সবাই দুর্গের ছাদে উঠে এলো।
তখন সূর্য ডুবে গেছে। পশ্চিম আকাশের লাল কমলা রঙের আলো মিলিয়ে গেছে। অন্ধকার হয়ে আসছে চারদিক। অন্ধকার বাড়বে। এখন মশাল চাই। নইলে কিছুই দেখা যাবে না।—ফ্রান্সিস আর রোক্কা দুজনেই হাঁপাচ্ছে তখন।
হ্যারি এগিয়ে এসে বলল—ফ্রান্সিস—শাঙ্কো মশাল জ্বালিয়ে আনতে গেছে।
ফ্রান্সিস হাঁপাতে হাঁপাতে হাসল—শাঙ্কো আসল কাজটাই করতে গেছে।
ওরা ছাদের ওপর বসে রইল শাঙ্কোর অপেক্ষায়।
কিছুক্ষণের মধ্যে শাঙ্কো জ্বলন্ত মশাল নিয়ে ওদের কাছে এলো।
এবার ফ্রান্সিস জ্বলন্ত মশাল হাতে নিয়ে দুর্গের ছাদের ধারে এলো। দেখল নীচের ভীড় যেন আরো বেড়েছে। অনেক মশাল বেড়েছে। ফ্রান্সিস রোক্কাকে ডাকল। বলল—আসুন—আমরা দড়ি দিয়ে জানালাটার কাছে যাবো। তারপর ঘরটায় ঢুকবো।
—কিন্তু ঘরটার জানালায় মোটা মোটা লোহার গরাদ রয়েছে যে। রোক্কা বলল। ফ্রান্সিস হেসে বলল—সব ভেঙে উপড়ে ফেলা হয়েছে। কাছে গিয়ে দেখলেই বুঝতে পারবেন—ঘরে ঢুকতে কোনো অসুবিধে নেই।
এবার বাঁ হাতে মশাল ধরে ফ্রান্সিস দড়ি ধরে ঝুলে পড়ল। আস্তে আস্তে নামতে লাগল। একটু পরে রোক্কাও দড়ি ধরে ঝুলে পড়ল। দুজনে দড়ি ধরে ধরে নামতে লাগল। নীচে গাড়িতে বসা সিনার্কা গভীর মনোযোগ দিয়ে ফ্রান্সিসের হাতের মশালের দিকে তাকিয়ে রইল। সমুদ্রের হাওয়ায় মশালের আগুন কাঁপছে। সেই কাঁপা কাঁপা আলো পড়ছে ফ্রান্সিসের মুখে। অন্ধকারে শুধু এইটুকুই দেখা যাচ্ছে।
ফ্রান্সিস ডান হাত দিয়ে দড়ি ধরে ধরে আস্তে আস্তে নামছে তখন। নীচে দাঁড়ানো ভিড়ের লোকেরা ফ্রান্সিসের এই দুঃসাহসিক কাজের জন্যে মনে মনে প্রশংসা করতে লাগলো আর মশাল উঁচু করে নেড়ে নেড়ে ফ্রান্সিসকে উৎসাহ দিতে লাগল। ওরা ভেবে পেল না দিনের বেলা ঐ ভূতুড়ে ঘরে ঢুকতে লোকে সাহস পায় না। আর এই রাতের অন্ধকারে মাত্র একটা মশাল নিয়ে বিদেশিটা ঘরটায় ঢুকতে যাচ্ছে। বুকের পাটা আছে বলতে হবে।
বাঁ হাতে মশাল ধরে ফ্রান্সিস এবার জানালার পাথুরে জায়গাটায় বাঁ পাটা রাখল। তারপর আগে মশালটা ঘরের মধ্যে ফেলে দিল। তারপর জানালা দিয়ে ঢুকল। রোক্কাও তখন জানালাটায় এসে দাঁড়িয়েছে। ঘর থেকে হাত বাড়িয়ে ফ্রান্সিস রোক্কাকে ধরে ধরে ঘরের মধ্যে নিয়ে এলো। ভিড়ের মধ্যে থেকে চিৎকার হৈ হল্লা করে ফ্রান্সিসদের উৎসাহ দিতে লাগল। কামারেত বুঝল—এই সুযোগ। ওদের পাহারাদাররাও উত্তেজনায় চ্যাঁচাচ্ছে। ওদের দিকে নজরই নেই। কামেরাত ভিড়ে মিশে গেল। মারিয়াও ওকে অনুসরণ করল। ভিড় ছাড়িয়ে দুর্গের দেউড়ি পার হয়ে দুজনে দুর্গের বাইরে এলো। কেউই ওদের লক্ষ্য করল না। সবাই তাকিয়ে আছে দুর্গের জানালার দিকে। দুঃসাহসী বিদেশিটা রানীর ইসাবেলার রত্নপেটিকা উদ্ধার করতে পারবে কিনা। বিদেশিটার সঙ্গে রোক্কাও যোগ দিয়েছে। দেখা যাক।
