গুহায় ঢুকে ফ্রান্সিস চেঁচিয়ে বলল–পারিসি–দেখো। এই মূর্তিটাই নিওফিতস নিজের হাতে তৈরি করেছিলেন। পারিসি মোটা কাপড়ের বিছানায় শুয়ে ছিল। এক লাফে উঠে পড়ল। ছুটে এলো ফ্রান্সিসের কাছে। ফ্রান্সিস কোমর থেকে খুলে মূর্তিটা পারিসিকে দিল। তখন আন্তোও ছুটে এসেছে। পারিসি মূর্তিটা কপালে ঠেকিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। কাঁদতে কাঁদতেই বলল–এই মূর্তির কথা নিওফিতস আমাকে কখনও বলেন নি। নিওফিতসের হাতে তৈরি মূর্তি। কী অমূল্য সম্পদ।
পারিসি মূর্তিটা পাথরের খাঁজে বসাল। তারপর মাথা নিচু করে ক্রশ আঁকলো। তারপর বিছানায় এসে বসল। তখন ওর ফুঁপিয়ে কান্না বন্ধ হয়েছে। ও একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মূর্তিটার দিকে। আন্তোও অবাক চোখে তাকিয়ে রইল মূর্তিটার দিকে। পারিসি এবার ফ্রান্সিসের দিকে তাকাল। বলল–চলুন এবার নেমে যাই। ফ্রান্সিস মাথা নেড়ে বলল–না–এখন নয়। আমার কেমন বিশ্বাস নিওইফতস দুটো মূর্তি তৈরি করেছিলেন। একটা তো পেলাম। আর একটা আছে ওপরের গুহার ধারেকাছে কোথাও। ভুলে যেও না–দুটো গুহাতেই আমরা হাতুড়ি বাটালি পেয়েছি।
–তাহলে আবার ওপরের গুহায় যাবেন? পারিসি বলল।
–হা আর একটা মূর্তির সন্ধান করতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
খাওয়াদাওয়ার পর ফ্রান্সিস সব গুছিয়ে নিয়ে গুহা থেকে বেরিয়ে এলো। পারিসি কপালে একটা কাপড়ের ফেট্টি বেঁধে তাতে মূর্তিটা গুঁজে রাখল। এতে দু’হাত খোলা রইল। পাহাড়ে ওঠার সুবিধে হল।
তিনজনে পাহাড়ের ওপরের গুহাটায় যাবার জন্যে রওনা হলো। কখনও পাথুরে চাই-এ উঠে কখনও খণ্ড পাথরে পা রেখে রেখে তিনজনে ওপরের গুহার নীচের সমতল অল্প জায়গাটায় এলো। তারপর ঝোলানো দড়ি বেয়ে বেয়ে প্রথমে ফ্রান্সিস উঠে এলো। তারপর পারিসি আর আন্তো উঠে এলো। সবাই গুহাটায় ঢুকল।
গুহায় মোটা কাপড় পেতে বিছানামতো করা হলো।
ফ্রান্সিস আর পারিসি বলল। পারিসি কপালে বাঁধা মূর্তিটা বের করে মাথার কাছে রাখল। আন্তো বসল না। বলল–যাই ঝর্ণার জলে চানটা সেরে আসি। আন্তো গুহার পিছন দিকে দিয়ে বেরিয়ে গেল। এবার পারিসি বলল–ফ্রান্সিস আমি তো নীচের পাহাড়ি গ্রামগুলোয় আমাদের খাবার দেবার কথা বলতে গিয়েছিলাম তখন শুনেছি সেনাপতি ফেলকো রাজা গী দ্য লুসিগনানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে। এই কেরিনিয়ার দুর্গে সে আস্তানা গেড়েছে। আমার কেমন সন্দেহ হচ্ছে সেনাপতি ফেলকো আস্তোকে পাঠিয়েছে আমাদের ওপর নজর রাখার জন্যে।
–কেন? ফ্রান্সিস বলল।
–আমরা নিওফিতসের হাতে-গড়া মূর্তি উদ্ধার করতে পারলাম কিনা তার খোঁজ নিতে। দেখছেন না আস্তো কেমন ছায়ার মতো আমাদের সঙ্গে থাকে। আমার একমাত্র চিন্তা আন্তো আমাদের কোনো বিপদে না ফেলে। পারিসি বলল।
