–তারপর? হ্যারি বলল। সালভা বলল–
–রামন লাল নানা শাস্ত্র চর্চার সঙ্গে সঙ্গে অ্যালকেমি অর্থাৎ অপ-রসায়নেরও চর্চা করতেন।
মারিয়া বলল- হ্যাঁ, আমাদের দেশেও কেউ কেউ এই অপ-রসায়নের চর্চা করেন। সীসা, তামা, পারদ সোনায় রূপান্তরিত করা যায় কীভাবে–এই অ্যালকেমির গবেষকরা তারই গবেষণা করেন।
–আপনি ঠিক বলেছেন। সালভা বলল–প্রথমবার রামন লাল অনেক কিছু লিখে আনেন। এটাকেই বলা হয় রামন লালের পাণ্ডুলিপির প্রথম খণ্ড। কিন্তু সেই পাণ্ডুলিপি কোথায় গোপন রেখে তিনি দেশত্যাগ করেন এটা তিনি কাউকে জানিয়ে যাননি। সালভা থামল। ফ্রান্সিস এতক্ষণে বেশ আগ্রহ বোধ করল। বলল–এই প্রথম পাণ্ডুলিপিটা কি অনুসন্ধান করা হয়েছে?
–হ্যাঁ হ্যাঁ–রাজা দ্বিতীয় জেমস তো বটেই এখনকার রাজা তৃতীয় জেমসও পণ্ডিতদের দিয়ে অনুসন্ধান চালাচ্ছেন। কারণ, রামন লাল নাকি পণ্ডিতমহলে বলেছিলেন যে এই প্রথম পাণ্ডুলিপিতে তিনি অ্যালকেমির বেশ কিছু সূত্র লিখে রেখেছেন।
–হুঁ, তাহলে তো ওটা বেশ মূল্যবান। হ্যারি বলল।
–তারপর? ফ্রান্সিস বলল।
–রামন লাল চলে গেলেন। আমি এখানে ফিরে এলাম। নিজে নিজেই পড়াশুনো চালালাম। বাবার বয়েস হয়েছে। আমি মাছ ধরার কাজে বাবাকে সাহায্য করতে লাগলাম। সালভা থামল।
রামন লালের আর কোনো খবর পেলেন না? মারিয়া বলল?
–না। বেশ কয়েক বছর কেটে গেল। কয়েকদিন আগের কথা। সেদিন বিকেলে নৌকো থেকে মাছ নিয়ে বাড়ি ফিরবো। হঠাৎ দেখি একটা নৌকো সমুদ্রে দোল খাচ্ছে।
নৌকোটা ঠিক জেলে নৌকো না। কৌতূহল হল। নৌকো চালিয়ে ঐ নৌকোটার, কাছে গেলাম। দেখি একটা কাপড় ঢাকা মাথা অল্প দেখা যাচ্ছে। কাছে গিয়ে দেখি কাদা-ধুলো-বালিতে নোংরা কালো জোব্বা গায়ে একটি লোক শুয়ে আছে। মাথা মুখ কাপড়ে ঢাকা। নৌকোটায় উঠলাম। মুখের কাপড়ের ঢাকনা সরিয়েই ভীষণভাবে চমকে উঠলাম–এ যে আমার শিক্ষাগুরু রামন লাল। মুখের কঁচাপাকা দাঁড়িয়ে মাথার লম্বা লম্বা চুলে রক্তের ছোপ কালো হয়ে গেছে। নাকে কপালে মুখে ক্ষত। জোব্বার হাতার বাইরে হাত দুটোয় কালশিটে দাগ। রক্তের ছোপ। তাড়াতাড়ি বুকের ওপর কান চেপে ধরলাম। নাঃ-বেঁচে আছেন। নাকের নীচে হাত রাখলাম। শ্বাস-প্রশ্বাস চলছে। একটা কালো রঙের দাঁড় পড়ে আছে নৌকোটায়। নৌকোটা আমার নেকোর সঙ্গে বেঁধে তীরে নিয়ে এলাম। ছুটে এলাম বস্তীতে। কয়েকজন বন্ধ ক ডেকে নিয়ে ছুটলাম সমুদ্রের ধারে। রামন লালকে ধরাধরি করে এনে বিছানায় শুইয়ে দিলাম। মা গরম জলে মুখের গায়ের ক্ষত মুছে দিল। জল খাওয়াল। তখনও উনি চোখ বন্ধ করে আছেন। একটু থামল সালভা। তারপর বলতে লাগল–বৈদ্যির চিকিৎসায় কয়েকদিনের মধ্যে রামন