্কো এলো। ওর কোমরে একটা ধারালো ছোরা। ছোরাটা ও সবসময়ে কোমরে গুঁজে রাখে। সালভাও এলো। বৈদ্যির ওষুধ লাগিয়ে ওর বুকের ক্ষমতা শুকিয়ে এসেছে।
জাহাজ থেকে ঝোলানো দড়ি ধরে ধরে নৌকোয় নামল ওরা।ফ্রান্সিসদাঁড় বাইতে লাগল। শাঙ্কো একা দাঁড় হালের মতো ধরে বসে রইল। নৌকোর ভেতরে বসল মারিয়া আর সালভা। চাঁদের আলোয় ফ্রান্সিস দেখল জাহাজের রেলি ধরে ওদের দিকে তাকিয়ে আছেবিস্কো আর কয়েকজন বন্ধু। আবার বন্ধুদের সঙ্গে কবে দেখা হবে। ফ্রান্সিসদের মনটা একটু উদাস হল। পরক্ষণেই এসব ভাবনা মন থেকে সরাল। জোরে দাঁড় বাইতে লাগল।
একসময় তীরে পৌঁছল ওরা। আগের সেই ছোট্ট খাঁড়ির মধ্যেই নৌকোটা ঢোকাল ফ্রান্সিস। একটু গিয়ে ওরা একে একে নৌকো থেকে তীরের বালিয়াড়িতে নামল। কালকে দেখা সেই জাহাজটা তেমনি দাঁড়িয়ে আছে। ফ্রান্সিস বলল–সালভা ঐ জাহাজটা কাদের?
আল আমিরি এই জাহাজেই সৈন্য আর একদল বন্দি নিয়ে এসেছিল। সালভা। একটু থেমে বলল–গভীর রাত্রে দুর্গের রাজার সৈন্যরা কিছু বোঝবার আগেই প্রচণ্ড আক্রমণ করল। রাজা জেমসের সৈন্যরা বাধা দিল। কিন্তু আল আমিরির মূর সৈন্যদের কাছে ওরা দাঁড়াতেই পারল না। মূরদের কাছে ছিল চামড়ার ফিতের গুলতির মতো স্লিং। ঐ স্লিং দিয়ে পাথরের বক্সে বড় টুকরো ছুঁড়ে ওরা সহজেই দুর্গের সৈন্যদের কাবু করে ফেলল। হেরে গেল রাজা জেমসের সৈন্যরা। সালভা থামল।
জাহাজটা কালকেও দেখেছি জনশূন্য। শাঙ্কো বলল।
–হ্যাঁ, জাহাজটায় কেউ থাকে না। সবাই দুর্গে থাকে। সালভা বলল। জাহাজটা বেশ দূরে। চাঁদের আলোয় অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
সামনে সালভা। পেছনে ফ্রান্সিসরা। বালির ওপর দিয়ে হেঁটে চলল। চারপাশ নিস্তব্ধ। শুধু বাতাসের শব্দ আর সমুদ্রের ঢেউ ভেঙে পড়ার মৃদু শব্দ।
ফ্রান্সিসহাঁ টতে হাঁটতে জাহাজটার দিকে ভালো করে নজর বুলোল। বলল–সালভা জাহাজটায় গতরাতে দু-একটা আলো দেখেছিলাম। আজকে দেখছি সব অন্ধকার। মারিয়া বলল–গতরাতে জাহাজটা থেকে কিন্তু কোনো পাটাতন তীরের বালিতে ফেলা ছিল না। আজকে একটা কাঠের পাতাটন ফেলা রয়েছে।
–হুঁ, দেখছি তাই। ফ্রান্সিস একটু চিন্তিতস্বরে বলল। তারপর চারদিক তাকিয়ে দেখতে দেখতে হাঁটতে লাগল। নাঃ, কোথাও কোনো জনপ্রাণীর দেখা নেই।