দেখা যাক। ফ্রান্সিস বলল।
–এই যে আন্তো হঠাৎ চান করতে চলে গেল তার কারণ কী। আন্তো এত সকালে কোনোদিন চান করে না। পারিসি বলল।
–তাহলে আন্তো কোথায় গেল? ফ্রান্সিস বলল।
–আন্তো এর মধ্যে নীচে নেমে লোক দিয়ে বিদ্রোহী সেনাপতি ফেলকোকে সংবাদ পাঠিয়েছে যে সাধু নিওফিতসের মূর্তি আমরা খুঁজে পেয়েছি। পারিসি বলল।
–তা’তে কী হল? বলল।
–আমরা নীচে নামলেই ফেলকোর সৈন্যরা আমাদের কাছ থেকে মূর্তিটা কেড়ে নেবে। পারিসি বলল।
ফ্রান্সিস একটু ভাবল। তারপর বলল–আমরা অন্য দিক দিয়ে পাহাড় থেকে নামবো। সেনাপতি ফেলকোর সৈন্যদের নজর এড়িয়ে পালাবো।
–সে চেষ্টাই করতে হবে। পারিসি বলল।
বেশ দেরি করে আন্তো ফিরে এলো। হাতে খাবার। বলল–নীচে পাহাড়ি লোকেরা এই খাবারদাবার রেখেছে। আমি তাও নিয়ে এলাম।
তিনজনে খেতে লাগল। ফ্রান্সিস আর পারিসি কোনো কথা বলল না।
খুব ভোরে। তখনও সূর্য ওঠেনি। পারিসির ধাক্কায় ফ্রান্সিসের ঘুম ভেঙে গেল। ও উঠে বসে জিজ্ঞাসা করল–কী ব্যাপার।
–আন্তো যীশুর মূর্তিটা নিয়ে পালিয়েছে। পারিসি কঁদো কাঁদো গলায় বলল– মূর্তিটা আমি মাথার কাছে রেখে ঘুমিয়েছিলাম। ফ্রান্সিস দেখল আন্তোর শয্যা শূন্য।
.
পরদিন সকালের খাবার খেয়েই ফ্রান্সিস গুহার পেছনের ফাটলটা দিয়ে বাইরে এলো। ঝণাটার জল একনাগাড়ে শব্দ তুলে বয়ে চলেছে। ফ্রান্সিস ঝণাটার পাশ দিয়ে। ছোটো ছোটো ঝোঁপ, পাথরের বড়ো বড়ো টুকরোর ওপর পা রেখে রেখে উঠতে লাগল। কিছুদূরে খাড়াই ওঠার পর দেখল ঝর্ণাটা একটা ছোট্ট গুহামুখ দিয়ে বেরিয়ে এসেছে। ঝোঁপঝাড় ধরে ধরে ফ্রান্সিস গুহামুখটায় এলো। তখনই দেখল ঝর্ণাটা দুদিকে ভাগ হয়ে গেছে। একটা নেমে গেছে ওদের গুহাটার পেছন দিয়ে আর একটা ধারা। নেমে গেছে ডানদিক দিয়ে। ফ্রান্সিস এই নতুন ধারাটার পাশ দিয়ে নামতে নামতে দেখল ঐ জলাধার একটা কুণ্ডের মতো জায়গায় জমেছে। কুণ্ডটার নীচে কোণে ফাটলের মধ্যে দিয়ে সেই জল বেরিয়ে যাচ্ছে। এই জন্যেই কুণ্ডে বেশি জল জমছে না। কুণ্ডের চারপাশের লম্বা লম্বা ঘাস ঝোঁপঝাড় কুণ্ডটাকে প্রায় ঢেকে দিয়েছে। এ কঁকটুকু দিয়ে তাকিয়ে ফ্রান্সিসের মনে হলো কুণ্ডের জলে কী যেন ভাসছে। ফ্রান্সিস দ্রুত নেমে এলো। লম্বা লম্বা ঘাস ঝোঁপ সরিয়ে দেখল–একটা কাঠের মূর্তি ভাসছে। উল্টোমুখ তাই কীসের মূর্তি বুঝল না। ফ্রান্সিস নিচু হয়ে বেশ কষ্ট করে মূর্তিটা তুলে আনল। এ কী? যীশুর মূর্তি। আর একটি। নিওফিতসের গ্রন্থে আঁকা ছবির সঙ্গে হুবহু মিল। তাহলে এই কাঠের মূর্তিটাও নিওফিতস নিজের হাতে গড়েছিলেন। আনন্দে ফ্রান্সিস দু’হাত তুলে বলে উঠল, পারিসি আর একটি মূর্তি। ফ্রান্সিস ভক্তিভরে বুকে ক্রশ আঁকল।
