মারিয়া বলল–কিন্তু আমরা কোথায় এলাম টো জানতে হলে তো নেমে খোঁজ নিতে হবে।
–হুঁ। ফ্রান্সিস মুখে শব্দ করল। তারপর বলল–রাত হয়ে ভালোই হল। রাতে খাওয়া-দাওয়া সেরে নৌকো নিয়ে ডাঙায় নামবো। মানুষজন কাউকে তো পাওয়া যাবে। তা হলেই জানা যাবে আমরা কোথায় এলাম। আমাদের দেশই বা কতদূরে।
রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর ফ্রান্সিস পোশাক পরে তৈরি হল। ঢোলা হাতা হাঁটুঝুল পোশাক। কোমরে চামড়ার ফেট্টি। তলোয়ার গুজল কোমরের ফেট্টিতে। এবার মারিয়া বলল–আমিও যাবো। ফ্রান্সিস বলে উঠল–পাগল হয়েছে। কীরকম জায়গা কীরকম লোকজন থাকে কিছুই জানি না। এ অবস্থায় তোমাকে নিয়ে যাওয়া যায়? মারিয়া মাথা নেড়ে বলল–দেখো, এটা ভূমধ্যসাগর এলাকা। যতদূর জানি–এই এলাকায় কোনো বন্য জাতি বাস করে না।
ফ্রান্সিস বলল–বন্য জাতির মানুষ অনেক ভালো। তারা সভ্যজাতির মতো হিংস্র হয় না।
–তা হোক। তোমাদের ভাগ্যে যা ঘটবে আমার ভাগ্যেও তাই ঘটবে। মারিয়া বলল। ফ্রান্সিস বুঝল মারিয়াকে না নিয়ে গেলে দুঃখ পাবে। ভাবল–আমরা তো যুদ্ধ। করতে যাচ্ছি না। শুধু জায়গাটার নাম জানতে যাচ্ছি। বলল–বেশ চলো।
মারিয়া খুশিতে বিছানা থেকে লাফিয়ে নেমে দাঁড়াল।
জাহাজ থেকে দড়ি বেয়ে বেয়ে ফ্রান্সিসরা একে একে জাহাজের গায়ে বাঁধা একটা নৌকোয় নেমে এলো। মারিয়া আর হ্যারি নৌকোটার মাঝখানে বসল। দাঁড় হাতে একদিকে বসল ফ্রান্সিস অন্যদিকে শাঙ্কো।শাঙ্কো তির-ধনুক খুলে রাখল। দাঁড়টা হালের মতো ধরল। নৌকোর গতি ঠিক রাখতে হবে। জাহাজে বাঁধা দড়ি খুলে দিল ফ্রান্সিস। জাহাজের গায়ে দাঁড় দিয়ে ধাক্কা দিয়ে নৌকোটা সরিয়ে আনল। দাঁড় বাইতে লাগল। নৌকো চলল তীরভূমির দিকে।
নৌকো চলেছে। আকাশে সাদাটে মেঘের মন্থর চলাফেরা। চাঁদের আলো খুব উজ্জ্বল নয়। সেই অল্প আলোয় কিছুদূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। বাতাসে ঠাণ্ডার আমেজ। ছোটো ছোটো ঢেউয়ের দোল খেতে খেতে নৌকো তীরের কাছাকাছি এলো। দেখা গেল তীরের কাছে একটা জাহাজ নোঙর করা। জাহাজটার সিঁড়ির মুখে কাঁচটকা আলো জ্বলছে। তবে ডেক জনশূন। তীরভূমির বালিয়াড়ি টানা গিয়ে উঁচু হয়ে গেছে। কয়েকটা খুঁটিতে জাল টাঙানো। শুকোতে দেওয়া হয়েছে। বেশ কয়েকটা মাছ ধরার নৌকোও আছে। ফ্রান্সিস দাঁড় টানা বন্ধ করল। বলল, হ্যারি, মনে হচ্ছে জাহাজটায় কেউ নেই। তবু এদিক দিয়ে তীরে উঠবো না।
–জাহাজটায় কোনো পতাকা উড়ছেনা। কোন্ দেশের কাদের জাহাজ বোঝা যাচ্ছে না। হ্যারি জাহাজটা দেখতে দেখতে বলল।
–বাঁ দিকে ছোটো টিলাটা ঘেঁষে আমরা তীরে উঠবো। ফ্রান্সিস বলল।
