এবার ফ্রান্সিস মূর্তিটা জামার সামনের গলার কাছ দিয়ে ঢুকিয়ে নিল। দু’হাত তো খোলা রাখতে হবে। নইলে পাথরে ওঠা-নামা করতে পারবে না। ফ্রান্সিস কুণ্ডের এলাকা থেকে আস্তে আস্তে উঠে আগের ঝর্ণাটার মুখে এলো তারপর ঝর্ণার ধার দিয়ে পাথর ঝোঁপঝাড় ধরে ধরে নিজেদের গুহার পেছনে এলো। ফাটল দিয়ে গুহার মধ্যে ঢুকল। দেখল, পারিসি বসে আছে। ফ্রান্সিস মূর্তিটা বের করে পরিসির চোখের সামনে ধরল। মূর্তি দেখে পারিসি অবাক হয়ে মূর্তিটার দিকে তাকিয়ে রলি। তারপর দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে বুকে ক্রশ আঁকল। জলে ভেজা মূর্তির পায়ে চুম্বন করল। ফ্রান্সিস মূর্তিটা ওর বিছানায়। রাখল। কয়েকদিনের পাহাড়ে ওঠার প্রচণ্ড পরিশ্রম, কষ্ট-খাওয়াও ভালো জোটেনি, নাওয়াও হয়নি- ক্লান্তিতে ফ্রান্সিস মূর্তির পায়ের কাছে মাথা রেখে শুয়ে রইল। এই অসময়ে ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুমের মধ্যেও শুনল পারিসি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
ঘুম ভাঙতে ফ্রান্সিস দেখল বেশ বেলা হয়েছে। পরিসি ফ্রান্সিসকে ডাকল-খেয়ে যান। ফ্রান্সিস দেখল পারিসি খাবার নিয়ে বসে আছে। তার মানে ওকে আজ রাঁধতে হয়নি। পাহাড়ি বস্তির লোকেরা সেই দড়ির নীচের সমতল মাটিতে খাবার রেখে গেছে। পারিসি দড়ি বেয়ে নেমে সেই খাবার নিয়ে এসেছে।
খাওয়াদাওয়ার পর ফ্রান্সিস বলল, পারিসি, আর এখানে থেকে লাভ নেই। চলো আজকেই নেমে যাবো।
দু’জনে আবার বিছানা কাপড় সব নিয়ে বোঁচকা বাঁধল। পারিসি কোমরের ফেট্টি খুলল। কপালের কাছে যীশুমূর্তি রেখে ফেট্টি দিয়ে বাঁধল। তারপর গুহা থেকে ফ্রান্সিসের পেছনে পেছনে বোঁচকা কাঁধে বেরিয়ে এলো।
নামার সময় যে যে পাহাড়ি বস্তিতে ওরা আশ্রয় নিচেছে সেখানকার সবাই যীশুর মূর্তিতে পা চুম্বন করেছে। পারিসি সেই মূর্তি কপালের ফেট্টির সঙ্গে বেঁধে নিয়ে চলেছে।
পাহাড়ের যে পথ দিয়ে লোকজন ওঠা-নামা করে আর ফ্রান্সিস ও পারিসি যে পথ দিয়ে উঠে এসেছিল সেই পথ দিয়ে ফ্রান্সিস ও পারিসি নামবে না স্থির করল। নামতে লাগল পাহাড়ের পেছন দিক দিয়ে।
এদিক দিয়ে তো লোক চলাচল করে না। কাজেই পথ বলে কিছু এদিকে নেই! বড়ো বড়ো পাথরের চাই, ঝোঁপ জঙ্গল পাথরের টুকরো ছড়ানো জায়গা। এসবের মধ্যে দিয়ে দু’জনে নেমে চলল। পাহাড়ের মাঝামাঝি নামতেই শুরু হল রোদের তেজ। ঐ রোদের মধ্য দিয়েই দু’জনে নামতে লাগল। একে রাস্তা বলে কিছু নেই পাথরের চাই গাছের গুঁড়ি এসব ধরে ধরে নামতে হচ্ছে। দু’জনেই বেশি কাহিল হয়ে পড়ল। এক সময় ফ্রান্সিস বলল–পারিসি–কপাল থেকে মূর্তিটা নামিয়ে পোশাকের ভেতরে রাখো। ঐ মূর্তিটা ওভাবে রাখলে সহজেই লোকের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। কার মনে কী আছে কে জানে। পারিসি মূর্তিটা খুলে পোশাকের মধ্যে ঢুকিয়ে রাখল।
সামনে একটা গাছ। এটা পেরোলেই এবড়োখেবড়ো ঘাসে ঢাকা সমতলভূমি। পাহাড় শেষ। ফ্রান্সিস হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। বলল–পারিসি থামো। দু’জনেই গাছটার আড়ালে দাঁড়াল। দেখল একটু নীচে সমতলভূমিতে আন্তো দাঁড়িয়ে আছে। এখন শিরস্ত্রাণ বর্ম পরা। সঙ্গে চারজন অস্ত্রে সজ্জিত সৈন্য। পারিসি বলল–আন্তো এখানে সৈন্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কেন?