লাল একুট সুস্থ হলেন। আস্তে আস্তে বললেন যে অনেক দেশ ঘুরে তিউনেসিয়ার সমুদ্র উপকূলে এসেছিলেন। ওখানকার আরবীয়রা তাকে পাথর ছুঁড়ে মারছিল। কোনোরকমে একটা নৌকোয় উঠে পালিয়ে আসেন। খাদ্য নেই, জল নেই। একা একা দাঁড় বেয়েছেন। দূরত্ব খুববেশি না হলেও আহত শরীর নিয়ে মাঝে মাঝেই কষ্টে যন্ত্রনায় দাঁড় টানার পরিশ্রমে, ক্ষুধায়, তৃষ্ণায় অজ্ঞান হয়ে গেছেন। আবার জ্ঞান ফিরে পেয়েছেন। কথাগুলো বলতে বলতে সালভার গলা ভারী হয়ে এলো। চোখ ছলছল করতে লাগল। একটু থেমে বলতে লাগল কিন্তু উনি আর সুস্থ হলেন না। শরীরের ক্ষতগুলো বিষিয়ে উঠল। ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। এদিকে আল আমিরির সৈন্যদের চোখ এড়িয়ে রামন লালকে যে রাজধানী পালমায় নিয়ে যাবো তারও উপায় নেই।
একদিন সন্ধে থেকেই শ্বাসকষ্ট শুরু হল। ঐ শ্বাসকষ্টের মধ্যে ইঙ্গিতে কাগজ কলম চাইলেন। আমি তাড়াতাড়ি পার্চমেন্ট কাগজ আর উটপাখির পালকের কলমে কালি লাগিয়ে দিলাম। কাঁপা কাঁপা হাতে অনেক কষ্টে একটা নক্শামতো কী আঁকলেন। অনেক কষ্টে ফ্যাসফেসে গলায় শুধু বললেন–আল-মুদা-ই-লা-য়। কাঁপা কাঁপা আঙ্গুলে নকশাটা দেখালেন। শ্বাসকষ্টে পাগলের মতো মাথাটা এপাশ ওপাশ করতে করতে স্থির হয়ে গেলেন। বৈদ্যি আমার দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে চলে গেল। আমি শিশুর মতো কাঁদতে লাগলাম। সালভা থামল। ফ্রান্সিসরা কেউ কোনো কথা বলল না। একটু পরে ফ্রান্সিস বলল–আলমুদাইলা কী? সালভা বলল–রাজধানী পালমার রাজপ্রাসাদের নাম।
হ্যারি বলল–ওঁর পোশাকে কিছু পেয়েছিলে?
–হ্যাঁ, জোব্বার পকেটে এক গোছা পাণ্ডুলিপি। গ্রীক ভাষায় লেখা। মন শান্ত হলে পড়লাম পাণ্ডুলিপিটা। লিখেছেন কোথায় কোথায় গেছেন–বন্দি হয়েছেন কয়েদ খেটেছেন–মানে ভ্রমণ কাহিনীর মতো। সবশেষের পাতায় যেটা লিখেছিলেন–সেটা বেশ কৌতূহল জাগায়। লিখেছিলেন–আমার প্রথম পাণ্ডুলিপিতে বেশ কিছু অ্যালকেমির সূত্র আছে। সেই সূত্রগুলো নিয়ে বিভিন্ন দেশের পণ্ডিত অভিজ্ঞ রসায়নবিদদের সঙ্গে আলোচনা করেছি। বুঝলাম আমার সূত্রগুলো নির্ভুল। ভাবছি ফিরে গিয়ে এসব নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবো। একু থেমে সালভা বলল–সেটা আর পারলেন না।
মাজোরকা দ্বীপে ফ্রান্সিস
-তারপর? ফ্রান্সিস বলল।
–দুর্বল হাতে যে নকশাটা উনি এঁকেছিলেন সেটা ভালো করে দেখে আমি বুঝেছিলাম যে প্রথম পাণ্ডুলিপিটা তিনি কোথায় গোপনে রেখে গেছেন তার নির্দেশ আছেনকশাটায়। কিন্তু সেই নির্দেশ আমি কিছুই বুঝলাম না। ফ্রান্সিস বেশ আগ্রহের সঙ্গে বলে উঠল সেই নকশাটা কোথায়?
