আন্তো ফ্রান্সিসদের সঙ্গে থেকে গেল।
সেদিন দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর ফ্রান্সিস পারিসিকে বলল–সাধু নিওফিতস আগে মানে প্রথমে যে গুহাটায় ছিলেন সেটা এখনও দেখা হয়ে ওঠেনি। আজকে চলো নেমে ওই গুহাটা দেখে আসি।
ফ্রান্সিস আর পারিসি চলল নামবার দড়িটার দিকে। আন্তোও পেছনে পেছনে চলল।
গুহামুখ থেকে ঝোলানো দড়ি ধরে ধরে ওরা নীচের একফালি সমতলভূমিতে এলো। তারপরই উত্রাই বেয়ে নামতে লাগল। পথ বলে কিছু নেই। ওঁচানো পাথর ধরে ধরে নামা। বেশ কিছুটা নামার পর অন্য গুহাটার মুখে এলো। এই গুহাটা ওপরের গুহাটার তুলনায় ছোটো।
গুহাটায় ঢুকল তিনজনে। ফ্রান্সিস দেখল ওপরের গুহার মতো এই গুহাতেও শুকনো ঘাসপাতা বিছিয়ে বিছানামতো করা। ফ্রান্সিস বলল–পারিসি এই গুহাটায় তুমি কখনো এসেছিলে? পারসি মাথা নেড়ে বলল–না।
ফ্রান্সিস সঙ্গে আনা মোটা কাপড়টা ঘাসপাতার ওপর বিছিয়ে দিল। পারিসি আর আন্তো বসল। ফ্রান্সিস বসল না। ঘুরে ঘুরে গুহাটা দেখতে লাগল। গুহাটার এক কোণে পোড়া হাঁড়িকুড়ি রাখা। সাধু নিওফিতস যখন এখানে থাকতেন তখন রান্নটান্না করতেন। এখানেও একপাশে গাছের শুকনো ডাল কাণ্ড পাতা রাখা। সাধু নিওফিস রান্না করতেন। আগুন জ্বালাতেন। কিন্তু কোথায় কাঠের যীশু মূর্তি?
ফ্রান্সিস গাছের কাণ্ড ডালপাতা সরাল যদি কিছু পাওয়া যায়। পেলও–একটা ছোটো হাতুড়ি আর ছোটো বাটালি। তাহলে বোঝা যাচ্ছে সাধু নিওফিতস এখানেও কাঠের কাজ করেছিলেন। যীশুর মূর্তি তৈরি করেছিলেন। তাহলে কি সাধু নিওফিতস একটার বেশি যীশু মূর্তি কাঠকুদে বানিয়েছিলেন? ফ্রান্সিস ভাবল হয়তো দু’তিনটে মূর্তি সাধু নিওফিতস গড়েছিলেন। কিন্তু একটি মূর্তিও তো পাওয়া গেল না। একটি মূর্তি পাওয়া গেলেও বোঝা যেত আরো মূর্তি তৈরি হয়েছিল কিনা।
ফ্রান্সিস গুহাটার শেষের দিকে এলো। দেখল একটা বড়ো ফাটল। ফাটলটা দিয়ে ফ্রান্সিস বাইরে বেরিয়ে এলো। চারদিকে গাছ পাথর। পাহাড়ি এলাকা যেমন হয়। এদিক ওদিক কিছুদূর ঘুরে এলো ফ্রান্সিস। কিন্তু কোথাও ঝর্ণা বা জলজমা কুণ্ড দেখতে পেল না। তবে সাধু নিওফিতস কোথায় স্নান করতেন? খাবার জলই বা পেতেন কোথায়?
