—সে কি? পেয়েছেন সেটা? কী করে পেলেন? রোক্কা জিজ্ঞেস করল।
—ঐ দেরাজের মধ্যে ছিল। ফ্রান্সিস বলল।
—আমাকে দেখতে দেবেন না? রোক্কা সাগ্রহে বলল।
—এখন নয়—পরে। এখন ছাদে উঠতে হবে। এখানে একটা ভ্যাপসা গন্ধে গা গুলোচ্ছে। চলুন আর এখানে থাকার দরকার নেই। ফ্রান্সিস আংটা থেকে মশালটা তুলে নিয়ে বলল—রোক্কা—এবার আপনি মশালটা নিন। আমাকে তো রত্নপেটিকাটা নিতে হবে। আপনার কষ্ট হবে না তো?
—না—না। রোক্কা মশালটা নিয়ে জানালার কাছে গেল। জানালা থেকেই ডান হাতটা বাড়িয়ে ঝোলানো দড়িটা ধরল। তারপর দড়িটায় ঝুলে পড়ল। তারপর আস্তে আস্তে উঠতে লাগল ছাদের দিকে। নীচে তখন বহুলোকের চিৎকার শুরু হল। কিন্তু চিৎকার থেমে গেল। রোক্কার হাতে তো রত্নপেটিকা নেই।
একটু পরেই জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে ফ্রান্সিস দড়িটায় ঝুলে পড়ল। মশালের আলোয় নিচের সবাই দেখল ফ্রান্সিসের বাঁ হাতে ঝোলামতো। তবে তো ওর মধ্যেই রত্নপেটিকা আছে—রানী ইসাবেলার রত্নভাণ্ডার। নীচের মানুষের হৈ হৈ চিৎকার শুরু হল। তারা হাতে ধরা মশাল ওঠাতে নামাতে লাগল। যতক্ষণ পর্যন্ত না ফ্রান্সিস দুর্গের মাথায় উঠে গেল ততক্ষণ পর্যন্ত চিৎকার হৈ হল্লা চলল। সিনার্কা আনন্দে গাড়ির ওপরেই প্রায় নেচে উঠতে লাগলেন। প্রায় একশো বছর ধরে অনেক চেষ্টা করেও কেউ ঐ ঘরে ঢুকতেই পারে নি। সেই রানী ইসাবেলার রত্নালংকারের পেটিকা এই বিদেশিটা উদ্ধার করেছে। একটা চিন্তাও হল সিনার্কার। যদি বিদেশিরা রত্নভাণ্ডার নিয়ে পালিয়ে যায়? পারবে না। দুজন সশস্ত্র সৈন্য পাহারায় রয়েছে। ওরা সাহস পাবে না।
প্রথমে রোক্কা তারপরে ফ্রান্সিস ছাদে উঠে এলো। শাঙ্কো হ্যারি ছুটে এলো। সৈন্য দুজনও। হ্যারি বলল—ফ্রান্সিস—এটাই কি সেই রানী ইসাবেলার রত্নপেটিকা। ফ্রান্সিস হেসে বলল—হ্যাঁ।
—আমরা একটু দেখব না? শাঙ্কো বলল।
—না—এটা সিনার্কাদের সম্পত্তি—তাদের হাতেই এটা পৌঁছে দিতে হবে। এখন খোলা চলবে না। ফ্রান্সিস এবার হ্যারিকে বলল—হ্যারি সৈন্যদের হাতে রত্নপেটিকা দিয়ে বললো যে এটা যেন ওরা সিনার্কার হাতে পৌঁছে দেয়। হ্যারি লো ল্যাতিন ভাষায় সৈন্যদের নির্দেশটা জানাল। ফ্রান্সিস ওর জামা ছিঁড়ে তৈরি ঝোলাটা একজন সৈন্যের হাতে দিল। সৈন্যটি ঝোলাটা হাতে নিয়ে বলে উঠল—বড্ড ভারী। রোক্কা বলল—কত রত্ন কত অলঙ্কার—ভারী তো হবেই। দুই সৈন্য তখন নেমে আসার জন্যে অন্ধকারের মধ্যে ছুটল পাথরের ভাঙা পাটার ওপরে পা রেখে রেখে। দুজনে হা হা করে হাসছে। সিনার্কাকে এই রত্নপেটিকা দিতে পারলে কত ইনাম পুরষ্কার পাওয়া যাবে। ওরা তখন সেই চিন্তায় মগ্ন। খেয়ালই নেই যে রোক্কাকে পাহারা দিতেই ওদের পাঠানো হয়েছে। সৈন্য দুজন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দড়ি বেয়ে নেমে চলে গেল।
