অন্ধকার অন্ধকার ভাবটা চোখে একটু সয়ে এলে দেখলাম—ঘরের বাঁদিকের পাথুরে দেয়ালে লাল পাথর দিয়ে অনেকগুলো লম্বাটে দাগ। বুঝলাম—রানী ইসাবেলা এইভাবেই দিনের হিসেব রাখতেন। ডানদিকে তাকিয়ে দেখলাম—পাথরের দেয়ালে একটা কাঠের দেরাজ। একটা মাঝারি আকারের আয়না বসানো। সবকিছুর গায়ে চাপ চাপ ধুলো।
এবার দেখলাম ওদিকের দেয়ালে ঠেলে লাগানো একটা দামি ওক কাঠের পালঙ্ক। পালঙ্কের দুদিকের মাথায় উঁচু করে পেতল দিয়ে তৈরি নানা লতাপাতার নকশা। পালঙ্কের বিছানা ছিঁড়ে খুঁড়ে গেছে। পালক তুলো বেরিয়ে আছে। ধুলো জমে জমে পালঙ্কের কাঠ বিছানা যেন ঢাকা পড়ে গেছে। পালঙ্কের গায়ে নানা ফুললতাপাতার কাজ। কুঁদে কুঁদে তোলা। একটু থেমে ফ্রান্সিস বলতে লাগল।
আস্তে আস্তে পালঙ্কটার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। ছেঁড়া খোঁড়া বিছানাটার মাঝখানে একটা কাঠের পেটিকা। দামি চেষ্টট কাঠের পেটিকাটার গায়ে মীনে করা ফুললতা পাতা। পেটিকাটা ভালো করে দেখতে গিয়ে চমকে উঠলাম। সাদা হাড়ের ধূলিময় দুটো হাত রত্নপেটিকাটা ধরে আছে। এবার ধুলোর মধ্যে দিয়ে আন্দাজ করে বুঝলাম—দুটি কঙ্কাল। একটা বড়ো একটা ছোটো। বুঝলাম—বড়োটা রানী ইসাবেলার ছোটোটি রানীর মেয়ে রাজকুমারীর। কী গভীর মমতায় দুজনে রত্নপেটিকাটা ধরে আছে। সন্দেহ নেই এই পেটিকাটাই রানী ইসাবেলার রত্নভাণ্ডার। ফ্রান্সিস থামল। উপস্থিত সবাই গভীর মনোযোগ দিয়ে ফ্রান্সিসের কথাগুলো শুনছিল। ফ্রান্সিস বলতে লাগল রত্নপেটিকাটা তুলে নেব বলে হাত বাড়ালাম। কিন্তু পারলাম না পেটিকাটা তুলে নিতে। কী অপরিসীম ভালোবাসায় মমতায় মা আর মেয়ে সেই পেটিকাটা ধরে আছে। এখন আর ওরা রানী রাজকুমারী নয়। সাধারণ মানুষ-মা আর মেয়ে। একটু থেমে ফ্রান্সিস বলতে লাগল—এক অদ্ভুত পরিবেশ। কতদিন আগের কথা। সেই সময়টাই যেন আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল। মৃত্যুর সময়ও তারা রত্নপেটিকাটা হাতছাড়া করে নি। কী বলবো? আমার চোখে জল এসে গেল। আমি রত্নপেটিকাটা না নিয়েই জানালার কাছে চলে এলাম। দড়িধরে দুর্গের ছাতে উঠে এলাম।
—তারপরে তো আমাকেও নিয়ে গেলেন। রোক্কা বলল।
—ওটা সিনার্কাকে ধোঁকা দেবার জন্যে জামা ছিঁড়ে সেই কাপড়ের ঝুলি তৈরি করে একটা প্রায় চৌকোণো পাথর ভরে আপনাকে নিয়ে ছাতে উঠে এলাম। সৈন্য দুটিকে ঐ পাথরটাই রত্নপেটিকা এরকম বুঝিয়ে সিনাৰ্কার কাছে পাঠালাম। জানতাম রত্নপেটিকা পাওয়া গেছে এই আনন্দে সৈন্য দুটি রোক্কাকে পাহারা দেবার কথা ভুলে যাবে। হলও তাই। রোক্কাকে মুক্ত করে আমাদের জাহাজে নিয়ে এলাম।
