একটু পরে হ্যারি চোখমুখ কুঁচকে বিস্কোর দিকে পাশ ফিরল। বলল–বিস্কো– ফ্রান্সিস এখন দেশে ফিরতে রাজি নয়। বিস্কো বেশ আশ্চর্য হল। বলল, কেন?
–সে অনেক কথা। ফ্রান্সিস বলবে সব। হ্যারি বলল। হ্যারির অসুখের কথা শুনে কয়েকজন ভাইকিং বন্ধু হ্যারির কেবিনঘরে এলো। একজন ছুটলো ফ্রান্সিসকে খবর দিতে। একটু পরেই ফ্রান্সিস আর মারিয়া এলো। ফ্রান্সিস হ্যারির কপালে হাত দিল। বুঝল বেশ জ্বর। মারিয়াকে বলল সে-কথা। মারিয়া ঘরের চারদিকে তাকাল। ছেঁড়া কাপড়-টাপড় কিছু দেখল না। তখন নিজের পোশাক থেকে কিছুটা ছিঁড়ে নিল। কাঠের গ্লাসে জল ভরে নিয়ে এলো। কাপড়ের টুকরো জলে ভিজিয়ে হ্যারির পাশে বসল। হ্যারির জ্বরতপ্ত কপালে জলপট্টি দিতে লাগল। বিস্কোকে বলল–দরজা সবটা খুলে দাও। আধ ভেজানো দরজা সবটা খুলে দিতেই সমুদ্রের জোর হাওয়া ঢুকল। ঘরের গুমোট ভাবটা কাটল।
দুপুরে স্নান খাওয়া সেরে ফ্রান্সিসরা আবার এলো। মারিয়া জলপট্টি দিতে লাগল।
বিকেল হল। মারিয়া মাঝে মাঝে হ্যারির মাথায় গলায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। হ্যারি চোখ খুলে তাকাল। চোখের লালভাব অনেকটা কম। ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে হ্যারি শুকনো ঠোঁটে হাসল।
–এখন কেমন বোধ করছো? হ্যারির মুখের কাছে ঝুঁকে ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল।
-জ্বর কমেছে। ভালো লাগছে–হ্যারি আস্তে আস্তে বলল–তুমি এখন কী করবে বন্ধুদের বলো।
-ও-হ্যাঁ। ফ্রান্সিস সোজা হয়ে বসল। বিস্কোর দিকে তাকিয়ে বলল
সব বন্ধুদের সন্ধেবেলা ডেক্-এ আসতে বলো। আমার কিছু বলার আছে।
–বেশ-খবর দিচ্ছি। বিস্কো বলল।
সন্ধে হল। ভাইকিং বন্ধুরা ডেক্-এ এসে জমায়েত হল। ফ্রান্সিস এখন কী করবে তাই নিয়ে ওরা পরস্পর কথা বলতে লাগল। একটু পরে ফ্রান্সিস মারিয়াকে নিয়ে ডে এ এলো। বন্ধুদের গুঞ্জন থেমে গেল। আকাশে চাঁদ একটু উজ্জ্বল। জ্যোত্মা পড়েছে শান্ত সমুদ্রের জলে জাহাজে। হাওয়ার তেমন জোর নেই। ফ্রান্সিস একটু গলা চড়িয়ে বলতে লাগল–ভাইসব–সামনে যে ডাঙা দেখা যাচ্ছে–এটা একটা ছোটো বন্দর নাম পালমা নোভা। মাজোরকা দ্বীপের বন্দর। রাজধানীর নাম পালমা। সেটা দূরে। এবার ফ্রান্সিস সালভার কথা, আল আমিরির কথা, রামন লালের পাণ্ডুলিপির কথা, নকশার কথা বলল। তারপর বলল–আমার আপন ভাইয়ের মতো হ্যারি অসুস্থ। আমার মন ভালো নেই। তবু আমাকে যেতেই হবে। তোমরা হ্যারিকে দেখবে। স্থির করেছি আমি, মারিয়া আর শাঙ্কো ঐ দ্বীপে যাবো। রামন লালের প্রথম পাণ্ডুলিপি খুঁজে বের করব। ফ্রান্সিস থামল। সবাই তখন ভাবছে ফ্রান্সিসের কথাগুলো। বিস্কো বলল কী আছে ঐ পাণ্ডুলিপিতে?
