–ওটা আমি ঘরে বালির মধ্যে পাথরের পাটাতন দিয়ে চাপা দিয়ে রেখেছি। ঘর তো পুড়ে গেছে। জানি না নকশাটাও পুড়ে গেছে কিনা। সালভা বলল।
না–পোড়ে নি–মারিয়া বলল–আগুনে বালি পোড়ে না বরং বালি আগুন নেভায়। ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে বিছানা থেকে নামল। ধীর পায়ে মেঝেয় পায়চারি করতে লাগল। ওর মাথায় ঘুরছে–নকশারামন লালের প্রথম পাণ্ডুলিপি। হ্যারি বলল– সালভার পরে কী ঘটলো বলো। সালভা বলতে লাগল–আমি কী করবো বুঝে উঠতে পারলাম না। রামন লালের মতো একজন শ্রদ্ধেয় দেশবরেণ্য মানুষকে সমাধিস্থ করবো এরকম একটা অখ্যাত জায়গায়? কিছুতেই মন মানল না। পরদিন ভোরেই বন্ধুদের সাহায্যে মৃতদেহ দুটো খচ্চরে টানা শস্যবওয়া গাড়িতে তুললাম। নিজেই চালিয়ে নিয়ে চললাম রাজধানী পালমার দিকে। দুর্গের পাশ দিয়ে রাস্তা। যাচ্ছি। কয়েকজন মূর সৈন্য ঘিরে ধরলো। ওরা কাউলে পালমা যেতে দিচ্ছে না। পাছে দুর্গ দখলের খবরটা রাজার কানে ওঠে। ওরা মৃতদেহ দেখল। ওদের মধ্যে একটি সৈন্য রামন লালকে চিনে ফেলল। ওরকম একজন খ্যাতিমান মানুষকে না চেনাই অশ্চর্য। খবর গেল দুর্গে। আল আমিরি ঘোড়ায় চড়ে এলো। মৃতদেহ দেখেই চিনল। সেনাপতিও এসেছে পেছনে পেছনে। সেনাপতিকে বলল মৃতদেহের পোশাক খুঁজে দেখতে। দামি কিছু আছে কিনা। সেনাপতি খুলে নিল গলায় ঝোলানো সোনার কুশটা আঙ্গুলের হীরের আংটি। এক পকেট থেকে পূর্বদেশীয় কিছু মোহর। এবার ঝোলা পকেট থেকে বের করল পাণ্ডুলিপিটা। আল আমিরি পাণ্ডুলিপিটা হাতে নিল। এক পাতা পড়ে আমাকে বলল–এটা পড়েছিস্ তুই? বললাম হ্যাঁ।
–অ্যালকেমির সূত্র আছে এতে? আল আমিরি বলল। বুঝলাম আল আমিরিকে যতটা অশিক্ষিত ভেবেছিলম সে ততটা অশিক্ষিত নয়। রামন লালের পাণ্ডুলিপিতে অ্যালকেমির সূত্র আছে এটা সে জানে। বললাম–
“জানি না। আল আমিরি তলোয়ারের হাতির দাঁতে বাঁধানো হাতলে হাত দিল। চিৎকার করে বলল–
–সত্যি কথা বল্। বললাম–শেষ পাতায় শুধু লেখা আছে যে প্রথম পাণ্ডুলিপিতে সূত্রগুলো লেখা আছে। আল আমিরি দ্রুত হাতে পাতা উলটিয়ে শেষ পাতাটা পড়ে ফেলল। বলল–প্রথম পাণ্ডুলিপি কোথায়?
–সে আমি জানি না। আমি বললাম।
–রামন লাল তোকে কোনো হদিশ দিয়ে যায় নি? আল আমিরি বলল।
–না। আমি বললাম। আল আমিরি বিশ্বাস করল না।
ঝনাৎ করে তলোয়ার কোষমুক্ত করল। আমার মাথার ওপর তলোয়ার উঁচিয়ে ধরে বলল–মিথ্যে কথা। বল্ কোথায় সেই পাণ্ডুলিপি?