রাস্তায় নেমে মারিয়া বলল—ইস ফ্রান্সিস রত্নভাণ্ডার উদ্ধার করল এটা আগে দেখা হল না। কামেরাত বলল—উপায় নেই রাজকুমারী। এখন সবাই ঐ জানালার দিকে তাকিয়ে আছে। এখনই পালানো সহজ। এবার যতটা সম্ভব দ্রুত চলুন জাহাজঘাটার দিকে। আমাদের জাহাজে গিয়ে আশ্রয় নিতে হবে। ফ্রান্সিস তো তাই বলেছেন।
—হ্যাঁ—মারিয়া বলল। শরীরের দুর্বলতা সত্ত্বেও মারিয়া যতটা দ্রুত সম্ভব হাঁটতে লাগল। পথ জনহীন। সবাই বোধহয় দুর্গের চত্বরে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দুজনে গিয়ে ফ্রান্সিসদের জাহাজে উঠল।
মশালের আলোয় এখন ঘরটা অনেকটা ভালোভাবে দেখা যাচ্ছে। বোধহয় মশালের আলো চোখে লাগতেই একপাল চামচিকে ঝটাঝ শব্দ তুলে জানালা দিয়ে উড়ে বেরিয়ে গেল। ফ্রান্সিস তো ঘরটা আগে দেখেছে। রোক্কা দেখে নি। তাই চারদিকে পাথরের ঘরটা দেখতে লাগল। দেখল—খাটটাও। খুব দামি ওক কাঠের তৈরি খাটটা এখন ধুলোয় ধুলোয় ধূসর। বিছানা শতছিন্ন। দেয়ালে একটা দেরাজমতো। তাতে আয়না আটকানো। এখন আয়নার কাঁচ ধূলিমাখা।
দেয়ালের মশাল রাখার আংটায় ফ্রান্সিস মশলাটা বসালো। তারপর ধূলিময় মেঝেতে নকশাটা পেতে উবু হয়ে দেখতে লাগল। রোক্কা তখন খাটটার দিকে যাচ্ছে। ফ্রান্সিস বলে উঠল—এ ঘরটা আমার দেখা হয়ে গেছে। আপনি পাশের ঘরটায় দেখুন। কথাটা বলে # ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। বলল—রোক্কা—আমার জামার পেছনটা ছিঁড়ে ফেলুন তো।
—সে কি। জামা ছিঁড়বেন কেন? রোক্কা বলল। ফ্রান্সিস বলল—ঐ আয়নাটা পরিষ্কার করতে হবে। দেরাজটাও পরিষ্কার করতে হবে।
রোক্কা এগিয়ে এসে ফ্রান্সিসের জামার পেছনদিকটা ধরে দুটো হাচটা টান দিতেই জামাটা ছিঁড়ে গেল। আর একটানে ছেঁড়া কাপড়ের অংশটা খুলে এলো। ফ্রান্সিসের জামাটা এখন শুধু সামনের দিকে রইল। ফ্রান্সিস ছেঁড়া কাপড়টা নিয়ে দেবরাজের দিকে গেল। রোক্কা পাশের ঘরে ঢুকল। সঙ্গে সঙ্গে চিঁ চিক্ চিক্ শব্দ তুলে ছুঁচো আর ইঁদুরের ছুটোছুটি শুরু হল। বোঝাই যাচ্ছে এ ঘরটা ভাড়ার ঘর হিসেবেই ব্যবহৃত হত। মশালের যেটুকু আলো এ ঘরটায় এসে পড়েছে তাই দেখে রোক্কার একথা মনে হল।
রোক্কা ফ্রান্সিস যে ঘরে আছে সেই ঘরে ফিরে এলো। দেখল—ফ্রান্সিস ওর ছেঁড়া জামার কাপড়টা দিয়ে কী বাঁধছে। রোক্কা বলল—কী বাঁধছেন? ফ্রান্সিস হেসে বলল—রানী ইসাবেলার রত্নপেটিকা।