-সাধারণ সীসে দস্তা পারদকে সোনায় রূপান্তরিত করার সূত্র লেখা আছে ঐ পাণ্ডুলিপিতে। ফ্রান্সিস বলল। একজন ভাইকিং বন্ধু বলল–
–ফ্রান্সিস এটা কি সম্ভব?
–এই বিষয়টিকে বলে অ্যালকেমি অর্থাৎ অপ-রসায়ন। পাণ্ডুলিপির সূত্রগুলো পেলে প্রক্রিয়া বের করে হয়তো কোনো রসায়নবিদ কিছু করতেও পারেন। আমার লক্ষ্য ঐ প্রথম পাণ্ডুলিপি খুঁজে বের করা। তারপর ঐ দ্বীপের রাজা তৃতীয় জেমসকে দিয়ে দেওয়া। অ্যালকেমি নিয়ে আমার কোনো আগ্রহ নেই।
–কিন্তু একটা কাগজের পাণ্ডুলিপি তো সোনা মুক্তোর মতো মূল্যবান কিছু নয়। একজন ভাইকিং বন্ধু বলল।
ঠিক। কিন্তু তোমরা তো জানো–গুপ্ত সম্পদ বা গুপ্ত পাণ্ডুলিপির ওপর আমার বিন্দুমাত্র লোভ নেই। আমি ভালোবাসি দুর্জয় সংকল্পকে বীরত্বকে সাহসকে এবং বুদ্ধির খেলাকে। ফ্রান্সিস বলল।
–তোমরা তিনজন কি পারবে? বিস্কো বলল।
–দেখা যাক। আমরা চলে গেলে তোমরা দিনকয়েক অপেক্ষা করো। যদি আমরা না ফিরি তাহলে আমাদের খুঁজতে দ্বীপে নামবে। ফ্রান্সিস বলল।
ভাইকিংদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হল। ফ্রান্সিসরা না ফেরা পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হবে। দেশের দিকে জাহাজ চালানো যাবে না। আবার এটাও ওরা ভালো করেই জানে ফ্রান্সিসকে কোনোভাবেই সঙ্কল্পচ্যুত করা যাবে না। আস্তে আস্তে গুঞ্জন থামল। বিস্কো। গলা চড়িয়ে বলল- ফ্রান্সিস আমরা তোমাদের ছেড়ে দেশে ফিরবো না। সব ভাইকিংরা সমর্থনের ধ্বনি তুলল–ও-হো-হো। ফ্রান্সিস হাসল। সভা শেষ হল। সবাই চলে যেতে লাগল। ফ্রান্সিসও মারিয়াকে নিয়ে নিজেদের কেবিন-ঘরে ফিরে এলো। ফ্রান্সিসের মনে সংশয় ছিল হয়তো মূল্যহীন একটা পাণ্ডুলিপির জন্যে বন্ধুরা অপেক্ষা করবে কিনা। ওরা তো অনেকদিন দেশ ছাড়া। কিন্তু বন্ধুরা অপেক্ষা করতে রাজি হওয়ায় ফ্রান্সিসদের সংশয় দূর হল। ও খুশি হল।
রাতের খাওয়া শেষ হল। ফ্রান্সিস ওদের কেবিন-ঘরে আস্তে আস্তে পায়চারি করছে। ভাবছে–কেমন সেই রামন লালের নকশা। কে জানে–মুমূর্ষ রামন লাল ঐ নকশায় গুপ্ত পাণ্ডুলিপির হদিশ কিছু দিয়েছে কিনা। তখনি দেখল মারিয়া বিছানায় বসে ওর একটা গাউন কঁচি দিয়ে কাটছে। ফ্রান্সিস দাঁড়িয়ে পড়ল। বেশ আশ্চর্য হয়ে বলল পোশাকটা কাটছো কেন? মারিয়া কঁচি চালাতে চালাতে মুখে একটু গম্ভীরভাব এনে বলল–ফ্রান্সিস–আমরা একটা অভিযানে যাচ্ছি, নাচের আসরে যাচ্ছি না। কাজেই গাউনের ঝুলটা কেটে ছোটো করছি যাতে দরকার পড়লে সহজে ছুটোছুটি করতে পারি।
-কিন্তু অমন সুন্দর দামি পোশাকটা
