শাঙ্কো এবার তীর ছুঁড়ল সিনার্কাকে লক্ষ্য করে।
নিখুঁত নিশানা। সিনকার কাঁধে গিয়ে লাগল তিরটা। সিনার্কা গাড়ির নরম আসনের ওপর গড়িয়ে পড়ল। সিনার্কার এই অবস্থা দেখে সৈন্যদের মনোবল ভেঙে গেল। কিছু সৈন্য পালিয়ে গেল। কিছু সৈন্য সিনার্কার গাড়ি ঘিরে দাঁড়িয়ে রইল।
এবার শাঙ্কো ফ্রান্সিসের কাছে ছুটে এলো। ফ্রান্সিস বলল—হাত লাগাও। দুজনে কাঠের পাটাতন দিয়ে জাহাজে উঠল। দুজনে মিলে জাহাজ থেকে পাতা কাঠের পাটাতনটা তুলে ফেলল। শাঙ্কো ছুটে গিয়ে জাহাজের নোঙরটা ঘড় ঘড় শব্দে তুলে ফেলল। একদল ভাইকিং চলে গেল জাহাজের পাল খাটাতে। পাশেই ফেল্লুকা মানে যুদ্ধজাহাজে সিনার্কার কিছু সৈন্য ছিল। তারা কিছু বোঝার আগেই ফ্রান্সিসের নির্দেশে জাহাজঘাটা থেকে জাহাজ বেরিয়ে এসে চলল মাঝ সমুদ্রের দিকে। জোর হাওয়ায় জাহাজের পাল ফুলে উঠল। জোর গতিতে ফ্রান্সিসদের জাহাজটা অনেক দূর চলে এলো।
ডেক-এর রেলিঙে ধরে ফ্রান্সিস আর হ্যারি জাহাজঘাটার দিকে তাকিয়ে ছিল। অল্পক্ষণের মধ্যে বোনিফেস বন্দর সিনার্কার যুদ্ধজাহাজ সব চোখের সামনে থেকে মিলিয়ে গেল। ফ্রান্সিসদের জাহাজ মাঝ সমুদ্রে চলে এলো।
নিশ্চিন্ত হয়ে ফ্রান্সিস আর হ্যারি নীচে নামার সিঁড়ির দিকে চলল।
নীচে কেবিনঘরগুলোয় এসে যে ঘরে আহত অসুস্থ রোক্কাকে রাখা হয়েছে সেই কেবিনঘরে ঢুকল। দেখল বৈদ্য কামেরাত রোকার পাশে বিছানায় বসে আছে আর মারিয়া রোক্কার কাটা জায়গাগুলোতে ওষুধ লাগিয়ে দিচ্ছে।
ফ্রান্সিস বুঝল—মারিয়ার শরীর অনেকটা সেরেছে। ফ্রান্সিস কামেরাতকে বলল রোক্কার শরীর কেমন? অনেকটা ভালো। তবে জ্বরটা এখনও ছাড়ে নি। কালকে নাগাদ জ্বর ছেড়ে গেলে বিপদের কিছু নেই। কিন্তু জ্বর না ছাড়লে চিন্তার কথা। কামেরাত বলল।
—মারিয়া কেমন আছে? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
—উনি এখন প্রায় সুস্থ। আর দুদিন ওষুধ পড়লে উনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যাবেন। কামেরাত বলল। ফ্রান্সিস ডাকল—মারিয়া। মারিয়া একবার ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়েই মুখ ঘুরিয়ে নিল। ফ্রান্সিস বুঝল—এখনও মারিয়ার রাগ পড়ে নি। ফ্রান্সিস ডান হাতটা আস্তে আস্তে মারিয়ার কাঁধে রাখল। মারিয়া সেই হাত নিজের হাতে ঠেলে সরিয়ে দিল। ফ্রান্সিস মৃদু হাসল। বলল—মারিয়া—তোমার সঙ্গে ওরকম দুর্ব্যবহার না করলে তোমাকে নিয়ে কামেরাত পালাতে পারতো না। তুমি যেরকম চিৎকার চ্যাঁচামেচি শুরু করেছিলে তাতে আমার সব পরিকল্পনাই ভেস্তে যেত। কাজেই তোমাকে থামাতে হয়েছিল। একটু থেমে ফ্রান্সিস বলল—আমাকে ক্ষমা করো। মারিয়া চুপ করে নিজের কাজ করে যেতে লাগল। ফ্রান্সিস আবার বলল—মারিয়া আমার ওপর রাগ করে থেকো না।