বেশ কিছুক্ষণ হাঁটার পর দেখা গেল কিছু ছাড়া ছাড়া গাছগাছালি। বাতাসে গাছের পাতায় শব্দ হচ্ছে। তার নীচে পরপর কিছু পাথরের বাড়িঘর। কাছে এসে দেখা গেল সব বাড়িঘর আগুনে পোড়া। পাথন বসানো থামগুলো পুড়ে কালো হয়ে গেছে। ছাত বলে কিছু নেই। সব পুড়ে গেছে। সালভা দাঁড়িয়ে পড়ল। বস্তীর পোড়া ঘরবাড়ি দেখল। তারপর এগিয়ে চলল। পেছনে ফ্রান্সিসরা। কয়েকটা পোড়া বাড়িঘর পার হয়ে একটা পোড়া ঘরে ঢুকল সালভা। ফ্রান্সিসরাও ঘরটায় ঢুকল। এবড়ো-খেবড়ো পাথুরে দেয়াল পুড়ে কালো হয়ে গেছে। সালভা মেঝে থেকে পোড়া কাঠের ডাল সরিয়ে উবু হয়ে বসল। বালি সরাতে লাগল। একটা পাথরের ছোটো পাটাতন। তুলে ফেলল ওটা। একটু একুট ছাই-রঙা গোটানো কাগজ বের করল। হেসে বলল–যা নকশাটা পুড়ে যায়নি। নকশাটা খুলে দেখে নিঃশব্দে ফ্রান্সিসকে দিল। ফ্রান্সিস হাতে নিয়ে দেখতে লাগল। মাথার ওপরে ছাত তো নেই। চাঁদের আলো পড়েছে। ফ্রান্সিস কাগজটার সবটা ছড়িয়ে দেখতে লাগল। কালিতে মোটা টানে রামন লালের নিজের হাতে আঁকা নকশা।
ফ্রান্সিস খুব মনোযোগ নিয়ে নকশাটা দেখতে লাগল। মারিয়াও মুখ বাড়িয়ে দেখতে লাগল।শাঙ্কোও একনজর দেখে নিল। সালভা একটু হতাশ স্বরে বলল–মুমূর্ষ অবস্থায় আঁকা এই নকশাটা দেখে রামন লালের প্রথম পাণ্ডুলিপি বের করতে পারবেন? শাঙ্কো বলল–ভাই এর নাম ফ্রান্সিস। কত নকশা, ছড়া ছবির অর্থ বের করেছে ফ্রান্সিস। দেখে–এটারও রহস্য ভেদ করবে। সালভা আর কিছু বলল না।
হঠাৎ রাতের নৈঃশব্দ ভেঙে দিল একটা তীক্ষ্ণ শব্দ। ভীষণ চমকে উঠে সালভা বলল মূর সৈন্যরা আক্রমণ করার আগে মুখে এরকম শব্দ করে। হঠাৎ ধূপ ধাপ শব্দ শোনা গেল। একদল লোকের ছুটে আসার শব্দ। ফ্রান্সিস দ্রুত হাতে নটা ঢোলা জামার মধ্যে গলার কাছ দিয়ে ঢুকিয়ে দিল। শাঙ্কোও কোমর থেকে ছোরাটা বের করে জামার মধ্যে ঢুকিয়ে রাখল। শাঙ্কো ধনুকে তির পরাল। ফ্রান্সিস এক ঝটকায় তলোয়ার খুলল।
চাঁদের আলোয় দেখা গেল পোড়ো বাড়িটার চারপাশ ঘিরে মূল সৈন্যরা খোলা তলোয়ার হাতে দাঁড়িয়ে আছে। শাঙ্কো ধনুকে তির পরিয়ে ছিলা টানল। লক্ষ্য সামনের মূল সৈন্যটা। ফ্রান্সিস বলল–ধনুক নামাও। ফ্রান্সিস পোড়া ঘরটা থেকে বাইরে এলো। পেছনে মারিয়া শাঙ্কো আর সালভা। সালভার মুখ ভয়ে সাদা হয়ে গেছে। ফ্রান্সিস হাতের তলোয়ার বালির ওপর ফেলে দিল। কোন শব্দ হল না। শাঙ্কো ধনুক বালিতে নাময়ে রাখল।