এবার ফ্রান্সিস সবাইকে ডেকে বলল—আর একমুহূর্ত দেরি নয়। আমাদের যত শিগগিরি সম্ভব জাহাজঘাটায় পৌঁছতে হবে। জদি নামো সবাই।
পাথরের পাটার ওপর দিয়ে ওরা যত দ্রুত সম্ভব ছুটে পার হল। তারপর দড়ি বেয়ে খাদে নেমে ফ্রান্সিস বলল—শাঙ্কো তুমি নিশ্চয়ই জাহাজঘাটায় পৌঁছবার জন্যে কোন্ দিক দিয়ে কীভাবে যেতে হবে তা জানো।
—আমার পেছনে পেছনে এসো। বলেইশাঙ্কো কিছু ঝোঁপঝাড়ের দিকে ছুটল ফ্রান্সিসরাও পেছনে পেছনে ছুটল। রোক্কা বলল—সিনার্কা তো রানী ইসাবেলার রত্নপেটিকা পেয়েই গেছে। সিনার্কার আশা মিটেছে। তবে কেন পালিয়ে যাচ্ছেন? ফ্রান্সিস বলল—ঝোলাটা খুলে সিনার্কা পাবে একখণ্ড পাথর। একটাও রত্নালংকার নেই।—সেকি—রোক্কা চমকে উঠে বলল। হ্যারি শাঙ্কোও অবাক হল ফ্রান্সিসের কথা শুনে। ফ্রান্সিস বলল—পরে সব বলবো। এখন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব জাহাজে উঠে জাহাজ ছেড়ে দিতে হবে।
ঝোঁপঝাড় পাথুরে মাটির ওপর দিয়ে ছুটতে ছুটতে সকলে জাহাজ ঘাটার কাছে এলো। জাহাজঘাটার আলোকস্তম্ভে আজ আগুন জ্বলছে না। ফ্রান্সিসরা আলোকস্তম্ভের কাছাকাছি আসতেই বিস্কো বেরিয়ে এলো। ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল—কী ব্যাপার? আলোকস্তম্ভে আগুন জ্বলছে না কেন? বিস্কো বলল—সিনার্কার সৈন্যদের আগুন জ্বালাতে দিই নি। দুটো সৈন্য ঘায়েল হতেই বাকিরা পালিয়েছে। শাঙ্কোর ধনুক থেকে আমি তির ছুঁড়েছিলাম। ফ্রান্সিস শাঙ্কোকে বলল–শাঙ্কো আমরা যে কোনো মুহূর্তে আক্রান্ত হতে পারি। তুমি তির-ধনুক নিয়ে তৈরি হও। ফ্রান্সিসের কথাটা শেষ হতে না হতেই দেখা গেল মশাল হাতে সিনার্কার একদল সৈন্য জাহাজঘাটার দিকে ছুটে আসছে। সবার আগে গাড়িতে চড়ে আসছে সিনার্কা নিজে। ফ্রান্সিস বুঝল—রত্নপেটিকার বদলে পাথর দেখে সিনার্কা রেগে আগুন হয়ে গেছে। ওর এখন মাথার ঠিক নেই। তাই নিজেই গাড়িতে চড়ে ফ্রান্সিসদের বাধা দিতে আসছে। সিনার্কা ধরেই নিয়েছে আসল রত্নপেটিকা ফ্রান্সিসরাই চুরি করেছে। এখন জাহাজে চড়ে পালাবে। তাই যত সৈন্য হাতের কাছে পেয়েছে তাদের নিয়েই ফ্রান্সিসদের জাহাজ আক্রমণ করতে আসছে।
শাঙ্কো তির ছুঁড়ে মশাল হাতে সকলের সামনের সৈন্যটিকে ঘায়েল করল। সৈন্যটা মশাল ফেলে দিয়ে হাঁটু চেপে বসে পড়ল। মশালের আগুন লাগল অন্য দুজন সৈন্যের কাপড়ে মানে পোশাকে। তারা দুজনেই আগুন নেবাবার জন্যে মাটিতে গড়াগড়ি খেতে লাগল। এতে ছুটে আসা সিনার্কার সৈন্যদের গতি কমে গেল। শাঙ্কো পেছনে তাকিয়ে দেখল ফ্রান্সিসরা সবাই জাহাজে উঠে গেছে। শুধু ফ্রান্সিস তখনও জাহাজে উঠার পাটাতনের কাছে তলোয়ার হাতে দাঁড়িয়ে আছে।
