জেলেটি ছুটতে ছুটতে একবার পেছন ফিরে দেখল। তারপর ছুটতে ছুটতে ফ্রান্সিসদের দিকে আসতে লাগল। ফ্রান্সিসরা যে ছোট্ট খাড়িটায় নৌকো ঢুকিয়েছিল–সেই খাঁড়িটায় ঢুকল জেলেটা। ছুটে এসে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। সাঁতরাতে সাঁতরাতে কিছুটা এসেই ফ্রান্সিসদের নৌকোটা দেখে হাত বাড়িয়ে নৌকোটা ধরতে গেল। ফ্রান্সিস ঝুঁকে পড়ে ওর বাড়ানো হাতটা ধরে ফেলল। লোকটা ভেবেছিল নৌকোটা খালি। ও চমকে উঠে হাত ছাড়াতে গেল। ফ্রান্সিস হাতটা জোরে চেপে ধরে স্পেনীয় ভাষায় বলল–ভয় নেই–আমরা তোমার বন্ধু। লোকটা বুঝল। আর হাত ছাড়াতে চেষ্টা করল না। হ্যারি বলল–তুমি কে? লোকটা তখনও ভীষণ হাঁপাচ্ছে। হাঁপাতে হাঁপাতে স্পেনীয় ভাষায় বলল–আমি সালভা। আমাকে বাঁচান।
–কোনো ভয় নেই–নৌকোয় উঠে এসো। ফ্রান্সিস বলল।তারপর টেনে সালভাকে নৌকোয় তুলে নিল। অল্প চাঁদের আলোয় দেখা গেল সালভার গায়ে এখানকার জেলেদেরই পোশাক তবে বুকের সামনেটা কাটা। খোলা বুকে তলোয়ারে কাটার দাগ। হাঁপাতে হাঁপাতে সালভা বলে উঠল–শিগগির নৌকো ছেড়ে দিন। ঐ সৈন্যরা এখুনি এসে পড়বে।
–ভয় নেই। দু’জন সৈন্যকে আমরা তির ছুঁড়ে আহত করেছি।
ওরা এক্ষুণি আসতে পারবে না। হ্যারি বলল।
–কিন্তু ওদের দুর্গ কাছেই। ওরা নিশ্চয়ই খবর দেবে। তখন আরো সৈন্য আসবে। সালভা বলল।
–হুঁ, ফ্রান্সিস মুখে শব্দ করল। তারপর হাতের দাঁড়ে পাশের এবড়ো-খেবড়ো পাথর ঠেলে নৌকো ছোট্ট খাড়িটা থেকে বের করে আনল।
নৌকো চলল ফ্রান্সিসদের জাহাজের দিকে। হ্যারি বলল–ওরা মূর সৈন্য তাই না?
–হ্যাঁ, সালভা বলল। তারপর বলল–আপনারা আমাকে প্রাণে বাঁচিয়েছেন। কিন্তু আপনাদের পরিচয়
–আমরা ভাইকিং। ফ্রান্সিস নৌকো চালাতে চালাতে বলল।
–ও আপনারা তো বীরের জাতি। এবার জানলাম আপনাদেরমনও উদার। সালভা বলল। তারপর বেশ চিন্তিত স্বরে বলল–আমি তো এখন তীরে যেতে পারবো না।
–একটু দূরেই আমাদের জাহাজে নোঙর করা আছে। তুমি ঐ জাহাজেই থাকবে। ফ্রান্সিস নৌকো চালাতে চালাতে বলল।
হ্যারি বলল–আচ্ছা সালভা–এটা কি একটা দ্বীপ না কোনো দেশ?
