ফ্রান্সিস এসব ভাবছে তখনই দেখল ধনুকতির কাঁধে শাঙ্কো জাহাজের পাটাতন দিয়ে নেমে আসছে। এবার ফ্রান্সিস নিশ্চিন্ত হল যে বন্ধুরা বন্দি হয়ে নেই।
শাঙ্কো শিকারের জন্যে কয়েদঘরের ওপাশে বড়ো জঙ্গলটার দিকে যাচ্ছে। শাঙ্কো কয়েদঘর:ছাড়িয়ে আসতেই ফ্রান্সিস ছুটে ওর সামনে গেল। ডাকল–শাঙ্কো। শাঙ্কো ফ্রান্সিসকে জড়িয়ে ধরল। শাঙ্কো কিছুতেই ফ্রান্সিসকে ছাড়ছে না। তখন ফ্রান্সিস ওর পিঠে আস্তে চাপড় মেরে বলল–এই শাঙ্কো-পাগলামি করো না। শাঙ্কো হাত আলগা করল। ফ্রান্সিস বলল–কী ব্যাপার বলো তো? আল জাহিরি তার জাহাজ পাহারাদার সৈন্যরা কোথায় সব?
–মাঝ সমুদ্রে নিজে একা আল জাহিরি তার জাহাজে ঘুরপাক খাচ্ছে। শাঙ্কো বলল।
–কিছুই বুঝলাম না। ফ্রান্সিস বলল। বলো–
–জাহাজে চলো সব বলছি। তার আগে বলো তুমি কি যীশুর মূর্তি উদ্ধার করতে পেরেছো? শাঙ্কো জানতে চাইল।
-হ্যাঁ–একটা নয় দুটো মূর্তি। তার একটা বিদ্রোহী সেনাপতি ফেলকো চুরি করে নিয়েছে। অন্যটা আমি আর পারিসি রাজা গী দ্য লুসিগনানের হাতে দিয়েছি। শাঙ্কো চিৎকার করে ধ্বনি তুলল—ও হো হো। ফ্রান্সিসও গলা মেলাল। তারপর দুজনে ওদেরজাহাজে দিকে চলল।
জাহাজের পাটাতনে ফ্রান্সিসরা পা রাখতেই ডেক-এ শুয়ে বসে থাকা ভাইকিং বন্ধুরা ওদের দেখল। ওরা উঠেপঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল–ফ্রান্সিস এসেছে। নিচের কেবিনঘর থেকে সবাই ছুটে এসে ডেক-এ উঠতে লাগল। হ্যারি ছুটে এসে ফ্রান্সিসকে জড়িয়ে ধরল। মারিয়া হাসতে হাসতে ছুটে এলো। ফ্রান্সিস লক্ষ্য করল মারিয়ার শরীরটা বেশ রোগা হয়ে গেছে। ভাবল–মারিয়াকে এই অভিযানে আনা উচিত হয়নি। ছোটবেলা। থেকে সুখে স্বাচ্ছন্দ্যে আদরে মানুষ হয়েছে মারিয়া। ওর পক্ষে এত ধকল পোহানো সম্ভব নয়। ফ্রান্সিস দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবল এখন আর ওসব ভেবে কি লাভ। ওদিকে বন্ধুরা সমস্বরে চিৎকার করে উঠল—ও হো হো ।
মারিয়া হাসতে হাসতে এসে ফ্রান্সিসের একটা হাত ধরল। ফ্রান্সিস হেসে বলল– এবারও আমার হাত খালি। তবে যদি আর এক সপ্তাহ এখান অপেক্ষা করতে পারো তবে মহাত্মা নিওফিতসের নিজের হাতে তৈরি একটা যীশুর মূর্তি পেতে পারি।
-না-মারিয়া মাথা নেড়ে বলল–আমরা এবার যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দেশে ফিরবো।
বেশ তোমরা যেমন চাও। ফ্রান্সিস বলল।
ভাইকিংরা চিৎকার করে উঠল—ও হো হো। তারপর একদল ছুটল নোঙর তুলতে অন্যদল পাল খুলে দিতে আর একদল দাঁড়ঘরে দাঁড় টানার জন্যে। এবার দেশে ফেরা। জাহাজ চালাতে হবে যত দ্রুত সম্ভব।