–ঠিক বুঝতে পারছি না ফ্রান্সিস বলল–তবে কি ও জানতে পেরেছে যে আমরা আর একটা মূর্তি পেয়েছি?
–কী করবেন এখন? পারিসি বলল।
চলো নামা যাক। দেখি আন্তোরা কী চায়। ফ্রান্সিস বলল। ফ্রান্সিস আর পারিসি গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো। কয়েকটা পাথরের চাঁইয়ে পা রেখে রেখে নীচে নেমে এলো।
দু’জনে নামতেই আন্তো হাসতে হাসতে এগিয়ে এলো। বলল–ফ্রান্সিস–তুমি খুব বুদ্ধিমান। আমি ভালো করেই জানতাম যে পথ দিয়ে সবাই পাহাড়টায় ওঠানামা করে সেই পথ দিয়ে তুমি নামবে না। পাহাড়ের উল্টো দিক দিয়ে নামবে। তাই আমি সৈন্যদের নিয়ে এই উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে আছি। ফ্রান্সিসও হেসে বলল–তোমাকে আমরা খাদ্য দিয়েছিলাম, থাকতে দিয়েছিলাম। বিনিময়ে তুমি মূর্তি চুরি করে পালালে। তুমি যে জন্যে আমাদের গুহায় গিয়েছিলে তা তো করেছে। তবে এখন আবার আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছো কেন? আন্তো বলল–তুমি যা বুদ্ধিমান তাতে আর একটা মূর্তিও তুমি উদ্ধার করতে পেরেছো। আমরা সেটাই নিতে এসেছি।
–আর কোনো মূর্তি আমরা পাইনি। ফ্রান্সিস বলল।
মিথ্যে কথা। আন্তো বলল। ফ্রান্সিস বলল–ঐ মূর্তিটা কী করেছো?
–সেনাপতি ফেলকোকে দিয়েছি। আন্তো বলল।
–তাহলে আর সেনাপতি অন্য মূর্তিটা চাইবেন কেন? ফ্রান্সিস বলল।
–দুটো মূর্তিই তার চাই। একটা থাকবে সেনাপতির শিয়রে। অন্যটা থাকবে এই দুর্গের গীর্জায়। এবার ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে বুঝিয়ে বলল–আন্তো–আমার স্ত্রী ও বন্ধুদের আল জাহিরি কয়েদখানায় বন্দি করে রেখেছে। এখন রাজা গী দ্য লুসিগনানকে আমি বলেছি যে মহামতি নিওফিতসের হাতে তৈরি যীশুর মূর্তি আমি উদ্ধার করে আনবো। শেষ পর্যন্ত একটা উদ্ধার করলাম। সেটা তুমি বেইমানি করে চুরি করে নিয়ে পালালে। মহামতি নিওফিতসের হাতে তৈরি আর একটি একইরকম দেখতে মূর্তি আমরা উদ্ধার করেছি। রাজার সঙ্গে আমার চুক্তি হয়েছে যে মূর্তি উদ্ধার করে দিলে তিনি আল জাহিরির কয়েদঘর থেকে আমার স্ত্রী ও বন্ধুদের মুক্তির ব্যবস্থা করবেন। দুটো মূর্তি উদ্ধার করেছি। অন্তত একটি মূর্তিও তো রাজাকে দিতে হবে। তা নইলে আমার বন্ধুদের, স্ত্রীর মুক্তি হবে না। তাই তোমাকে অনুরোধ করছি যে কথাগুলি আমি বললাম তা সেনাপতি ফেলকোকে গিয়ে বলো। একটা মূর্তি তো পেয়েছেন আর একটা মূর্তি আর ও চাইবেন না।