–এটা মাজোরকা দ্বীপ–বালেরিক দ্বীপপুঞ্জের একটি দ্বীপ। এই তীরভূমির নাম পালমা নোভা। এখানে জেলেদের বস্তীতে থাকি। সালভা বলল।
নৌকো চলেছে। রাত শেষ হয়ে আসছে। সমুদ্রের জল ছুঁয়ে জোর ঠাণ্ডা বাতাস বয়ে গেল। ভেজা পোশাকে সালভা দু’হাত বুকে জড়িয়ে ঠাণ্ডায় কেঁপে উঠল। মারিয়া লক্ষ্য করল সেটা।
যে কম্বলমতো মোটা কাপড়টা মারিয়া বসেছিল সেটা তুলে নিয়ে ও সালভার গায়ে জড়িয়ে দিল। সালভা মুখ তুলে মারিয়ার দিকে তাকিয়ে কৃতজ্ঞতার হাসি হাসল। তখনই শাঙ্কো বলে উঠল–ফ্রান্সিস আগুন। দুরে তীরভূমি ছাড়িয়ে আগুনের হল্কা উঠছে। দেখা গেল। সালভা ফুঁপিয়ে উঠল, বলল–হ্যাঁ মেরী–মূর সৈন্যরা আমাকে ধরতে না পেরে আমাদের ঘরে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। কাঠ আর পাথরে তৈরি আমাদের বস্তিটাই পুড়িয়ে দেবে ওরা। সালভা মাথা নিচু করে ফোঁপাতে লাগল। ওদিকে দ্বীপের ধোঁয়াটে আকাশ আগুনের আভায় লাল হয়ে উঠেছে।
আস্তে আস্তে নৌকো জাহাজের কাছে এলো। রেলিঙ ধরে বিস্কোওরা ফ্রান্সিসদের একে একে জাহাজে তুলে নিল। ফ্রান্সিস বলল–বিস্কো, এরনাম সালভা। একে তোমাদের কেবিন-ঘরে নিয়ে যাও। শুকনো পোশাক দাও। গরম কিছু খেতে দাও।বিস্কো সালভাকে কি ডেকে নিল। চলল ওদের কেবিন-ঘরের দিকে। পুব দিকের আকাশ তখন লাল হয়ে উঠেছে। একটু পরেই সূর্য উঠল।
একটু বেলায় ফ্রান্সিসদের ঘুম ভাঙল। মারিয়ে জেগেই ছিল তখন। খাবার নিয়ে এলো। দু’জনে খাচ্ছে তখন হ্যারি এলো। ফ্রান্সিস বলল–সালভা কেমন আছে?
–ভালো। খেয়েদেয়ে, জাহাজটা ঘুরে ঘুরে দেখছে। হ্যারি বলল।
–সালভাকে একবার ডাকো তো হ্যারি।মূর সৈন্যরা ওকে আক্রমণ করেছিল কেন সেটা জানতে হয়। ফ্রান্সিস বলল। হ্যারি চলে গেল। একটু পরেই সালভাকে নিয়ে এলো। ফ্রান্সিস হেসে বলল–বসো সালভা। সালভা বিছানাতেই বসল। মারিয়া হেসে বলল–এখন কেমন আছো? সালভাও হাসল। বলল–আপনাদের কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ রইলাম। ফ্রান্সিস বলল-ওসব কথা থাক। তোমাকে মূর সৈন্যরা আক্রমণ করেছিল কেন? তোমার বুকই বা তলোয়ারে কাটা কেন? সালভা একটু চুপ করে থেকে বলল–ঐ মূর সৈন্যদের রাজাই বলুন–অথবা দলপতিই বলুন–তার নাম আল আমিরি। সে কিন্তু জাতিতে মূর নয়–আরবী। দিন পনেরো আগে আল আমিরি জাহাজে চড়ে ঐ মূর সৈন্যদের নিয়ে এই পালমা নোভার দুর্গা দখল করে নেয়।
–আগে দুৰ্গটা কার অধিকারে ছিল? হ্যারি বলল।