হ্যারি আস্তে আস্তে ফ্রান্সিসকে বলল মারিয়ার অসুস্থতার কথা আল জাহিরির সৈন্যদের সঙ্গে লড়াইয়ের কথা সবই বলল। ফ্রান্সিস মারিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল–এখন তোমার শরীর কেমন? মারিয়া হেসে বলল–তুমি এসেছো–আমার দুশ্চিন্তা কমল–এবার আমি সম্পূর্ণ সুস্থ হবো। তুমি কিচ্ছু ভেবো না।
ততক্ষণে জাহাজের সব পাল খুলে দেওয়া হয়েছে। দাঁড়িরা দাঁড়ঘরে দাঁড় টানছে। ফ্রান্সিসদের জাহাজ পূর্ণবেগে সমুদ্রের ঢেউ ভেঙে চলল।
মাজোরকা দ্বীপে ফ্রান্সিস
ভূমধ্যসাগরের সবচেয়ে বড়ো দ্বীপ সিসিলি। ফ্রান্সিসরা জাহাজে করে ফিরছে সেই দ্বীপ থেকে।ফ্রান্সিসরা জাতিতে ভাইকিং। এই ভাকিংরা বীরের জাতি। দুঃসাহসী নিভকি। জাহাজ চালাতে সুদক্ষ। সমুদ্রের ধারেই ওদের দেশ বলে সমুদ্রের সঙ্গে ওদের যেন নাড়ির যোগ। ভাইকিংদের রাজার যিনি মন্ত্রী ফ্রান্সিস তারই ছেলে। রাজার মেয়ে রাজকুমারী মারিয়া ফ্রান্সিসের স্ত্রী। হ্যারি ওর প্রাণের বন্ধু। বিস্কো, তিরন্দাজ শাঙ্কো, পেড্রো আর সব ভাইকিং বন্ধুদের নিয়ে ফ্রান্সিস মারিয়া ফিরে আসছিল নিজেদের দেশে।
ফ্রান্সিস আর ওর দুঃসাহসী বন্ধুরা কত দুঃখ কষ্ট সহ্য করে অসীম ধৈর্য, অটল সঙ্কল্পে উদ্বুদ্ধ হয়ে নিয়ে এসেছে বিরাট সোনার ঘণ্টা, হাঁসের ডিমের মতো বড়ো মুক্তো আরো মূল্যবান কত কিছু। চিন্তা করে বুদ্ধি খাঁটিয়ে নক্শা, ছড়ার সূত্র ধরে উদ্ধার করেছে। গুপ্তধন-ভাণ্ডার। ফ্রান্সিসদের এই বীরত্বের কাহিনী নিয়ে ঐ দেশের চারণকবিরা গান বেঁধেছে। সারা দেশে ওরা সেই গান গেয়ে বেড়ায়।
ফ্রান্সিসদের জাহাজ চলেছে। নির্মেঘ আকাশ বাতাস বেগবান। জাহাজের পালগুলো ফুলে উঠেছে। দাঁড় বাইতে হচ্ছে না ভাইকিংদের। শান্ত সমুদ্রের ওপর দিয়ে ছোটো ছোটো ঢেউ ভেঙে দ্রুত চলেছে ফ্রান্সিসদের জাহাজ। ওদের দেশের দিকে।
দিন তিনেক কাটল। সেদিন বিকেলবেলা। তখনও সূর্য অস্ত যায়নি। মাস্তুলের ওপর নিজের জায়গায় ছিল নজরদার পেড্রো।
হঠাৎ পেড্রো চেঁচিয়ে বলল–ডাঙা–ডাঙা দেখা যাচ্ছে। জাহাজের ডেক-এ যে কয়েকজন ভাইকিং শুয়ে-বসে বিশ্রাম করছিল তাদের একজন ছুটল নীচে নামার সিঁড়ির দিকে। ফ্রান্সিসকে খবরটা দিতে হবে।
খবর পেয়ে ফ্রান্সিস, মারিয়া আর হ্যারি জাহাজের ডেক-এ এসে দাঁড়াল। তাকাল দূর দিগন্তের দিকে। দিগন্তে সূর্যাস্তের লালচে আলো। তার নীচে ছোটো ছোটো টিলার মতো দেখা গেল। সেসবের রং এখন বোঝার উপায় নেই।ফ্রান্সিস হ্যারির দিকে তাকাল। বলল–কী করবে এখনি?হ্যারি বললজায়গাটা কোনো দ্বীপনা দেশ তা তো বুঝতে পারছি না। এক্ষুণি অন্ধকার নামবে। এখান থেকে আর কিছুই দেখা যাবে না।