সবাই নির্বাক হয়ে ফ্রান্সিসের বলা ঘটনাগুলো ভাবতে লাগল। অনেকক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না একসময় রোক্কা আবেগে ফ্রান্সিসের ডান হাতটা জড়িয়ে ধরল। একটু কান্নাভেজা গলায় বলল ফ্রান্সিস যদিও রত্নভাণ্ডার উদ্ধার হলো না—তবু আমি আপনার মানবতাবোধের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি। আপনি সত্যিই সাধারণ মানুষ নন। ফ্রান্সিস হেসে বলল—কী যে বলেন। মারিয়া হেসে বলল—রোক্কা ঠিক আমাদের মনের কথাই বলেছেন। ফ্রান্সিস বলল—এখন তো রানী ইসাবেলার রত্নভাণ্ডার আপনাদের হাতের মুঠোয়। সেই রত্নভাণ্ডার উদ্ধার করে আপনার দেশবাসীদের কল্যাণের কাজে লাগাবেন—এই অনুরোধ। রোক্কা বলল—আগে সিনার্কা আর ওর মোসাহেবের দলকে দক্ষিণ কর্সিকা থেকে তাড়াবো। তারপর রানী ইসাবেলা আর রাজকুমারীকে রাজকীয় সম্মানে কবর দেবার ব্যবস্থা করবো। মা মেয়ে হাত ধরাধরি করে যেভাবে আপনি দেখেছেন একই কবরে তেমনিভাবে তাদের শুইয়ে রাখবো। শুধু রত্ন আর রত্নালংকারে বিক্রি করবার জন্য নেব। রত্নপেটিকাটি দুজনে যেভাবে শুয়ে ধরে ছিলেন সেভাবে তাদের হাতে রাখবো। রত্নালঙ্কার বিক্রির অর্থ দিয়ে দেশ ও দেশবাসীর কল্যাণে ব্যয় করবো। আপনাদের সামনে এই প্রতিজ্ঞা করছি আমি। একটু থেমে রোক্কা বলল—এখন তো সিনার্কার সৈন্যরা আর জাহাজ আক্রমণ করতে আসবে না। নিশ্চিন্তে জাহাজটা ডাঙার কাছাকাছি নিয়ে চলুন। ভোর নাগাদ সারিন বন্দরে পৌঁছে যাবো তাহলে। সারিন আমাদের শক্ত ঘাঁটি। সব বিদ্রোহীদের একত্র করে আমরা বোনিফেস আক্রমণ করবো কালকেই।
ভোর নাগাদ ফ্রান্সিসদের জাহাজ সারিন বন্দরে পৌঁছল। খুব বড়ো বন্দর নয়। রোক্কা আর কামারেত ফ্রান্সিসদের কাছ থেকে বিদায় নিল। কাঠের পাটাতনের ওপর দিয়ে হেঁটে দুজনে নেমে গেল।
আবার ফ্রান্সিসদের জাহাজ চলল। বেগবান বাতাসে ফুলে উঠলো পালগুলো। জাহাজ ঢেউ ভেঙে চলল মাঝ সমুদ্রের দিকে।
যীশুর কাঠের মূর্তি
কার্সিকা দ্বীপের বোনিফেসিও বন্দর থেকে এবার ভাইকিং বন্ধুরা ফ্রান্সিসকে দেশে ফেরার জন্য বারবার বলতে লাগল। দেশ ছেড়ে এসেছে অনেকদিন। ওরা প্রায় অধৈর্য হয়ে পড়েছে। কিন্তু ফ্রান্সিসকে রাজি করাতে না পারলে কিছুই হবে না। বন্ধুরা মারিয়াকেও বারবার অনুরোধ করতে লাগল, রাজকুমারী–আপনি ফ্রান্সিসকে রাজি করান।
মারিয়ার নিজেরও এইসব বিদেশ বিভুইয়ে পড়ে থাকতে মন চাইছিল না। তবু সাবধানে কথাটা পাড়ল। ফ্রান্সিসকে বলল, এবার দেশেই ফিরে চলো। পরে আবার না হয় সমুদ্রযাত্রায় বেরুনো যাবে।
ফ্রান্সিস হেসে বলল, মারিয়া, দেশের টান সকলেরই থাকে। আমারও আছে। কিন্তু দেশে ফিরে ঐ যে সুখ আর স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন–এ আমার ভালো লাগেনা। তবু তোমাদের বিশেষ করে তোমার অনুরোধে দেশের দিকে জাহাজ চালাতেই বলছি ফ্লাইজারকে। কিন্তু আবার যদি কোনো রহস্যের সন্ধান পাই তবে আবার লেগে পড়বো।