–মাজোরকার বর্তমান রাজা তৃতীয় জেমসের। আল আমিরি এমনভাবে সৈন্য দিয়ে পালমা নোভা ঘিরে রেখেছে যে রাজা জেমস এখনও জানেন না যে এই দুর্গটা আল আমিরি দখল করে নিয়েছে। একটু থেমে সালভা বলতে লাগল–আমি রামন লালের শিষ্য ছিলাম। রামন লাল আমাদের ঘরে মারা যান। তার মৃতদেহ কবরের ব্যবস্থার জন্যে আমি গাড়িতে নিয়ে রাজধানী পালমায় যাচ্ছিলাম। দুর্গের কাছেই ধরা পড়লাম আল আমিরির সৈন্যদের হাতে। আল আমিরি খবর পেয়ে এলো। মৃত রামন। লালের জোব্বার পকেটে রামন লালের পাণ্ডুলিপির দ্বিতীয় খণ্ডটা পেল। সন্দেহ করল আমি প্রথম খণ্ডটা লুকিয়ে রেখেছি। চাইল প্রথম খণ্ডটা। প্রাণ বাঁচাতে বললাম বাড়িতে আছে। তিনজন সৈন্যের পাহারায় বাড়িতে এলাম। তারপর ওদের চোখে ধুলো দিয়ে পেছনের দরজা দিয়ে পালালাম। ছুটলাম সমুদ্রের দিকে। ঠিক করেছিলাম নৌকোয় চড়ে পালাবো। এই বেলাভূমিতেই আমরা মানুষ। বালির ওপর দিয়ে আমাদের মতো দ্রুত কেউ ছুটতে পারে না। কিন্তু সৈন্য তিনজনের নজরে পড়ে গেলাম। ওরা তলোয়ার খুলে চিৎকার করতে করতে আমাকে ধাওয়া করলো। তার পরের ঘটনা তো জানেনই। ফ্রান্সিস একটু চুপ করে থেকে বলল-রামন লাল কে? তার পাণ্ডুলিপি–মানে সমস্ত ব্যপারটা বলো তো। সালভা বলল–সে অনেক কথা। প্রথমে বলি আমি কি করে রামন লালের শিষ্য হলাম। একটু থেমে বলতে লাগল–জেলের ছেলে আমি। কিন্তু জেলেবস্তির অন্য ছেলেদের মতো আমি ছিলাম না। ছেলেবেলা থেকেই পড়াশুনোর প্রতি ভীষণ আগ্রহ বোধ করতাম। এখানকার দুর্গ ছাড়িয়ে বেশ দূরে একটা ভাঙাচোরা ঘরে একজন মৌলভী থাকতেন। তাঁর কাছেই আমি আরবী ভাষা শিখতে শুরু করি। একদিন মৌলভী বললেন–আমি যা জানি সবই তোমাকে শিখিয়েছি। যদি সত্যিকারের জ্ঞান লাভ করতে চাও তাহলে রাজধানী পালমা যাও। যদি রামন লালের শিষ্যত্ব লাভ করতে পারো তাহলে গ্রীক, ল্যাটিন, আরবী সমস্ত শাস্ত্রেই তুমি জ্ঞানী হবে। একটু থেমে সালভা বলতে লাগল–রাজধানী পালমা গেলাম। কত দুঃখকষ্টের মধ্য দিয়ে শিক্ষাগুরু রামন লালের নজরে পড়লাম–সে এক কাহিনী। যা হোক–শিক্ষাগুরু রামন লাল আলমুদাইনা রাজপ্রাসাদের একটি অংশে তার শিষ্যদের পড়াতেন। একুট থেমে সালভা বলতে লাগল– এই রামন লালের জীবন বড়ো বিচিত্র। সামান্য ফাইফরমাস খাটার চাকর ছিলেন বালকবয়সে। পরে তিনি নিজের যোগ্যতায় রাজা দ্বিতীয় জেমসের রাজসভার সম্মানিত অমাত্য হয়েছিলেন। গ্রীক শাস্ত্র আরবী ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন। মহাপণ্ডিত বলে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল। রাজা দ্বিতীয় জেমস আরো জ্ঞানলাভের জন্যে তাকে সিরিয়া মিশর পূর্ব দেশেও পাঠিয়েছিলেন। বেশ কিছুকাল পরে ফিরে এলেন। পালমায় রইলেন বছর কয়েক। তারপর হঠাৎ একদিন দেশত্যাগ করলেন সব সম্মান যশ অর্থ পেছনে ফেলে। সালভা থামলা।