নৌকো বাঁ দিকে ঘোরানোহল। টিলাটার কাছে এসে দেখা গেল এবড়ো-খেবড়ো পাথরের মধ্যে দিয়ে ছোট্ট একটা খাঁড়িমতো। ফান্সিস খাঁড়ির মধ্যে নৌকো ঢোকাল। একটু এগোতেই দেখা গেল সামনে বিস্তৃত বেলাভূমি। বেশ দূরে খুব অস্পষ্ট কিছু বাড়িঘর দেখা গেল। বোঝা গেল ওটা জেলেপাড়া। ফ্রান্সিস বলল, চলো, ঐ জেলেপাড়ায় গিয়ে খোঁজখবর করি। হ্যারি মাথা নেড়ে বলল, না ফ্রান্সিস। খোলা বালিয়াড়ি দিয়ে আমরা যেতে গেলে জাহাজের লোকদের নজরে পড়ে যাবো।
–কিন্তু জাহাজে তো কোনো মানুষজনই দেখা গেল না। মারিয়া বলল।
উঁহু, তবু সাবধান হতে হবে। ফ্রান্সিস বলল। শাঙ্কো বলল, এক কাজ করি। তির ধনুক নিয়ে আমি একা যাই। বালির ওপর দিয়ে বুক ঘষে ঘষে যাবো। জাহাজে কেউ থাকলেও দেখতে পাবে না।
–ঠিক আছে। শাঙ্কোই যাক। হ্যারি বলল। শাঙ্কো নৌকোয় উঠে দাঁড়াল। হাত বাড়িয়ে তির-ধনুক নিচ্ছে তখনই মারিয়া একটু গলা চড়িয়ে উঠলো–দ্যাখো তো, কয়েকজন লোক বালিয়াড়ির ওপর দিয়ে ছুটে এদিকে আসছে। ফ্রান্সিসরা অস্পষ্ট চাঁদের আলোয় দেখল–একজন লোক বালির ওপর দিয়ে ছুটতে ছুটতে এদিকেই আসছে। ওর পেছনেও ছুটে আসছে কয়েকজন। একটু এগিয়ে আসতেই দেখা গেল সামনের লোকটা প্রাণপণে ছুটে আসছে। ওর হাতে কোনো অস্ত্র নেই। ওর পেছনে তিনজন লোক খোলা তলোয়ার হাতে ছুটে আসছে। এবার ওদের চিৎকার শোনা গেল। দেখা গেল ওদের গায়ে বর্ম। সৈনিকের পোশাক পরনে। ওরা কৃষ্ণকায়। মাথার চুল কেঁকড়া। বলিষ্ঠদেহী। হ্যারি বলল–ফ্রান্সিস এরা বোধহয় মূর সৈনিক। যে লোকটাকে ওরা আক্রমণ করেছে সে বোধহয় এ দেশীয় নিরীহ জেলে। পরনে এখানকার জেলেদের ঢোলা পোশাক। মূল সৈন্যরা জেলেটাকে হয় মেরে ফেলবে নয়তো মারাত্মকভাবে আহত করবে। জেলেটাকে বাঁচাও। ফ্রান্সিস ডাকলো–শাঙ্কো। শাঙ্কো সঙ্গে সঙ্গে তির ধনুক তুলে নিল। ধনুকেতির পরিয়ে ছিলা টানলো। কিন্তু নৌকোটা বেশ দুলছে। নিশানা ঠিক রাখা মুশকিল। ফ্রান্সিস বলল–মেরো না। আহত করো। শাঙ্কো তির ছুঁড়ল। তিরটা জেলের পেছনেই প্রথম সৈন্যটির ডান কাঁধে বিধে গেল। সৈন্যটি তলোয়ার ফেলে দিল। বাঁ হাতে কঁধ চেপে বালির ওপরে বসে পড়ল। শাঙ্কো আর একটা তির ছুঁড়ল। কিন্তু নিশানা ফসকে গেল। আবার ছুঁড়ল। তির বিধল পরের সৈন্যটির ডান। পায়ের উরুতে। সেও বসে পড়ল। পরের সৈন্যটি দাঁড়িয়ে পড়ল। চারদিকে তাকাতে লাগল। বুঝে উঠতে পারল না, কোন দিক থেকে কে তির ছুঁড়ছে। তবু ভয় পেল। দাঁড়িয়ে রইল। আর এগিয়ে এলো না। দ্বিতীয় সৈন্যটি উরু থেকে তিরটা টেনে খুলে ফেলল। তারপর বালিতে গড়াগড়ি খেতে লাগল। প্রথমটিও তির টেনে খুলে বালিতে শুয়ে পড়ল।