–আমি সত্যি জানি না। কথাটা বলতেই তলোয়ারটা রোদে ঝলসে উঠে দ্রুত আমার বুক ছুঁয়ে গেল। পোশাক কেটে গেল। বুক লম্বালম্বি কেটে গেল। রক্ত পড়তে লাগল।
–বল–আবার তলোয়ার তুলল আল আমিরি। বুঝলাম বাঁচতে হলে অন্য পথ নিতে হবে। বললাম হ্যাঁ, মৃত্যুর সময় রামন লাল, আমাকে একটা নক্শামতো এঁকে দিয়ে গেছেন। আল আমিরি বলল–কোথায় সেটা? বললাম–আমার ঘরে রেখে এসেছি। আল আমিরি তলোয়ারের ইঙ্গিতে তিনজন সৈন্যকে বলল–তোরা ওর সঙ্গে যা। ও যা দেবে নিয়ে আসবি। ওকেও সঙ্গে নিয়ে আসবি। খবরদার–পালায় না যেন। সালভা তামল। ফ্রান্সিস পায়চারি থামিয়ে বলল–শোন সালভা–আজ রাতে তোমার পোড়া ঘরে যাবো। নক্শাটা পেলে রামন লালের প্রথম পাণ্ডুলিপিটা উদ্ধার করবো। মারিয়া বলে উঠল–কিন্তু আমরা তো দেশে ফিরবো এখন। ফ্রান্সিস ঘুরে দাঁড়িয়ে মারিয়ার মুখের দিকে তাকাল। আস্তে বলল–ঠিক আছে। তোমরা জাহাজ নিয়ে চলে যাও। আমি, হ্যারি আর শাঙ্কো এই মাজোরকা দ্বীপে থাকবো। পাণ্ডুলিপি খুঁজে বের করবো। মারিয়া বুঝল– ফ্রান্সিস যা করবে স্থির করে তা করবেই। মৃদুস্বরে মারিয়া বলল–আমাকে মাফ করো ফ্রান্সিস। অনেকদিন দেশ ছাড়া তাই আমি তোমার সঙ্গেই থাকবো।
হ্যারি আর সালভা নিজেদের কেবিনে চলে গেল। ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে কেবিন ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে লাগল।
দুপুরের দিকেই হ্যারি বুঝতে পারল–জ্বর আসছে। গতকাল থেকেই শরীরটা ভালো লাগছিল না। অল্পক্ষণের মধ্যেই জ্বর বাড়লো। কপালে দপদপানি শুরু হল। শরীরের গাঁটে গাঁটে মোচড়ানো ব্যথা।বিস্কো বা অন্য ভাইকিং বন্ধুরা তখনও জানেনা-ফ্রান্সিসের নতুন সংকল্পের কথা। বিস্কো হ্যারির কাছে জানতে এলো এবার দেশের দিকে জাহাজ চালাবে কিনা। দেখল হ্যারি চোখ বুজে শুয়ে আছে। ভাবলো–ঘুমুচ্ছে বোধহয়। বিস্কো বিছানায় বসে ডাকলো–হ্যারি? হ্যারির কোনো সাড়া শব্দ নেই। বিস্কো হ্যারির কাঁধে হাত রেখে ডাকতে গেল। চমকে উঠল। হ্যারির গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে যেন। বিস্কো বিছানা থেকে দ্রুত উঠে দাঁড়াল। হ্যারির কপালে গলায় হাত রাখল। ভীষণ জ্বর। একে শরীরের দিক থেকে হ্যারি বরাবরই দুর্বল। রিস্কো বেশ ঘাবড়ে গেল।তাড়াতাড়ি হ্যারিকে আস্তে ধাক্কা দিল। ডাকল–হ্যারি? হ্যারি চোখ মেলে তাকাল। দু’চোখ বেশ লাল। বিস্কো আর দাঁড়াল না। ওদের বৈদ্যি বন্ধুকে ডাকতে ছুটল।
অল্পক্ষণের মধ্যেই বৈদ্যি ওষুধের পুঁটুলি, একটা বোয়াম নিয়ে এলো। হ্যারিকে পরীক্ষা করল। তারপর পুঁটুলি থেকে এক চিমটে লাল গুঁড়ো বের করে হ্যারিকে খাইয়ে দিল। বোয়াম থেকে কিছু কালো চটচটে ওষুধ বের করে দু’হাতের তালুতে ঘষে বড়ির মতো বানাল। বিস্কোর হাতে দিয়ে বলল–রেখে দাও–সন্ধে রাতে একটা করে খাইয়ে দিও। বৈদ্যি পুঁটুলি বোয়াম নিয়ে চলে গেল।