ফ্রান্সিস গুহায় ফিরে এসে পারিসিকে সেই প্রশ্ন করল–পারিসি এখানে কাছাকাছি কোথাও ঝর্ণা বা জমা জল দেখলাম না। তাহলে সাধু নিওফিতস খাবার জল কীভাবে পেতেন? স্নানই বা করতেন কোথায়? পারিসি বলল–তা তো বলতে পারবো না। আমি তো এই গুহায় কখনো থাকি নি। ফ্রান্সিস বলল–আমার দৃঢ় বিশ্বাস এখানে কোথাও ঝর্ণা বা অমনি কোনো জলের জায়গা আছে। পারিসি বলল হতে পারে।
তিনটি পাথরে তৈরি উনুনটায় পারিসি আগুন জ্বালাল। সঙ্গে যে খাবার এনেছিল তাই গরম করে সবাইকে খেতে দিল। খেতে খেতে ফ্রান্সিস বলল–পারিসি আমরা এই গুহায় কয়েকদিন থাকবো। এখানে ঠাণ্ডাটাও অনেক কম। খেয়েদেয়ে যাও ওপরের গুহা থেকে খাবারদাবার কাপড়চোপড় নিয়ে এসো। সব এনে তুমি একবার নীচের পাহাড়ি গাঁয়ে যাবে। গাঁয়ের লোকদের অনুরোধ করবে তারা যেন দু’তিনদিন পর পর আমাদের জন্যে খাবারদাবার এই গুহার নীচের এক চিলতে সমভূমিতে রেখে যায়। এবার আন্তোকেও বলল–তুমিও যাও পারিসিকে সাহায্য করো। খাওয়া-দাওয়া সেরে পারিসি আর আন্তো বেরিয়ে গেল।
পারিসি বিকেলের মধ্যেই ওপরের গুহা থেকে সব এনে এই গুহায় জড়ো করল।
পারিসি আন্তোকে সঙ্গে নিয়ে নীচে নেমে এল। পাহাড়ি গাঁয়ের মানুষদের অনুরোধ করে এলো দুতিনদিন অন্তর অন্তর খাবারদাবার দিয়ে যেতে। কেন ও আর ফ্রান্সিস অনেক কষ্ট সহ্য করেও গুহায় পড়ে আছে তাও বলল। বলল–মহাপুরুষ নিওফিতসের নিজের হাতে গড়া কাঠের যীশুর মূর্তি উদ্ধারই আমাদের উদ্দেশ্য। তার জন্যেই এত কষ্ট সহ্য করছি। সাধু নিওফিতসের নাম শুনেই সবাই মাথা নুইয়ে শ্রদ্ধা জানাল।
থাকা খাওয়ার মোটামুটি ব্যবস্থা হল। এবার মূর্তি খোঁজা।
গুহাটা ফ্রান্সিস তন্ন তন্ন করে খুঁজল। পাথরের কোনো খোঁজই বাদ দিল না। কিন্তু। মূর্তি নেই। কোথাও নেই। কোনো সূত্রই ফ্রান্সিসের হাতে নেই। শুধু সাধু নিওফিতসের গ্রন্থের সেই প্রথম কথাটা–যীশুর স্নানের জল পবিত্র। অথচ এখানে কোথাও জলই নেই। ওপরের গুহার পেছনে তবু একটা ছোটো ঝর্ণা আছে। এখানে তাও নেই।
পরদিন সকালের খাবার খেয়েই ফ্রান্সিস বেরিয়ে এলো গুহা থেকে। পাথরে পা রেখে এদিকওদিক ঘুরে বেড়ালো। কিন্তু ঝর্ণা কোথাও নেই। বেশ কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে একটা পাথরের চাইয়ের ওপর বসল। তখনইনজরে পড়ল বাঁ দিকে একটা পাথরের চাইয়ের ওপাশটায় কুয়াশা জমছে। তারপর মনে হল ধোঁয়া। ফ্রান্সিস ভালো করে তাকিয়ে থেকে বুঝল ওটা বাষ্প। কিন্তু জল ছাড়া বাষ্প এটা ঠিক বুঝল না ফ্রান্সিস। সন্দেহ নিরসনের জন্যে ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে পাথরে চাইটা পেরোতেই চমকে উঠল। দেখল একটা জলের কুণ্ড।তাই থেকে বাষ্প উঠেছে। তার মানে উষ্ণ প্রস্রবণ। এই উষ্ণ প্রস্রবণেই নিওফিস স্নান করতেন। ফ্রান্সিস আরো কয়েক পা এগোতেই দেখল উষ্ণ জলের কুণ্ডে ভাসছে একটা কাঠের মূর্তি। ক্রশবিদ্ধ যীশুরমূর্তি। ঠিক যেমনটি ও দেখেছিল নিওফিতসের সেই পুস্তকে। ফ্রান্সিস তাড়াতাড়ি নেমে এলো। উবু হয়ে বসে জলে হাত রাখল-বেশ গরম। এবার বুকে ক্রশ আঁকলো। তারপর হাত বাড়িয়ে কাঠের মূর্তিটা তুলে নিল। তারপর কোমরের ফেট্টিতে গুজল। আস্তে আস্তে চলল গুহার দিকে।