এবার রোক্কা বলল-রাজকুমারী—আপনি ফ্রান্সিসের ওপর রাগ করে থাকবেন না। আমার সঙ্গেও ফ্রান্সিস অত্যন্ত দুর্ব্যবহার করেছিলেন। তখন বুঝিনি। এখন বুঝেছি ফ্রান্সিস ঠিক পরিকল্পনা করে এগিয়ে চলেন। ফ্রান্সিস আমাকে জীবনদান করেছেন। নইলে সিনার্কার ঐ কয়েদখানা থেকে কোনোদিন বেরিয়ে আসতে পারতাম না। আমার বিদ্রোহী বন্ধুরা অবশ্যই আমাকে মুক্ত করতো কিন্তু একফোঁটা রক্ত খরচ না করে ফ্রান্সিস স্রেফ বুদ্ধির খেলায় সিনার্কাকে হারিয়ে আমাকে মুক্ত করছেন। একটু থেমে বলল—আপনি ফ্রান্সিসকে ক্ষমা করুন। উনি যা করেছেন সে সবকিছুই পরিকল্পনা মাফিক করেছেন।
হ্যারি বলল—রাজকুমারী আমিও ফ্রান্সিসকে ভুল বুঝেছিলাম। এখন বুঝতে পারছি ফ্রান্সিস নিখুঁত পরিকল্পনা করে কাজে নেমেছিল। মারিয়া এবার যেন একটু নরম হল। ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। তারপর নিজেদের কেবিনঘরে এসে শুয়ে পড়ল। সারাটা দিন যা ধকল গেছে। ফ্রান্সিস ছেঁড়া জামাটা খুলল। তারপর ভীষণ ক্লান্তিতে চুপ করে শুয়ে থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে পড়ল।
রাতে খাওয়াদাওয়ার পর ফ্রান্সিস মারিয়া হ্যারি শাঙ্কো সবাই রোক্কার কেবিনঘরে জড়ো হল। রোক্কা এখন অনেকটা সুস্থ। জ্বর ছেড়ে গেছে। কামারেত বলল-রোক্কার আর কোনো ভয় নেই। কাটা জায়গা থেকে রক্ত পড়ার জন্য রোক্কা যতটা দুর্বল হয়েছিল কয়েকদিনের মধ্যেই সেই দুর্বলতা কেটে যাবে।
রোক্কা বলল—ফ্রান্সিস-আপনি তো আমাকে পালঙ্কের দিকে যেতেই দিলেন না। কী ছিল ঐ পালঙ্কে।
ফ্রান্সিস হেসে বলল—সব বলছি।
হ্যারি বলে উঠল—তুমি কি রানী ইসাবেলার রত্নপেটিকা খুঁজে পেয়েছিলে?
ফ্রান্সিস হেসে বলল—হ্যাঁ। ফ্রান্সিসের কথা শুনে সবাই চমকে উঠল। শাঙ্কো বলল তবে ঐ রত্নপেটিকা নিয়ে এলে না কেন? হ্যারি কিছু বলল না। ওর কেমন মনে হল ফ্রান্সিস এবার ইচ্ছে করে হার স্বীকার করেছে।
—রত্নালংকারগুলো দেখেছিলে? মারিয়া বলল।
—না—ফ্রান্সিস বলল—তবে আমি নিশ্চিত ঐ রত্নপেটিকায় রানী ইসাবেলার সব রত্ন আর অলঙ্কার ছিল।
—ঠিক কী হয়েছিল বলো তো? হ্যারি বলল।
ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে বলতে লাগলো—প্রথমবার তো আমি একাই ঘরটায় ঢুকেছিলাম। জানালা দিয়ে ঢুকে ঘরের মধ্যে মেঝেয় পা রাখলাম। প্রায় একশো বছর পরে এই ঘরের মেঝেয় বাইরের মানুষের পা পড়ল। জানালায় চেয়ে দেখলাম বাইরে বিকেলের আলো। সেই আলো জানালা দিয়ে আসছিল। সামান্য আলো। তাতে ঘরের সবকিছু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না।
